রবিবার দুপুর দেড়টা। দিল্লির চাণক্যপুরীর কাছে মোতি বাগ এলাকায় আচমকা হুড়মুড়িয়ে ভেঙে পড়ে পাঁচ তলা একটি মেসবাড়ি। প্রায় ৫০ বছরের পুরনো ওই বাড়ির ধ্বংসস্তূপের নীচে কত জন চাপা পড়ে রয়েছেন, তা এখনও স্পষ্ট নয়। স্থানীয়দের দাবি, কংক্রিটের স্তূপের নীচে ৪০-৫০ জন আটকা পড়ে থাকতে পারেন।
এ দিন রাত পর্যন্ত ওই ভেঙে পড়া বাড়ি থেকে পাঁচ জনকে জীবিত উদ্ধার করা গিয়েছে। এখনও পর্যন্ত, পাঁচ জনের মৃত্যুর খবর মিলেছে। দিল্লি পুলিশ, দমকলের পাশাপাশি জাতীয় বিপর্যয় মোকাবিলা বাহিনী (এনডিআরএফ)-ও নেমেছে উদ্ধারকাজে। তাদের ৭০ সদস্যের দু’টি দল মোতায়েন করা হয়েছে দুর্ঘটনাস্থলে। আটকে পড়াদের খোঁজে স্নিফার ডগ স্কোয়াডও পৌঁছেছে ঘটনাস্থলে। তবে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত ৯ জনকেই জীবিত উদ্ধার করা গিয়েছে। ভিতরে যাঁরা আটকে রয়েছেন, তাঁদের নিঃশ্বাস নিতে যাতে সমস্যা না হয়, সে জন্য ধ্বংসস্তূপের ভিতরে অক্সিজেন সিলিন্ডার পাঠানো হয়েছে।
মোতি বাগের ওই এলাকাটি বেশ ঘিঞ্জি। রয়েছে সরু সরু গলি। পড়ুয়াদের ‘পেয়িং গেস্ট’ হিসেবে থাকার জন্য বিভিন্ন মেসবাড়ি রয়েছে ওই এলাকায়। রয়েছে কিছু খাবারের দোকানও। সেগুলিতে মূলত হস্টেলের আবাসিকেরাই খাওয়াদাওয়া করেন। ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় বাড়িগুলি এমন ঠাসাঠাসি ভাবে তৈরি করা হয়েছে, যে যাতায়াতের জন্য জায়গা খুবই কম। এই দুর্ঘটনার জন্য অনিয়ন্ত্রিত নির্মাণের দিকেই আঙুল তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। বাড়ির মালিক এবং দিল্লির পুর কর্তৃপক্ষের ‘উদাসীনতা’ নিয়েও সরব তাঁরা।
এই এলাকাটি দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাউথ ক্যাম্পাসের কাছে। দিল্লির বাইরে থেকে যে পড়ুয়ারা কলেজে, বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে আসেন, তাঁরা সস্তায় হস্টেলের খোঁজে প্রতি বছরই এই এলাকায় আসেন। কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এই ধরনের হস্টেল বা মেসবাড়ির অধিকাংশেরই মালিকেরা এলাকায় থাকেন না। বাড়ি কী অবস্থায় রয়েছে, তা নিয়ে মালিকপক্ষের কোনও ভ্রুক্ষেপ থাকে না। দিল্লির পুর কর্তৃপক্ষও এই বিষয়গুলিতে নজর দেন না বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
প্রশ্নে ‘ঔদাসীন্য’
