ভূপৃষ্ঠের উপরিতলে বসবাসকারী বড় প্রাণীরাই কি এ পৃথিবীর সব থেকে গুরুত্বপূর্ণ বাসিন্দা? এ প্রশ্নের উত্তর হয়তো নেতিবাচকই হওয়ার কথা। কারণ, সেই সব প্রাণীদের মধ্যে সবচেয়ে বুদ্ধিমান মানুষ আজও এ পৃথিবীর সমস্ত প্রাণিকূলের অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি। ভূ-ত্বকের নীচে, মাটির গভীরে বা সমুদ্রের আনাচে কানাচে রয়েছে নানা জীব, এককোষী বা বহুকোষী। কোথাও তারা একা, কোথাও গোষ্ঠীবদ্ধ। এ সব অণুজীবেরা বাস্তুতন্ত্রের সমতা বজায় রাখার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সম্প্রতি এমনই এক গবেষণার পর আইআইটি মাদ্রাজ জানিয়েছে, সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের স্থিতিশীলতা বজায় রাখে এক বিরল অণুজীব গোষ্ঠী। ইন্ডিয়ান ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি (আইআইটি) মাদ্রাজের তরফে জানানো হয়েছে, ক্রান্তীয়, নাতিশীতোষ্ণ এবং মেরু অঞ্চলের সমুদ্র থেকে সংগৃহীত প্রায় ৪,৬০০-রও বেশি নমুনার মাইক্রোবিয়াল সিকোয়েন্সিং করেছেন ওয়াধওয়ানি স্কুল অব ডেটা সায়েন্স অ্যান্ড এআই। সামুদ্রিক এই অণুজীবী সম্প্রদায় কী ভাবে গঠিত হয়, তাদের পারস্পরিক সম্পর্ক, বিভিন্ন সামুদ্রিক পরিবেশে তারা কী ভাবে স্থিতিশীল থাকে, সে সংক্রান্ত বহু তথ্যই উঠে এসেছে এই গবেষণায়।
গবেষকেরা মনে করছেন, এই তথ্য বিজ্ঞানীদের আরও সচেতন হওয়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। সমুদ্র সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বিরাটাকার জীবের পাশাপাশি পরিবেশগত দিক থেকে গুরুত্বপূর্ণ বিরল অণুজীবগুলির উপরও নজর দেওয়া প্রয়োজন। গবেষণা বলছে, জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সমুদ্রের তাপমাত্রা ক্রমাগত বদলাচ্ছে, পরিবর্তিত হচ্ছে সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্র। এই পরিস্থিতিতে অণুজীবের আচরণ আরও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। সে দিকে নজর রাখলে বোঝা যাবে পরিবেশগত পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বাস্তুতন্ত্রের কী রকম প্রতিক্রিয়া তৈরি হচ্ছে।
আরও পড়ুন:
গবেষকেরা নির্দিষ্ট কোনও একটি প্রজাতির পরিবর্তে বৃহত্তর অণুজীব গোষ্ঠী শনাক্ত করার উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁদের মতে, এই পদ্ধতি ভবিষ্যতে বিভিন্ন ধরনের পরিবেশে প্রয়োগ করা সম্ভব হবে এবং জীববৈচিত্র্য, বাস্তুতন্ত্রের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ এবং পরিবেশ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের সাহায্য হবে। একই সঙ্গে রাষ্ট্রসঙ্ঘের জলজ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণের লক্ষ্য পূরণেও এই গবেষণা সহায়ক হতে পারে।
গবেষণার গুরুত্ব ব্যাখ্যা করতে আইআইটি মাদ্রাজের অধ্যাপক কার্তিক রমন বলেন, “সামুদ্রিক অণুজীবগুলি সমুদ্রের বাস্তুতন্ত্রের ‘অদৃশ্য ভিত্তি’ হিসেবে কাজ করে। পুষ্টির পুনঃচক্রায়ন, সামুদ্রিক খাদ্যশৃঙ্খল বজায় রাখা এবং পৃথিবীর জলবায়ু নিয়ন্ত্রণে এরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলে।” তাঁর মতে, এই অণুজীব সম্প্রদায়ের উৎপত্তি এবং পরিবেশগত পরিবর্তনের ও স্থিতিশীলতা সম্পর্কে আরও ভাল ভাবে জানা গেলে সমুদ্রের স্বাস্থ্য রক্ষা করা সহজ হবে।
গবেষণায় যুক্ত রয়েছেন জৈবপ্রযুক্তি বিভাগের স্নাতক স্তরের ছাত্রী প্রণতি রবিকুমার। তিনি জানান, এই গবেষণায় উন্নত পরিবেশবিদ্যাগত পদ্ধতি ব্যবহার করার ফলে সমুদ্রের অণুজীবেরা কী ভাবে পরস্পরের সঙ্গে মিথস্ক্রিয়া, তা-ও বোঝা সম্ভব হয়েছে