এক দিকে নরেন্দ্র মোদী। অন্য দিকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।
রোজ ভ্যালি কাণ্ডে তৃণমূল সাংসদ সুদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়কে গ্রেফতারের পর এখন দু’পক্ষই খাপ থেকে তরবারি বের করে সম্মুখ সমরে। গত দু’দিন ধরে দিল্লিতে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন তৃণমূল সাংসদেরা। রাজ্যেও বিজেপি-র বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত তারা। সুদীপকে গ্রেফতারের দিন কলকাতায় বিজেপি-র সদর দফতরে তৃণমূল কর্মীদের চড়াও হওয়া এবং তার পর সেখানে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানো নিয়ে প্রবল স্নায়ুর যুদ্ধ শুরু হয়েছে।
রাজ্য বিজেপি নেতারা চাইছেন, মমতা-বিরোধী সুর যে ভাবে চড়ানো হয়েছে, তার থেকে যেন কোনও ভাবেই পিছিয়ে আসা না হয়। তাঁদের মতে, মমতা যেমন মোদী-বিরোধী রাজনীতিকে মূলধন করে জাতীয় রাজনীতির চরিত্র হয়ে উঠতে চাইছেন, তেমনি বিজেপি-র পক্ষেও তৃণমূল বিরোধিতাকে হাতিয়ার করে রাজ্য রাজনীতির বিরোধী পরিসর দখল করা সম্ভব। ওই নেতাদের বক্তব্য, বিধানসভা ভোটের পরে বাম এবং কংগ্রেসই রাজ্যের মুখ্য বিরোধী মুখ হয়ে উঠেছিল। কিন্তু নোট-নাকচের পরে বিজেপি-ই সেই জায়গা দখল করে নিয়েছে। রাজনৈতিক তাপমাত্রা তুঙ্গে থাকলে ক্রমশ বাম এবং কংগ্রেসকে অপ্রাসঙ্গিক করে দেওয়া সম্ভব। সিদ্ধার্থনাথ সিংহের মতো পশ্চিমবঙ্গের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতাও এই মতের সমর্থক।
কিন্তু বিজেপি কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের একাংশ মমতার সঙ্গে বিবাদকে ‘পয়েন্ট অব নো রিটার্ন’-এ নিয়ে যেতে চাইছেন না। তাঁদের বক্তব্য, এমনিতেই নোট-নাকচ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকার খানিকটা কোণঠাসা। তার উপর চলতি মাসের শেষে বাজেট অধিবেশন। সেই সঙ্গে রয়েছে যত দ্রুত সম্ভব পণ্য ও পরিষেবা কর (জিএসটি) চালু করার দায়। এই পরিস্থিতিতে জাতীয় রাজনীতিতে যখন একটা বিরোধী জোট তৈরি হয়েছে, তখন মমতাকে আক্রমণ করে কংগ্রেসের দিকে আরও বেশি করে ঠেলে দেওয়াটা রাজনৈতিক বুদ্ধিমত্তার কাজ নয়।
বিশেষত কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রী অরুণ জেটলি এই রাজনৈতিক প্রতিহিংসার লাইনের সম্পূর্ণ বিপক্ষে। সিদ্ধার্থনাথ সিংহ এবং রাজ্য বিজেপি-র কিছু নেতা চাইলেও গত বিধানসভা ভোটের সময় তিনি মমতার জঙ্গি বিরোধিতা করতে রাজি হননি। তখন বিজেপি-র একাংশ চেয়েছিল, তৃণমূল নেতাদের বিরুদ্ধে সারদা কাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ নিয়ে কেন্দ্রীয় অর্থ মন্ত্রক সক্রিয় হোক। কিন্তু জেটলি ঘনিষ্ঠ মহলে জানিয়েছিলেন, সিবিআই তাঁর এক্তিয়ারের মধ্যে পড়ে না। আর আর্থিক গোয়েন্দা বিভাগ যে সব মামলা নিয়ে তদন্ত করছে সেগুলির ফাইলও তাঁর কাছে নেই। পাশাপাশি, শীর্ষ নেতৃত্বকে তিনি বারবার বলেছিলেন, মমতা বিপুল ভোটে জিতবেন। জেটলির সেই অবস্থানে তখন ক্ষুব্ধ হয়েছিলেন সিদ্ধার্থনাথ।
কিন্তু কেন্দ্র-রাজ্য সংঘাতের এই পর্বেও সংযমী পদক্ষেপ করার পক্ষেই সওয়াল করেছেন জেটলি। গত মঙ্গলবার কলকাতায় বিজেপি দফতরে বাড়তি কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী ক্ষুব্ধ। তিনি প্রশ্ন তুলেছেন, রাজ্য সরকারের অনুমতি ছাড়া কেন্দ্র কি সিআরপিএফ পাঠাতে পারে? কারণ আইনশৃঙ্খলা তো রাজ্যের এক্তিয়ারভুক্ত বিষয়। বলা হচ্ছে, বিজেপি নেতা
রাহুল সিংহ কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা পান। তাঁর নিরাপত্তার জন্যই সে দিন বাড়তি বাহিনী পাঠানো হয়েছিল। সেই যুক্তি মানতে নারাজ রাজ্যের শাসক দল। তাদের অভিযোগ, রাজ্যকে
এড়িয়ে বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছিল বিজেপি অফিসেই।
জেটলির মতো কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের কেউ কেউ মনে করছেন, রাজ্য সরকারের অনুমতি না নিয়ে এ ভাবে কেন্দ্রীয় বাহিনী পাঠানোর মধ্যে সাংবিধানিক ও পদ্ধতিগত ত্রুটি রয়েছে। তাদের বক্তব্য, কোনও ব্যক্তির নিরাপত্তার জন্য কেন্দ্র বাহিনী দিতেই পারে। কিন্তু সেটাও রাজ্যকে জানাতে হয়। আর স্বতঃপ্রণোদিত ভাবে রাজ্যের কোথাও বাহিনী মোতায়েনের তো প্রশ্নই নেই। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংহের মতও অনেকটা তা-ই বলে কেন্দ্রীয় সরকারি সূত্রের খবর।
কেন্দ্রীয় বাহিনীর প্রশ্নে বিভাজন রাজ্য বিজেপিতেও। সূত্রের খবর, রাহুল সিংহ বাহিনী চাওয়ায় দলের রাজ্য সভাপতি দিলীপ ঘোষ-সহ অনেক নেতাই ক্ষুব্ধ। তাঁদের বক্তব্য, দলের সঙ্গে কোনও রকম আলোচনা না করে বাহিনী মোতায়েনের ব্যাপারে সক্রিয় হয়ে আখেরে দল তথা কেন্দ্রকে বিপাকে ফেলেছেন রাহুল। তাঁর ভূমিকার ফলে প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে রাজ্যের এক্তিয়ারে হস্তক্ষেপ নিয়ে।
এই অবস্থায় আজ তাঁর ঘনিষ্ঠ সিদ্ধার্থনাথকে নিয়ে রাজনাথের কাছে ছুটেছিলেন রাহুল। সঙ্গে ছিলেন বাবুল সুপ্রিয়, জর্জ বেকারের মতো নেতারা। কিন্তু দিলীপ ছিলেন না। রাহুল শিবির দাবি করছেন, দলের জাতীয় সচিব হিসাবে তিনি রাজনাথের সঙ্গে দেখা করতেই পারেন। সে জন্য রাজ্য সভাপতিকে সঙ্গী করার প্রয়োজন নেই। তা ছাড়া, সে দিন তিনি আদৌ কেন্দ্রীয় বাহিনী চাননি বলেও রাহুলের দাবি। যদিও দিলীপ ঘোষের ঘনিষ্ঠ মহল বলছে, বাহিনী নিয়ে বিতর্কের মুখে পড়েই তড়িঘড়ি রাজনাথের সঙ্গে দেখা করে ভুল বোঝাবুঝি মেটাতে চেয়েছেন রাহুল।
তবে গত মঙ্গলবারের ঘটনা নিয়ে রাজ্যপালকে মাঝে রেখে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক যে ক্রমেই তপ্ত হচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। আর তাতে শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রীয় কাঠামোই ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলে আশঙ্কা কেন্দ্রীয় সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বের একাংশের। তাঁদের বক্তব্য, দুর্নীতির অভিযোগ নিয়ে সিবিআই তদন্ত যেমনই হোক, কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে সম্পর্ক যাতে তলানিতে গিয়ে না ঠেকে সে জন্য দু’পক্ষেরই সক্রিয় হওয়া দরকার।
কিন্তু প্রশ্ন হল, বেড়ালের গলায় ঘণ্টাটা বাঁধবে কে!