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, নতুন শিক্ষাবর্ষ শুরুর আগে মালিকেরা শুধু বাড়িগুলি রঙ করে দেন। ফলে কোনও বাড়ি জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে রয়েছে কি না, তা বাইরে থেকে দেখে বোঝার উপায় থাকে না। এলাকাবাসীদের একাংশের বক্তব্য, যে বাড়িটি ধসে পড়েছে, তার কাছেই পুরসভার একটি অফিস রয়েছে। অথচ পুর কর্তৃপক্ষ এই বাড়িগুলি কখনও পরিদর্শনে আসেন না বলে অভিযোগ তাঁদের। রবিবার যে হস্টেলবাড়িটি ভেঙে পড়েছে, বছর দু’য়েক আগে তার পিছনের গলিতে একটি মেয়েদের মেসবাড়িও ভেঙে পড়েছিল। স্থানীয়েরা জানাচ্ছেন, দু’বছর আগে ভেঙে পড়া ওই মেসবাড়িটি এখনও সেই একই হালে পড়ে রয়েছে।
ভেঙে পড়া হস্টেলবাড়িতে বেশির ভাগই ভিন্রাজ্যের পড়ুয়ারা থাকতেন বলে স্থানীয় সূত্রে খবর। এলাকাবাসীরা জানাচ্ছেন, মূলত কেরলম, হরিয়ানা এবং উত্তরপ্রদেশের পড়ুয়ারা সেখানে থাকতেন। তাঁদের কেউ পড়তেন মতিলাল নেহরু কলেজ, কেউ আত্মারাম সনাতন ধর্ম কলেজে, কেউ আবার শ্রী ভেঙ্কটেশ্বর কলেজে। বেডপিছু ১২ হাজার টাকা ভাড়া নেওয়া হত পড়ুয়াদের কাছ থেকে। এই হস্টেলবাড়িটির মতো আরও অনেক মেস রয়েছে এলাকায়। স্থানীয়দের অভিযোগ, বেশির ভাগ ক্ষেত্রে মালিকেরা অনলাইনে ভাড়া নিয়ে নেন। আর বাড়ি কী অবস্থায় পড়ে রয়েছে, সে বিষয়ে তাঁরা কোনও খোঁজখবর নেন না।
নিয়ম ভেঙে হস্টেলবাড়ি
ওই হস্টেলবাড়িটি যে নিয়ম ভেঙে তৈরি হয়েছিল, তা মেনে নিয়েছেন পুর কর্তৃপক্ষ। দিল্লি পুরসভার এক আধিকারিক পিটিআই-কে জানান, ভবনটির দোতলা পর্যন্ত অনুমোদন ছিল। পরবর্তী তলগুলি নিয়ম ভেঙে তৈরি করা হয়েছিল বলে জানান ওই আধিকারিক। ওই এলাকায় গত দু’দিন ধরে বৃষ্টিও হচ্ছিল। ভূপ্রকৃতির কারণে মাটির ঢাল দুর্ঘটনাস্থলের দিকেই। বৃষ্টি হলে জল জমার সমস্যাও থাকে। এরই মধ্যে ওই হস্টেলবাড়ির বেসমেন্টে মেরামতের কাজ চলছিল বলে দাবি স্থানীয়দের। তার ফলে বেসমেন্টের পিলারগুলির দুর্বল হয়ে গিয়েছিল কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠতে শুরু করেছে। তবে সেখানে কোনও মেরামত বা সংস্কারের কাজ চলছি কি না, তা ধ্বংসস্তূপ না সরানো পর্যন্ত নিশ্চিত ভাবে বলা সম্ভব নয় বলে দাবি পুর কর্তৃপক্ষের।
ভেঙে পড়া ওই হস্টেলবাড়ির পাশেই মেয়েদের একটি হস্টেল রয়েছে। রবিবারের বিপর্যয়ের পরে সেখান থেকেও আবাসিকদের সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। মেয়েদের ওই হস্টেলবাড়িটি ইতিমধ্যে সিল করে দিয়েছেন কর্তৃপক্ষ। দিল্লি পুরসভার ডেপুটি কমিশনার (দক্ষিণ) রাকেশ কুমার জানান, মেয়েদের ওই হস্টেলবাড়িটিও জীর্ণ অবস্থায় ছিল। তাই সেটি খালি করে দেওয়া হয়েছে। সেটি ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত নিয়েছে প্রশাসন। আপাতত সেখান থেকে আবাসিকদের নিকটবর্তী কমিউনিটি হলে সরিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছে।
চলছে মালিকের খোঁজ
ধসে পড়া ওই মেসবাড়ির নাম রাখা হয়েছিল ‘হস্টেল ডেজ়’। স্থানীয় সূত্রে খবর, বাড়িটির মালিকের নাম আনন্দ বনসল। তিনি গুরুগ্রামের বাসিন্দা। ঘটনার সময় তিনি এলাকায় ছিলেন না। দুর্ঘটনার পরেও তাঁর খোঁজ মেলেনি। হস্টেলবাড়ি বিপর্যয়ে ইতিমধ্যে একটি এফআইআর রুজু করেছে দিল্লি পুলিশ। বাহিনীর সাত-আটটি দল মিলে ওই হস্টেলবাড়ির মালিকের খোঁজ চালাচ্ছে।
মোদী-শাহের শোকপ্রকাশ, উদ্বিগ্ন রাহুলও
রবিবারের বিপর্যয়ের পরে শোকপ্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র নোদী। এই দুর্ঘটনা অত্যন্ত দুঃখজনক বলে জানিয়েছেন তিনি। স্বজনহারাদের পাশে থকার বার্তা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। শোকপ্রকাশ করেছেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহও। দিল্লির মুখ্যমন্ত্রী রেখা গুপ্তের সঙ্গে ফোনে কথা বলেছেন তিনি। কথা হয়েছে দিল্লি পুলিশ এবং এনডিআরএফ-এর প্রধানের সঙ্গেও। শাহ সমাজমাধ্যমে লেখেন, “স্থানীয় প্রশাসন এবং এনডিআরএফ যৌথ ভাবে উদ্ধারকাজ চালাচ্ছে। আহতদের প্রয়োজনীয় সব ধরনের চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। আহতদের সকলের দ্রুত আরোগ্য কামনা করছি।”
দুর্ঘটনায় শোকপ্রকাশ করেছেন রাহুল গাঁধীও। এনডিআরএফ এবং দমকলকে তিনি অনুরোধ করেছেন যাতে উদ্ধারকাজে কোনও রকম খামতি না থাকে। পাশাপাশি দিল্লির হস্টেলবাড়িগুলির পরিস্থিতি নিয়েও উদ্বেগপ্রকাশ করেছেন তিনি। রাহুল লিখেছেন, “পড়ুয়াদের জীবন এমনিতেই নানা প্রতিকূলতায় পূর্ণ। এখন তাঁদের জীবনের জন্যও বিষয়টি চরম ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়গুলিতে হস্টেলের পর্যাপ্ত সুবিধা না পেয়ে পড়ুয়ারা মেসবাড়িতে (পিজি) থাকতে বাধ্য হচ্ছেন। সেখানে প্রায়শই অমানবিক পরিবেশে কখনও কখনও একই ছাদের নীচে ৪০ জনকে গাদাগাদি করে থাকতে হয়।” রাহুল আরও লেখেন, “প্রত্যেক পড়ুয়ার জীবন অমূল্য। যে কোনও উপায়ে তা রক্ষা করতেই হবে।”
বিক্ষোভ এবিভিপির
রবিবারের বিপর্যয়ের পর পথে নেমেছে এবিভিপি। দিল্লির পুরসভা অফিসের বাইরে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন এবিভিপির সমর্থকেরা। পুর কমিশনারের ইস্তফার দাবি তোলেন তাঁরা। বেশ কিছুক্ষণ বিক্ষোভের পরে তাঁদের আটক করে পুরসভা অফিসের সামনে থেকে তুলে নিয়ে যায় পুলিশ। এ দিনের দুর্ঘটনার পরে পুরপ্রশাসনের নজরদারি এবং ঔদাসীন্যের অভিযোগ তুলেছে এসএফআই, ছাত্র পরিষদ-সহ অন্য ছাত্র সংগঠনগুলিও।