Advertisement
E-Paper

লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে মনিপুর গ্রাম

আদ্রা রেল শহরের শ্মশানঘাট, ছাইগাদা, কবরস্থান-সহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিলেন কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মানুষ। তাঁদের ঠাঁই হল মণিপুর গ্রামে। তবে তাতে তাঁদের জীবন সংগ্রাম থেমে গেল না। সমাজের মূল স্রোতে ফিরে যাওয়ার লড়াই এখনও চলছে। লিখছেন সঙ্গীত নাগমিনু একা নন। কুষ্ঠরোগীদের প্রতি দিনের পর দিন অমানবিক আচরণ, তাঁদের অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা, তাঁদের হাতে জল স্পর্শ না করার এমন নিদর্শন খুবই সাধারণ।

শেষ আপডেট: ১৮ এপ্রিল ২০১৯ ০০:৩৩
জাপানি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে মনিপুর গ্রামের মহিলাদের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ। ফাইল চিত্র

জাপানি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পক্ষ থেকে মনিপুর গ্রামের মহিলাদের হাতের কাজের প্রশিক্ষণ। ফাইল চিত্র

ভোরের আলো তখনও ফোটেনি। পূব আকাশে আবছা লাল-বেগুনি আভা। এমন কাক ভোরেই ঘুম ভাঙে লক্ষ্মীর। পুকুর থেকে জল তুলতে যাচ্ছেন এমন সময়ে পাশের বাড়ির ঘর থেকে এক চমকে বেরিয়ে এল এক জ্বলন্ত দেহ।

থমকে দাঁড়ান লক্ষ্মী। মিনুর শরীরে জল ছিটিয়ে দেওয়া তাৎক্ষণিক বুদ্ধিটুকুও সে সময় তাঁর মাথায় আসেনি। সময় লেগেছিল। মিনু পাশের বাড়ির মেয়ে। সাত চড়ে রা নেই! কিন্তু দোষ একটাই। তিনি কুষ্ঠ-আক্রান্ত। তাই বিয়ে থা হল না। গাঁ থেকেও এক রকম একঘরে করে দিয়েছিল। তার পরে এই—আগুন, মৃত্যু।

মিনু একা নন। কুষ্ঠরোগীদের প্রতি দিনের পর দিন অমানবিক আচরণ, তাঁদের অস্পৃশ্য বলে গণ্য করা, তাঁদের হাতে জল স্পর্শ না করার এমন নিদর্শন খুবই সাধারণ।

সে নিরিখে কুষ্ঠরোগীদের কাছে এক ‘অভয়াশ্রম’ হল মনিপুর গ্রাম।

১৯৩৫ সাল। পুরুলিয়ার আদ্রা থেকে দু’কিলোমিটার দূরে ট্রেন লাইনের ধারে মনিপুরে ভাগ্যচক্রে দেখা হয়েছিল পাঁচ জনের। গোপাল মাহাতো, মতিলাল মোদক, সুরেন্দ্র মাহাতো, কৃপা খান্ডোয়াল এবং সুধীর বাউরি। পাঁচ জনই কুষ্ঠ আক্রান্ত। সমাজের ভয়ে পরিবারের লোকেরাই তাঁদের বাড়ি থেকে বার করে দিয়েছিলেন। বাড়ি থেকে বিতাড়িত হওয়ার পরে তাঁরা আশ্রয় নিয়েছিলেন জনমানবহীন মনিপুরে। এই পাঁচ জনের মতোই পরিবার থেকে বিতাড়িত হয়ে ততদিনে আদ্রা শহরের শ্মশানঘাট, ছাইগাদা, কবরস্থান-সহ বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়েছিটিয়ে কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মানুষ বসবাস করতে শুরু করেছেন। স্বাধীনতার পরে বিষয়টিতে নজর পড়ে তৎকালীন আদ্রা রেল কর্তৃপক্ষের। ঠিক হয় ছড়িয়েছিটিয়ে থাকা কুষ্ঠরোগে আক্রান্ত মানুষদের মনিপুরেই থাকার ব্যবস্থা করা হবে। রেল কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে তাঁদের নিয়ে আসা হয় মনিপুরে। গড়ে তোলা হয় বাসযোগ্য পরিকাঠামো। নবাগতেরা আসার পরে মনিপুরের জনসংখ্যা পাঁচ জন থেকে বেড়ে দাঁড়ায় ১১৫টি পরিবারে। বর্তমানে এই গ্রামে ২১২টি পরিবার বসবাস করেন। মোট জনসংখ্যা ১,১০০ জন।

মনিপুরে এসেই শুরু হয় ওই মানুষগুলির বেঁচে থাকার লড়াই। এঁদের অনেকেই বাঁকুড়া জেলার গৌরীপুর কুষ্ঠ হাসপাতাল এবং পুরুলিয়ার লেপ্রসি মিশন হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা করিয়ে ফিরলেও পরিবার তাঁদের ফিরিয়ে নেয়নি। অতএব, মনিপুরেই তাঁদের নতুন জীবনের সূচনা হয়। তাঁদের মধ্যে যাঁরা সক্ষম ছিলেন তাঁরা নেমে পড়েন বিভিন্ন জীবিকায়। যেমন—কয়লা কিনে বিক্রি, আবর্জনা কুড়নো। শুধু বাঁচার এই লড়াইয়েও জুটেছে ‘সভ্য’ সমাজের নাক সিঁটকানো। কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত কয়লা বিক্রেতারা যে কয়লা বিক্রি করতেন, শোনা যায় সংশ্লিষ্ট অনেক খদ্দের সেই কয়লা জীবাণুনাশক দিয়ে ধুয়ে গ্রহণ করতেন। এমনকি, কয়লা বিক্রেতার কাছে অর্থ ফেরত পাওয়ার থাকলে তা কাগজের নোটে না নিয়ে ধাতব খুচরো পয়সা নিতেন সেই ক্রেতারা, যাতে জীবাণুনাশক দিয়ে তা ধুয়ে গ্রহণ করা যায়। খাবারের দোকানে নিজ উপার্জিত অর্থ দিয়ে খাবার কিনতে গেলে দোকানদার তা সরাসরি হাতে দিতেন না। উঠতে দেওয়া হত না বাসে বা ট্রেনে। ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানো যেত না। অমানবিক নিগ্রহের নজিরও রয়েছে। কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত অঙ্গহীন ভিক্ষাজীবীর গায়ে ছুড়ে দেওয়া হয়েছিল গরম জল।

