জ্ঞানেশ-বিতর্কে ঝড়ের মুখে দাঁড়িয়ে তিন নির্বাচন কমিশনারের মধ্যে ঐক্যের ছবি তুলে ধরবার চেষ্টা করল নির্বাচন কমিশন। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) চলাকালীন তিন কমিশনারের মধ্যে মতানৈক্যের খবর গত বৃহস্পতিবার প্রকাশ্যে এসেছিল। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জানা গিয়েছিল, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের সিদ্ধান্ত নিয়ে ১০ মাসে ১৪ বার লিখিত আপত্তি জানিয়েছিলেন অন্য দুই কমিশনার সুখবিন্দর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী। তাঁদের আপত্তি উড়িয়ে জ্ঞানেশের সিদ্ধান্তই বলবৎ ছিল, যা আইনের পরিপন্থী।
সেই খবরে দেশ জুড়ে ঝড় ওঠার পরে শনিবার প্রথম একত্রে বৈঠকে বসলেন তিন নির্বাচন কমিশনার। বৈঠকের শেষে কমিশনের দেওয়া প্রেস বিবৃতিতে জুড়ে দেওয়া হয়েছে তাঁদের পাশাপাশি বসে থাকার ছবি। আর জানানো হয়েছে, কেন্দ্রের ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠিতে যে আপত্তির কথা রয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তা কমিশন বা তার তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কোনও নীতিগত অবস্থানের বিষয়ে নয়, ডেপুটেশনে কমিশনে আসা এক আধিকারিকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে। দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশের পরে ওই আধিকারিকের নির্দেশগুলি কার্যকরও করা হয়নি বলে কমিশনের দাবি।
প্রেস বিবৃতিতে আরও বলা হয়েছে, প্রথমে বিহার, তার পর পশ্চিমবঙ্গ এবং আরও ৩০টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন করা হবে বলে যে বিজ্ঞপ্তি গত বছর ২৪ জুন জারি হয়েছিল, তা সর্বসম্মতির ভিত্তিতেই দেওয়া। চলতি বছর ২৭ মে সুপ্রিম কোর্ট সেই বিজ্ঞপ্তিকে বৈধ বলে রায় দিয়েছে। ১২টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য ২০২৫ সালের ২৭ অক্টোবর এবং ১৯টি রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলের জন্য ২০২৬ সালের ১৪ মে জারি করা বিজ্ঞপ্তিগুলিও ঐকমত্যের ভিত্তিতে দেওয়া হয়।
ঘটনাচক্রে, যে যে বিষয়ে দুই নির্বাচন কমিশনারের আপত্তির কথা সামনে এসেছে, এ দিন কমিশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে সেগুলি সংশোধন করার কথাও বলা হয়েছে। যেমন, এসআইআর প্রক্রিয়া চলাকালীন ভোটার তালিকায় নাম যোগ-বিয়োগের ক্ষেত্রে বিভিন্ন রাজ্যের ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারের (ইআরও) ক্ষমতা কার্যত কেড়ে নিয়েছিল নির্বাচন সদন। অভিযোগ, গোটা প্রক্রিয়াটিই নিয়ন্ত্রিত হয়েছিল দিল্লি থেকে। দুই কমিশনারের চিঠিতে তেমন অভিযোগ করা হয়েছিল। এ দিনের প্রেস বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বাদ পড়া নাম নতুন করে তোলা বা নতুন ভোটারের নাম অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে ইআরও-রাই নথি খতিয়ে দেখে সিদ্ধান্ত নেবেন।
পশ্চিমবঙ্গ
যদিও পশ্চিমবঙ্গে এসআইআর প্রক্রিয়ার সময় যাঁদের নাম বাদ গিয়েছে, তাঁরা এই সিদ্ধান্তে কতটা সুবিধা পাবেন তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কমিশনের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে, যে যে রাজ্যে এসআইআর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যেই শেষ হয়ে গিয়েছে, সেখানে বাদ পড়া নাম তুলতে আবেদন করতে হবে ইআরও-দের কাছে। নতুন ভোটার হিসাবেই আবেদন করতে হবে ফের। এ রাজ্যে নাম যাঁদের বাদ পড়েছে তাঁদের একটা বড় অংশই শীর্ষ আদালতের নির্দেশে তৈরি ট্রাইবুনালে আবেদন করেছেন। ফলে শীর্ষ আদালত সম্মতি না দিলে তাঁদের সরাসরি নতুন ভোটার হিসাবে নাম তোলার প্রক্রিয়ায় অন্তর্ভুক্ত করা যাবে না বলেই ইঙ্গিত মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দফতরের।
পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরের পরে খসড়া তালিকায় বাদ পড়েছিল মোট ৬৩ লক্ষ ৬৬ হাজার ৯৫২ জনের নাম। চূড়ান্ত তালিকায় বাদ পড়েছিল ৯০ লক্ষ ৮৩ হাজার ৩৪৫ নাম। বিবেচনাধীন ছিল ৬০ লক্ষ ০৬ হাজার ৬৭৫ নাম। তাঁদের মধ্যে ৩২ লক্ষ ৬৮ হাজার ১১৯ জনের নাম শুনানি করে তালিকায় ঢোকানো হয়। ট্রাইবুনালে পাঠানো হয় ২৭ লক্ষ ১৬ হাজার ৩৯৩ জনের নাম। ট্রাইবুনালে আবেদন জমা পড়েছে ৩৮ লক্ষ ২০ হাজার ৬৮৩ জনের। তাঁদের মধ্যে নাম বাদ দেওয়ার আবেদনও রয়েছে। এসআইআরের পর থেকে নতুন করে নাম তোলার কাজ তেমন ভাবে হচ্ছে না বলে অভিযোগ উঠেছে। শনিবার কমিশন যে বিজ্ঞপ্তি দিল, ট্রাইবুনালে আবেদনকারী ছাড়া, যাঁদের প্রথম দফায় নাম বাদ গিয়েছিল, তাঁরা আবার পুরনো পদ্ধতিতে নাম তুলতে পারবেন। এসআইআর মামলার সঙ্গে যুক্ত আইনজীবী ফিরদৌস শামিম বলেন, ‘‘পশ্চিমবঙ্গে নতুন করে নাম তোলা কার্যত বন্ধ ছিল। সেটা চালু হলে নতুন করে নাম তোলার সুযোগ থাকছে। তবে ট্রাইবুনালে আবেদনকারীরা আপাতত এই সুবিধা পাবেন না।’’ এর সঙ্গেই ফিরদৌস বলেন,‘‘ আজকের প্রেস বিজ্ঞপ্তি থেকে স্পষ্ট,যে কমিশনের পদ্ধতিতে বড় গোলযোগ ছিল। কমিশনের নেওয়া আজকের সিদ্ধান্ত থেকে স্পষ্ট, যে অভিযোগ গুলো উঠেছিল, সে গুলো ভিত্তিহীন নয়।”
অন্য যে সব রাজ্যে এসআইআর চলছে, সেখানে যাঁদের ‘তথ্যগত অসঙ্গতি’ এবং ‘আনম্যাপড’ হওয়ার কারণে নোটিস পাঠানো হচ্ছে, তাঁদের বাড়িতে গিয়ে বিএলও-রা নথি নিয়ে আসতে পারবেন। সেই নথি ইসিআইনেটে আপলোড করা হবে। তাঁকে ইআরও-র অফিসে হাজিরা দিতে হবে না। দরকারে অনলাইনে ইআরও তাঁর শুনানি করতে পারবেন।
ফর্ম ৬
ফর্ম ৬ ব্যবহার করে নতুন ভোটারেরা ভোটার তালিকায় নাম তোলার আর্জি জানান। এ বার সেই ফর্মে নতুন ভোটারদের জানাতে হয়েছে যে, আগের এসআইআরে বাবা বা পিতামহের নাম রয়েছে কি না। সরকার এই সংক্রান্ত আইনে সংশোধন করার আগে ফর্ম বদলানো ঠিক হবে না বলে আগেই সতর্ক করেছিলেন সঁধু। কিন্তু সেই সতর্কতা কানে নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদন অনুসারে, সঁধু এই ফর্ম ৬-কে অবৈধ বলেছিলেন। শনিবার বিবৃতি দিয়ে কমিশন জানিয়েছে, ফর্ম ৬ আবেদনের সঙ্গে ভোটারদের যে ঘোষণাপত্র দিতে হয়েছে, তা বহাল রেখেছিল সুপ্রিম কোর্ট। এসআইআর প্রক্রিয়া ছাড়া অন্য সময়ে ভোটার তালিকায় নাম তোলার জন্য ১৯৬০ সালের রেজিস্ট্রেশন অফ ইলেক্টর্স নীতি মেনে সাধারণ ফর্ম ব্যবহার করতে হবে।
ইসিআইনেট
দুই কমিশনারের এ-ও অভিযোগ যে, স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির বিষয়টি এখন আর বিকেন্দ্রীভূত ভাবে নিয়ন্ত্রিত হয় না। গোটা বিষয়টি নাকি নিয়ন্ত্রণ করেন কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের ডিরেক্টর জেনারেল সীমা খন্না। এমনিতে প্রতিটি নির্বাচনী কেন্দ্রের ভোটার তালিকা তৈরি এবং সংরক্ষণের কাজের দায়িত্ব থাকে নির্বাচনী নিবন্ধন আধিকারিক বা ইআরও-দের কাছে। আগে ‘ইআরওনেট’ সফ্টওয়্যারে ভোটার তালিকা থাকত। এখন তা থাকে ‘ইসিআইনেট’-এ। ভোটার তালিকায় নাম সংযোজন এবং বাদ দেওয়ার কাজে ইআরও-দের ক্ষমতা হ্রাস করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে একাধিক বার প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার। অগস্টে দেশের অন্যতম নির্বাচন কমিশনার সঁধু অভিযোগ করেন, দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাচনী আধিকারিকদের ‘ইআরওনেট’ পোর্টালে ঢোকার অধিকার নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। কমিশনের তরফে জানানো হয়েছে, আধিকারিকদের তাঁদের ক্ষমতা অনুসারেই পোর্টালের অ্যাক্সেস দেওয়া হয়েছে। তারা ঘোষণা করেছে, ইসিআইনেটের পর্যালোচনা করা হবে। কমিটির শীর্ষে থাকবেন সিনিয়র ডেপুটি নির্বাচন কমিশনার। আইআইটি বা আইআইআইটির বিশেষজ্ঞও থাকবেন কমিটিতে। ইসিআইনেট সফ্টওয়্যারের নিরপেক্ষ বিশেষজ্ঞ দিয়ে পর্যালোচনার প্রস্তাব আগেই দিয়েছিলেন দুই নির্বাচন কমিশনার, যা সেই সময় গ্রাহ্য করা হয়নি বলে অভিযোগ। অফিসারদের কাজের জন্য কোনও বিশেষ সুবিধার প্রয়োজন হলে তা-ও দেওয়া হবে। এই সংক্রান্ত কোনও কিছু পরিবর্তন করতে চাইলে কমিটি তা আগে নিজেদের মধ্যে আলোচনা করে নেবে। পরে তা কমিশনের কাছে প্রস্তাব করবে।
ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি
কমিশনের তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের প্রধান সীমা খন্নার ভূমিকা নিয়েও আপত্তি জানিয়েছিলেন সঁধু, এমনটাই বলা হয় ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের প্রতিবেদনে। সঁধু বলেন, “আইন অনুযায়ী তিনি এটি (পোর্টাল) নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন না।” তাঁর এক্তিয়ার নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন দুই কমিশনার। সেই নিয়ে ক্যাবিনেট সচিবকে চিঠি দেওয়া হয়েছিল বলেও খবর। এসআইআর পর্বে সীমার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিল তৃণমূল। ঐক্যবদ্ধ বিবৃতিতে ‘ডেপুটেশনে থাকা’ এক অফিসারের বিষয় উল্লেখ করা হয়েছিল। মনে করা হচ্ছে, তিনি সীমা। প্রসঙ্গত, সীমা নিজে ডেপুটেশনে এসেছিলেন। শনিবারের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, কেন্দ্রের ক্যাবিনেট সচিবকে পাঠানো চিঠিতে যে আপত্তির কথা রয়েছে বলে বলা হচ্ছে, তা কমিশন বা তার তথ্যপ্রযুক্তি বিভাগের কোনও নীতিগত অবস্থানের বিষয়ে নয়, ডেপুটেশনে কমিশনে আসা এক আধিকারিকের সিদ্ধান্তের বিষয়ে। দুই নির্বাচন কমিশনারের নির্দেশের পরে ওই আধিকারিকের নির্দেশগুলি কার্যকরও করা হয়নি বলে কমিশনের দাবি।
আরও পড়ুন:
সময়সীমা বৃদ্ধি
দিল্লিতে এসআইআর নিয়ে কিছু বলার থাকলে বা কোনও আপত্তি থাকলে তিনি তা জমা করার জন্য আরও সময় পাবেন। সেখানে অভিযোগ জমা করার সময়সীমা বাড়িয়ে ৩০ অক্টোবর করেছে কমিশন। সেই নিয়ে নিষ্পত্তির সময়সীমা বেড়ে হয়েছে ৩০ নভেম্বর। মহারাষ্ট্রে অভিযোগ জানানোর সময়সীমা বেড়ে হয়েছে ১২ অক্টোবর। নিষ্পত্তি করার সময়সীমা বেড়ে হয়েছে ১০ নভেম্বর।
গোয়ায় এসআইআরের খসড়া তালিকায় যে ভোরাদের নাম ওঠেনি, তাঁদের বাড়ি যেতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বিএলওদের। সেখানে গিয়ে ফর্ম ৬ সংগ্রহ করবেন তাঁরা। এ রকম ৯৭ জন ভোটারের মধ্যে ৮১ জন ইতিমধ্যে ফর্ম ৬ ভরেছেন।
‘দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর অন্তর্তদন্তমূলক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, দুই নির্বাচন কমিশনার সুখবীর সিংহ সঁধু এবং বিবেক জোশী একাধিক বিষয়ে জ্ঞানেশকে কাঠগড়ায় তুলেছেন। সঁধু এবং জোশীর অভিযোগ, তাঁদের অন্ধকারে রেখে যাবতীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ। ‘ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস’-এর প্রতিবেদন অনুসারে, গত ১০ মাসে ১৪ বার কমিশনের সিদ্ধান্তে আপত্তি জানিয়েছেন দুই নির্বাচন কমিশনার সঁধু এবং জোশী। কমিশনের একটি সিদ্ধান্ত এবং নির্দেশিকা নিয়ে এক দিনেই চার বার আপত্তি জানিয়েছেন তাঁরা। কিন্তু কোনও বারেই তাঁদের আপত্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়নি বলে ওই প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তার পরেই জ্ঞানেশের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন বিরোধীরা। এমনকি, এনডিএর শরিক তিন দলও। সিজেপি মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদ থেকে জ্ঞানেশের ইস্তফা চেয়ে আন্দোলনে বসার হুঁশিয়ারি দেয়। সেই প্রতিবেদন প্রকাশের পরে শনিবার প্রথম বৈঠকে বসলেন তিন কমিশনার। তার পরে বিবৃতি প্রকাশ করে তাঁদের ‘ঐক্যের’ ছবিই তুলে ধরার চেষ্টা করলেন।