কত দূর থেকে ঢেউয়ের শব্দ শোনা যায়? মূল বিক্ষোভ মঞ্চের কিলোমিটার দেড়েক দূরে সংসদ মার্গ থেকে যন্তর মন্তরের পথে পা বাড়ালেই অহর্নিশ যা শোনা যাচ্ছে, তা অবিকল সমুদ্রের ঢেউয়ের শব্দ। তরঙ্গের মতো তাতে আছড়ে পড়ছে সব বয়স, শ্রেণি, ধর্মের মানুষ।
আজ কনস্টিটিউশন ক্লাবে দুপুরে কেন্দ্রীয় মন্ত্রীদের সঙ্গে সিজেপি-র প্রতিনিধিদের এক ঘণ্টার বৈঠকের পরে বিক্ষোভে ভাটা তো পড়েইনি, বরং বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে তা আরও উত্তাল। অষ্টমীর রাতের কলেজ স্কোয়ারের মতো দমবন্ধ ভিড়। তফাত, এখানের ভিড় স্লোগানে, মিম-এর প্রিন্টআউট নেওয়া পোস্টার, প্ল্যাকার্ড, ফেস্টুন এবং নরেন্দ্র মোদী-বিরোধী গর্জনে ভরা। পদপিষ্ট হওয়ার ভয়কে জয় করেই স্কুলের নীচের শ্রেণিতে পড়া শিশু, মেয়েদের দল থেকে বয়স্কদের পদপাত। হরিয়ানা, উত্তরপ্রদেশের গ্রাম-মফস্সলের সঙ্গে খান মার্কেট, লোদী রোড, মোতি বাগ, গ্রেটার কৈলাসের জেন জ়ি একাকার।
এটা ঘটনা যে, বিক্ষোভের রাশ ক্রমশই সিজেপি-র হাত থেকে বেরিয়ে গিয়েছে। তাদের নেতারা মঞ্চে রয়েছেন, অনশন করেছেন, সরকারের সঙ্গে দর-কষাকষি করছেন ঠিকই। কিন্তু ভিড় নিজেই নিজের দায়িত্ব নিয়ে নিয়েছে যেন। বিভিন্ন বয়সের, বিভিন্ন গোত্রের ছাত্রছাত্রীরা অকুতোভয় হয়ে ঝাঁপ দিচ্ছেন পুলিশ আর র্যাফের ব্যারিকেডের সরু ফাঁক দিয়ে, যাতে বিক্ষোভস্থলের কাছাকাছি পৌঁছনো যায়। যাঁরা যতটুকু পৌঁছতে পারছেন, গোল হয়ে বসে পড়ছেন।
কংগ্রেস, অখিলেশ যাদবের এসপি এবং আপ-এর দিল্লি ও পঞ্জাবের কর্মীদের উপস্থিতিও লক্ষ্যণীয়। এই কর্মীরা দলীয় পতাকা নিয়ে নয়, নানা সংগঠনের ফেস্টুন হাতে এসেছেন। ‘জাগরণ’ নামে পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের একটি সংস্থা থেকে এসেছেন জনা পঁচিশেক মানুষ। সবুজ একটা ফেস্টুন দু’ধারে দু’জন ধরে, বাকিরা পিছন থেকে স্লোগান দিচ্ছেন। একই সঙ্গে, ‘ভারত মাতা কি জয়’ এবং ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’! ফেস্টুনের সামনে টানটান হয়ে শুয়ে এক মাঝবয়সি। রাজপথে তিনি কার্যত গড়াতে গড়াতে প্রায় দু’শো মিটার যাচ্ছেন, আবার ফিরছেন। বৃষ্টির জমা জল অগ্রাহ্য করেই।
হরিয়ানার হিসার থেকে আসা স্বপ্না চিল্লার কোমরে আঁচল জড়িয়ে রণংদেহি। বিভিন্ন ইউটিউব চ্যানেলের সামনে মোদী সরকারের প্রতি অগ্নিবর্ষণ করছেন। মূলস্রোতের চ্যানেল দেখলেই ‘দালাল মিডিয়া’ বলে রে-রে করে উঠছেন। সঙ্গে সঙ্গে ধেয়ে আসছে উত্তপ্ত ভিড়। স্বপ্না বলছেন, “ওরা কে আমাদের বাচ্চাদের জঙ্গি বলার? জঙ্গি তারাই, যারা বিনা পরিচয়ে বাচ্চাদের উপরে হামলা করেছে। আমার অনুরোধ, মার খাবে না পড়ে-পড়ে। প্রশ্নপত্র ফাঁস যেন না-হয়, এই দাবি ছেলেমেয়েদের অধিকার।”
কথায় কথায় উঠে আসছে অন্না হজারে এবং কৃষকদের আন্দোলনের সাফল্যের কথা। কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান ইস্তফা না-দিলে সপ্তাহান্তে এই আন্দোলন যে সমুদ্রের রূপ নেবে, সে কথাও মাইক ফুঁকেবলা হচ্ছে।
পঞ্জাবের ভারতীয় কিসান ইউনিয়ন জানিয়েছে, তারা শীঘ্রই বিরাট দল নিয়ে যন্তর মন্তরে আসছে। সিবিএসই-র মূল্যায়ন পদ্ধতির গলদ খুঁজে বার করা শিলিগুড়ির তরুণ নিসর্গ অধিকারী আইআইটি কানপুরের সাইবার সুরক্ষা বিভাগে এথিক্যাল হ্যাকার হিসেবে কর্মরত। আজ যন্তর মন্তরে এসে সিজেপি নেতা অভিজিৎ দীপকের সঙ্গে ছবি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, ‘পাগল-করা এনার্জি।’ সিজেপি-র তরফে একটি ওয়েবসাইট তৈরি করে সেখানে হামলা চালানো পুলিশদের নাম, ছবি বা ভিডিয়ো তুলতে বলা হয়েছে। পুলিশ এফআইআর না-নিলে কোর্টে যাওয়া হতে পারে।
দিল্লিবাসীর একাংশের ভোগান্তি অবশ্য জারি। যন্তর মন্তর ঘিরে বিস্তীর্ণ এলাকায় ইন্টারনেট বন্ধ। মেট্রোর ১৬টি স্টেশনও বন্ধ। নয়াদিল্লি স্টেশন সংলগ্ন মেট্রো বন্ধ থাকায় দিনভর বিপাকে পড়েছেন যাত্রীরা।