পরিস্থিতি বদলাতে শুরু করে আশির দশকে। মনিপুরের গ্রামবাসীদের আসল লড়াই শুরু হয় এই সময়েই প্রিয়রঞ্জন বর্মনের হাত ধরে। প্রিয়রঞ্জনবাবু গৌরীপুর কুষ্ঠ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসার পরে আশ্রয় নিয়েছিলেন মনিপুরে। গ্রামের মানুষকে নিজেদের অধিকার সম্পর্কে সচেতন করতে শুরু করলেন প্রিয়রঞ্জন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন গোপাল মাহাতো, কিঙ্কর মাহাতো, প্রাথমিক শিক্ষক তড়িৎ পাত্র, স্বপন বন্দ্যোপাধ্যায়, রাধাবল্লভ পান্ডা, রাম সর্দার-সহ ৫৫০ জন মনিপুরের কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মানুষ। ১৯৭৯ সালের ১১ ডিসেম্বর তৈরি হল ‘মনিপুর লেপ্রসি রিহ্যাবিলিটেশন সেন্টার’ বা ‘মনিপুর কুষ্ঠ পুনর্বাসন কেন্দ্র’। তাতে নৈতিক সমর্থন পাওয়া গেল ‘সারা বাংলা কুষ্ঠ কল্যাণ সমিতি’র। তা ছাড়া, আদ্রার নিগমনগর নিগমানন্দ সেবাশ্রম হাইস্কুলের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক ও বাঁকুড়া লোকসভা কেন্দ্রের সাংসদ বাসুদেব আচারিয়া ১৯৮১ সালে উদ্যোগী হন মনিপুরের কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত পরিবারগুলির ছেলেমেয়েদের স্কুলে ভর্তি করানোয়।

ধীরে ধীরে গ্রামের মানুষের ভোটের পরিচয়পত্র, রেশনকার্ড, পানীয় জলের ব্যবস্থা ইত্যাদি আদায়ের প্রক্রিয়া শুরু হয়। এ ছাড়া, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, পুনর্বাসন, সমাজের মূল স্রোতে ফিরে যাওয়ার উপরে জোর দেওয়া হয়। শুরু হয় আন্দোলন। আন্দোলনে ফল মিলেছিল। মনিপুরে বর্তমানে রয়েছে স্কুল, অঙ্গনওয়াড়ি কেন্দ্র। স্বাস্থ্যকেন্দ্রে কুষ্ঠ আক্রান্তদের নিয়োগ এবং তাঁদের চিকিৎসার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। এলাকায় হয়েছে কুয়ো, নলকূপ। সবচেয়ে বড় সাফল্য এই আন্দোলনের ফল শুধু মনিপুরে সীমাবদ্ধ থাকেনি। রাজ্যের প্রায় পাঁচ হাজার কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত মানুষ পেয়েছেন এককালীন ১২ কিলোগ্রাম করে চাল, বৃদ্ধেরা পেয়েছেন পেনশন, বিধবারা ভাতা, পেয়েছেন সরকারি প্রকল্পে বাড়ি। বাঁকুড়া জেলায় তৈরি হয়েছে ১০০ জন কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত পরিবারের ছেলেমেয়েদের থাকার জন্য শিশু নিবাস। মনিপুরেই তৈরি হয়েছে বৃদ্ধাবাস। জাপানের একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা কুষ্ঠ রোগাক্রান্ত পরিবারের মহিলাদের স্বনির্ভর করার চেষ্টাও করেছে। স্বেচ্ছাসেবী সংস্থার পাশাপাশি, দেখা মিলেছে কিছু ব্যক্তিগত উদ্যোগেরও। স্থানীয় বিভিন্ন মানুষ জন্মদিন, বিবাহবার্ষিকীর মতো ব্যক্তিগত অনুষ্ঠান উদ্‌যাপন করেছেন মনিপুরের মানুষকে নিয়ে।

এত কিছুর পরেও মনিপুরের লড়াই থামেনি। সে লড়াই সমাজে ফিরে যাওয়ার। এখনও এই এলাকার বিবাহযোগ্য নারী ও পুরুষের বিয়ে দিতে সমস্যা হয়। বিভিন্ন এলাকার কর্মক্ষেত্রে তাঁদের নেওয়া হয় না। মনিপুরের চারটি পুকুর রয়েছে। সেখানকার মাছ এখনও মনিপুরের বাইরে বিক্রি করা যায়নি। কুষ্ঠ রোগে আক্রান্ত মানুষের নিয়মিত চিকিৎসা, পরিচর্যার ব্যবস্থা, শারীরিক পরীক্ষারও অভাব রয়েছে। এলাকায় রয়েছেন চারটি শিশু-সহ ছ’জন কুষ্ঠ আক্রান্ত।

তবে নিজেদের সমাজের মূল স্রোতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়ার লড়াইয়ে অবিচল মনিপুর গ্রামের মানুষ। হার মানতে নারাজ তাঁরা।

তথ্য সহায়তা: নবকুমার দাস।

Leprosy Village

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy