“চক দে, চক দে ইন্ডিয়া!” গর্জন করছে যন্তর মন্তর। নেচে চলেছে যন্তর মন্তর। হাঁফ ছেড়ে বাঁচা র্যাফ এবং দিল্লি পুলিশের দিকে যুগপৎ চুম্বন এবং গোলাপ ছুড়ে বেরিয়ে যাচ্ছেন ষোড়শী-অষ্টাদশী ছাত্রীরা। চিৎকার করতে করতে, “আঙ্কল উই অল লাভ ইউ! আপনারা ভাল থাকবেন।”
আর কি কখনও এমন সন্ধ্যা হবে যন্তর মন্তরে? গোটা দেশের জেন জ়ি-র রাস্তা যেখানে একাকার হয়েছিল গত এক পক্ষকাল। যন্তর মন্তর বলছে, হবে, আবারও হবে। কারণ সমবেত স্লোগানে স্পষ্ট, “ইয়ে তো স্রিফ ঝাঁকি হ্যায়, আসলি কাম বাকি হ্যায়!” প্রবল আর্দ্রতা অগ্রাহ্য করে আজ যেন বিজয়া দশমীর গোধূলি উৎসব যন্তর মন্তরে।
টাইফয়েডে আক্রান্ত সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকের একটি মুষ্টিতে চ্যানেল করা ওষুধের জন্য। অন্য মুষ্টি বার বার আকাশের দিকে ছুড়ে দিচ্ছেন জয়ের খবর পাওয়ার পরে। বললেন, “আপনি যদি আমাদের আরশোলা না বলতেন…!” কার উদ্দেশে এ কথা বলা তা এতই স্পষ্ট যে, আজ আর নাম করলেন না দীপকে। তাঁর কথায়, “ওরা বার বার বলত, এই সরকারে কেউ নাকি ইস্তফা দেয় না। আমরা বলি, এই দুনিয়াকে ঝুঁকিয়ে দেওয়া সম্ভব, যদি কেউ তা মনেপ্রাণে চায়।” আবেগতাড়িত নেতৃত্ব প্রশ্নপত্র ফাঁসের পরে আত্মহত্যাকারীদের ছবি সামনে নিয়ে এলেন প্রধানের ইস্তফার খবর আসার পরেই। একে একে তাঁদের নাম ঘোষণার মতো করে পড়া হল। দীপকের কথায়, “নরেন্দ্র মোদীজিকে মনে করিয়ে দিতে চাই, সুবহা হো গয়া মামু! গণতন্ত্রের ভোর হয়ে গিয়েছে। এ তো সবে শুরু। একটা উইকেট পড়ল। এখানেই আমরা থামছি না। ছত্রিশ দিন ধরে যে সব ছাত্র, স্বেচ্ছাসেবী টানা বসে রয়েছেন তাঁদের সবাইকে সেলাম জানাই।” সেই সঙ্গে তাঁর সতর্কবাণী, “একটা কথা স্পষ্ট করে দিতে চাই। আজ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের কারণে আমাকে হিরো বানাবেন না। গোটা দেশের সর্বনাশ হয়েছে এক জন ব্যক্তিকে হিরো বানিয়ে।”
পুরনো দিল্লির এক জন দোকানদার আসলাম ওমর চলে এসেছেন দুটো বড় হাঁড়ি বিরিয়ানি নিয়ে। প্লাস্টিকের বাটিতে বেড়ে দিচ্ছেন সম্পূর্ণ বিনামূল্যে। সঙ্গে অনর্গল স্লোগান, “ইনকিলাব জ়িন্দাবাদ।” পাশেই শিখদের একটি ছোট দল নিয়ে এসেছে হালুয়ার বাক্স। তাঁরা জানালেন, গোড়া থেকেই ছাত্রদের আন্দোলনে ছিলেন, কারণ বাড়িতে পড়ুয়া সন্তান রয়েছে। হাতে হাতে ঘুরছে বাবাসাহেব ভীমরাও অম্বেডকর এবং সোনম ওয়াংচুকের ছবি। সিজেপি-র এক নেতার কথায়, “জয় ভীম স্লোগান দেওয়া নিয়ে অনেকে প্রশ্ন তুলছিলেন। আজ তো বাবাসাহেবের সংবিধানেরই জয় হল।”
যন্তর মন্তরে সিজেপি যে ভাষ্য নিয়ে আন্দোলন শুরু করেছিল তা গত এক পক্ষকালে আসলে ক্রমশই বদলেছে, এমনটা মনে করছেন অনেকেই। নয়ডার একটি বেসরকারি কলেজের ‘ইলেকট্রনিক অ্যান্ড কমিউনিকেশন’ বিভাগের ছাত্র উদয় মিত্তল। মাকে সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সকালে, আজ যে আন্দোলনের শেষ দিন তা না জেনেই। তাঁর বক্তব্য, “আসল কথা হল আমি সব মিলিয়ে খুবই ভয়ে রয়েছি। আমার সিনিয়রদের দেখছি পাশ করে অ্যাপ-এর গাড়ি চালাচ্ছে নয় অ্যাপ-নির্ভর ডেলিভারি সংস্থায় কাজ করে বাড়ি বাড়ি ঘুরছে। আমার বাবা-মা ভাবেন আমি খুব ভাল একটা চাকরি পাব। কিন্তু শেষে যদি অ্যাপের গাড়ি চালাতে হয়, ওঁদের মন ভেঙে যাবে।” পাশেই দাঁড়ানো মা সোনালি মিত্তল বলছেন, “প্রত্যেক বাবা-মার স্বপ্ন থাকে সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে। কিন্তু ছাত্রদের আত্মহত্যা আমায় নাড়িয়ে দিয়েছে।” কানপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের ইঞ্জিনিয়ারিং-এর ফাইনাল ইয়ারের ছাত্র হর্ষিত বলেছেন, “মনে হচ্ছে সব দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। আমাদের কলেজ থেকে পাশ করে যা চাকরি জুটছে তাতে তাওয়া গরম হয় না। তার উপরে এআই এসে কাজের সুযোগ কমাচ্ছে। বাজারে দাম আগুন।”
এক সপ্তাহ ধরে বন্ধুদের সঙ্গে রাতে আসছিলেন তথ্যচিত্র নির্মাতা নানদ্রিসগা ওয়াখলু, বয়স ত্রিশের উপরে। বলছেন, “এখন আর বিষয়টা শুধুমাত্র পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ হয়েই থাকছে না। বহু দিনের পুঞ্জীভূত হতাশার প্রতিফলন ঘটছে। যুবকেরা ভোট দিতে শুরু করেছেন, প্রশ্ন করতে শুরু করেছেন মূল্যবৃদ্ধি, বেকারি এবং দুর্নীতি নিয়ে। দেখবেন এর পরে বারবার আন্দোলন হবে।”