কারও ব্যক্তিগত তথ্য নিয়ে খবর করার আগে সাংবাদিককে যদি তাঁর কাছেই অনুমতি চাইতে হয়, তা হলে সংবাদ বিভাগ বা নিউজ়রুমেই তালা পড়ে যেতে পারে। কেন্দ্রীয় সরকারের তথ্যপ্রযুক্তি বিধি (ডিজিটাল পার্সোনাল ডেটা প্রোটেকশন অ্যাক্ট, ২০২৩)-র উপরে অন্তর্বর্তী স্থগিতাদেশ চেয়ে সুপ্রিম কোর্টে এই কথাই বলল ২১টি সংবাদমাধ্যমের সংগঠন ‘ডিজিটাল নিউজ় পাবলিশার্স অ্যাসোসিয়েশন’ (ডিএনপিএ)। সরকার পক্ষের বক্তব্য না-শুনে সেই স্থগিতাদেশ দিতে চায়নি প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত, বিচারপতি জয়মাল্য বাগচী ও বিচারপতি ভি মোহনার বেঞ্চ। বিচারপতিরা কেন্দ্রীয় আইন এবং বৈদ্যুতিন ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রককে নোটিস জারি করেছেন। ১৭ নভেম্বর পরবর্তী শুনানি।
সংশ্লিষ্ট আইনের কয়েকটি ধারাকে ‘অসাংবিধানিক’ বলে ঘোষণার আর্জি জানিয়েছে ডিএনপিএ। এই মঞ্চে রয়েছে মোদী সরকারের ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত মুকেশ অম্বানী ও গৌতম আদানির মালিকানাধীন সংবাদ গোষ্ঠীও। তথ্যপ্রযুক্তি বিধির ৪৪(৩) ধারাটি নিয়েই মূলত আপত্তি ডিএনপিএ-র। সেটির মাধ্যমেই পাল্টে দেওয়া হয়েছে কারও ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশ সংক্রান্ত তথ্যের অধিকার আইনের ৮(১)(জে) ধারাটি। উপরন্তু এই আইনের ৩৬ নম্বর ধারায় কেন্দ্রীয় সরকারকে সংবাদমাধ্যমের কাছ থেকে তথ্য তলবের ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। ডিএনপিএ-র আশঙ্কা, যে ভাবে খবর সংগ্রহ করা হয় এবং তা প্রতিবেদন হিসেবে প্রকাশিত হয়, সেই গোটা প্রক্রিয়াটিই এর ফলে পাল্টে যেতে পারে। সাংবাদিকেরও যদি এখানে ছাড় না-থাকে, তা হলে সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্র সীমিত হয়ে পড়বে। দুর্বল হয়ে পড়বে তদন্তমূলক সাংবাদিকতা। যে সূত্রগুলি থেকে খবর মেলে, তাদের গোপনীয়তাও লঙ্ঘিত হতে পারে।
এ দিনের শুনানিতে ডিএনপিএ-র তরফে আইনজীবী মাধবী দিভান জানান, অপেশাদার সাংবাদিকদের নিয়ে কিছু বিতর্ক আছে। কিন্তু মূল ধারার ঐতিহ্যশালী সংবাদমাধ্যমগুলি সম্ভবত এই প্রথম একযোগে একটি আবেদন করেছে। তিনি বলেন, ‘‘পুরোদস্তুর আগাম কড়াকড়ির (সেন্সরশিপ) জমানা চলছে। আপনার সম্পর্কে খবর করতে হলে আপনারই অনুমতি নিতে হবে! সেটা কী করে সম্ভব? খবর মানে তা হলে কী? আমরা যদি ভুল খবর করি, আমরাই তার ফল ভোগ করব।’’ মাধবী জানান, পুরনো আইনে তা-ও সংবাদমাধ্যমের ছাড় ছিল। আদালত খতিয়ে দেখলেই বুঝতে পারবে, নয়া আইনটি সাংবাদিকতার জন্য নয়। কেন এমনটা হয়েছে, সেই উত্তরও নেই। এই আইনের যে অংশগুলির বিরোধিতা করা হয়েছে, সেগুলি সংবিধানপ্রদত্ত সাম্য, বাক্স্বাধীনতা, মত প্রকাশের স্বাধীনতা, পেশার স্বাধীনতা এবং জীবন ও ব্যক্তিগত স্বাধীনতার পরিপন্থী। কয়েকটি ধারা মৌলিক অধিকারেরও বিরোধী। প্রকাশক, সম্পাদক ও সাংবাদিকদের উপরে এই আইন তথ্য-সুরক্ষার এমন নিয়ম চাপিয়ে দিতে পারে, যা স্বাধীন সংবাদমাধ্যমের কাজ করার পক্ষে উপযুক্তই নয়। সরকারি ক্ষেত্রে অনিয়ম নিয়ে সন্দেহের আতশকাচের নীচে থাকা কোনও ব্যক্তির সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতে হতে পারে সাংবাদিককে। কিন্তু এই আইনের ফলে তদন্তমূলক খবরের স্বার্থে ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ করতে গিয়েও আগাম নোটিস দেওয়া, সম্মতি নেওয়া, সেই সম্মতি প্রত্যাহার অথবা তথ্য মুছে ফেলার মতো পরিস্থিতিতে আটকা পড়তে পারেন তাঁরা।
এই প্রসঙ্গে বিচারপতি কে এস পুত্তাস্বামীর মামলার কথা মনে করিয়ে আবেদনকারীদের তরফে বলা হয়েছে, ওই মামলায় ব্যক্তি পরিসরের অধিকারকে মৌলিক অধিকারের স্বীকৃতি দিয়েছিল সর্বোচ্চ আদালত। তথ্য-নিরাপত্তা পরিকাঠামোরও উচিত বাক্স্বাধীনতা ও জনসাধারণের জানার অধিকারকে মর্যাদা দেওয়া।