অনশন মঞ্চ ফাঁকা। সবাই অনশন মঞ্চ দেখতেই ছুটে এসেছেন। জওহরলাল নেহরু, অম্বেডকর, দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা। আগামী বছর নিট-এর প্রস্তুতিতে ব্যস্ত পরীক্ষার্থী। স্কুল, কলেজ পড়ুয়াদের অভিভাবক। স্কুলের শিক্ষক, কলেজের অধ্যাপক, কোচিং সেন্টারের শিক্ষক। আইনজীবী। সমাজকর্মী। বেসরকারি চাকুরে। সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ। কেনেই জমায়েতে!
নিট-এর প্রশ্ন ফাঁস, দেশ জুড়ে ২০ জনের বেশি ছাত্রছাত্রীর আত্মহত্যায় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফার দাবিতে গত তিন সপ্তাহ ধরে দিল্লির যন্তর মন্তরে অনশন করছিলেন সোনম ওয়াংচুক। প্রথম দিনে তেমন জমায়েত না হলেও গত তিন-চারদিনে ওয়াংচুকের স্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ বাড়ায় ভিড় বেড়েছিল। শনিবার সাতসকালে দিল্লি পুলিশ সোনম ওয়াংচুককে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে যন্তর মন্তর সবচেয়ে বেশি ভিড়ের সাক্ষী রইল।
শনিবার গভীর রাতেও সেখানে ছিল থিকথিকে ভিড়। পুলিশ অন্য অনশনকারীদের তুলে দেওয়ার চেষ্টা করতে পারে বলে ককরোচ জনতা পার্টি, আইসা, এসএফআই তাদের সমর্থকদের যন্তর মন্তরে থাকতে বলেছে। ফলে ভিড় আরও বেড়েছে।
এত দিন যন্তর মন্তর থেকে দাবি উঠছিল, কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর পদ থেকে ধর্মেন্দ্র প্রধানকে ইস্তফা দিতে হবে। শনিবার যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টি দাবি তুলল, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে পদত্যাগ করতে হবে। দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তর থেকে অনশনরত অবস্থায় সোনমকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে অনশনে বসেছেন ককরোচ জনতা পার্টির প্রধান অভিজিৎ দীপকে। ছাত্র সংগঠন আইসা-র তিন নেতানেত্রী, নেহা, মণীশ, অমিন-ও গত ২১ দিন ধরে অনশন করছিলেন। তাঁরাও অনশন চালিয়ে যাচ্ছেন। অনশন শুরু করেছেন এসএফআই-এর সর্বভারতীয় সভাপতি আদর্শ এম সাজি এবং যুগ্ম সম্পাদক ঐশী ঘোষও। দাবি একই, ধর্মেন্দ্র প্রধানের ইস্তফা। এনটিএ বাতিল করা। সংসদের অধিবেশনে নিট-পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁস-সহ শিক্ষা ব্যবস্থার যাবতীয় দুর্বলতা নিয়ে আলোচনা।
সোনমকে যন্তর মন্তর থেকে তুলে নিয়ে যাওয়ার পরে শুধু যে অনশনকারীর সংখ্যা বেড়েছে তা নয়, এই ঘটনায় গোটা বিরোধী শিবির ফের এককাট্টা হয়েছে। ককরোচ জনতা পার্টির অভিজিৎ দীপকেদের সামনেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। শনিবার বিকালে আচমকাই এক মহিলা অভিজিতের মুখে কালি ছিটিয়ে দেন। বরখা ত্রেহান নামে ওই মহিলাকে আটক করা হয়। কেন কালি ছুড়লেন, তা নিয়ে প্রশ্ন করলে বরখা শুধু একটাই উত্তর দিয়েছেন, ‘জয় শ্রীরাম’। অভিজিতের আশঙ্কা, ‘‘শনিবার রাতে বা রবিবার রাতে পুলিশি অভিযান চালিয়ে যন্তর মন্তর থেকে বাকি বিক্ষোভকারীদেরও তুলে দেওয়ার চেষ্টা হতে পারে।’’
শনিবার সাতসকালে আইসা-র তিন নেতানেত্রী নেহা, মণীশ ও অমিনকেও তুলে নিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছিল দিল্লি পুলিশ। কিন্তু আইসা ও অন্যান্য ছাত্র সংগঠনের কর্মীরা তাঁদের সামনে মানবপ্রাচীর তৈরি করে ফেলেন। গত ২১ দিন ধরে অনশনরত জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি-রত নেহা, ইলাহাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের মণীশ ও দিল্লির অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ের অমিনেরও শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়েছে। কিন্তু তিন জনেই জানিয়েছেন, মোদী সরকার ধর্মেন্দ্র প্রধানকে শিক্ষামন্ত্রীর দাবি থেকে সরানো না পর্যন্ত তাঁদের অনশন চলবে।
শনিবার যন্তর মন্তরে এসেছিলেন অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্লোবাল স্টাডিজ় নিয়ে স্নাতকের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী মান্যতা ও তাঁর সহপাঠীরা। সোনম ওয়াংচুক নেই। কিন্তু অনশনকারী অমিনদের তাঁবুর সামনে তাঁদের কথা শুনছিলেন মান্যতারা। রাজনীতি থেকে দূরে থাকা কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের এমন অনেক পড়ুয়াই শনিবার এসেছিলেন। এসেছেন বৃন্দা কারাট, যোগেন্দ্র যাদবের মতো রাজনীতিবিদ, সমাজকর্মী, কৃষক সংগঠনের নেতারাও।
সোনম সোমবার বাদল অধিবেশনের প্রথম দিন ‘সংসদ চলো’ অভিযানের ডাক দিয়েছিলেন। সেখানে বিরোধী দলের সাংসদরাও যোগ দেবেন বলে জানিয়েছেন। দিল্লি পুলিশ বা কেন্দ্রীয় সরকার ‘সংসদ চলো’ অভিযান কতটা করতে দেবে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। কারণ, সংসদের অধিবেশনের সময়ে সংসদ মার্গ, তার পাশে যন্তর মন্তর, রফি মার্গ-সহ গোটা এলাকায় কোনও রকম জমায়েত, মিছিলের অনুমতি দেওয়া হয় না। ওয়াংচুকের স্ত্রী গীতাঞ্জলি আংমো বলেন, ‘‘তরুণরা আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। সোনম না পারলেও আমি সোমবার সংসদ চলো অভিযানে ওঁর প্রতিনিধিত্ব করব। সোনমকে জোর করে সরিয়ে ওঁরা আমাদের থামাতে পারবে না।’’
যন্তর মন্তর থেকে দূরত্ব রেখে চললেও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী শনিবার বলেছেন, ‘‘মোদী সরকারের চরিত্রের মধ্যে অসত্য ও হিংসা রয়েছে। সোনম ওয়াংচুক যন্তর মন্তরে অহিংস আন্দোলন করছিলেন। তাঁকে তুলে নিয়ে যাওয়াটা ভুল। প্রশ্ন ফাঁস, শিক্ষার খরচ, ছাত্রছাত্রীদের আত্মহত্যা, এগুলো দেশের ভবিষ্যতের জন্য গুরুতর প্রশ্ন। এই সব প্রশ্ন তোলা থেকে কোনও শক্তি দেশের ছাত্রদের আটকাতে পারবে না।’’
সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদবের অভিযোগ, ‘‘বিজেপি কখনও মহাত্মা গান্ধীকে অনুসরণ করেনি। গান্ধীবাদী প্রতিবাদেও আস্থা রাখেনি। আলোচনা নয়, বিজেপির মতাদর্শ হল বিবাদের।’’ আম আদমি পার্টির অরবিন্দ কেজরীওয়াল বলেন, ‘‘গান্ধীজি দিনের পর দিন অনশন করেছেন। তাঁর সঙ্গে ব্রিটিশরা এমন আচরণ করেননি। আমি মোদীজিকে প্রশ্ন করতে চাই, এই তরুণরা কী চাইছেন? শুধু একটা ভাল শিক্ষা ব্যবস্থা। কিন্তু মোদী সরকার গোটা আন্দোলনকে অপবাদ দিয়ে, ব্যর্থ করতে চাইছে।’’