শুধুমাত্র যাদবপুরের শিক্ষাঙ্গনে মধ্যরাতের তাণ্ডবই নয়, পরের দিন (বৃহস্পতিবার) দুপুরে যাদবপুরের চার নম্বর গেটে নন্দলাল বসু-কৃত ঐতিহ্যের প্রতীকের ফলক ভাঙার দৃশ্যটি সংবাদমাধ্যমের ক্যামেরায়উঠে এসেছে।
ব্যারিকেড ভেঙে যাদবপুরের চার নম্বর গেটে পৌঁছে, রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সঙ্ঘের ছাত্র সংগঠন এবিভিপি-র গেট বেয়ে ওঠার দৃশ্য কার্যত টাটকা দেখিয়েছিল টিভি চ্যানেল। এবং প্রতীকের ফলকের বাইরের অংশে বিকশিত শতদলের অংশটুকু চার নম্বর গেটের বাইরে থেকে ভিতরে গড়িয়ে ঢোকার দৃশ্যটিও দেখা গিয়েছে। এবিপি আনন্দের চ্যানেলেই দেখা গিয়েছে, তাৎক্ষণিক ভাবে লোহার গোলাকার অংশটি দেখে ‘লোহার বিম ছুড়ে দেওয়া হচ্ছে’ বলে মন্তব্য করছেন চ্যানেলের সাংবাদিক। পরে যাদবপুরের শিক্ষকেরা তা নন্দলাল বসু কৃত তিনটি প্রদীপশিখা ঘিরে থাকা শতদলের অংশ বলে চিনতে পারছেন। এই প্রতীকের অমর্যাদায় এবিভিপি-র নাম আসার পরে এ বার তারা যাদবপুরের এক অধ্যাপকের নামে দোষারোপ করে। থানায় থানায় তাঁর নামে অভিযোগ দায়েরের হুমকিও দেওয়া হয়েছে রবিবার সাংবাদিক সম্মেলনে। এবিভিপির কেন্দ্রীয় কার্যসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারী আরও বলেন, “সেই ফুটেজ সামনে আনা হোক, যেখানে এবিভিপি-র কাউকে ভাঙচুরে দেখা যাচ্ছে। তেমন কেউ থাকলে আমরা তাঁকে বহিষ্কার করব। ঘটনার দিন রাতের এবং প্রতীক ভাঙায় এবিভিপির যোগসূত্র নেই।”
তবে সংবাদমাধ্যমের হাতে আসা যাদবপুরের সিসি ক্যামেরার মধ্যরাতের ফুটেজে এবিভিপি-র রাজ্য নেতাদের অনেককে দেখা যাওয়ার পরে আবার তাঁদের প্রশ্ন, সেই ফুটেজ জালও হতে পারে। এবিভিপি-র রাজ্য সম্পাদক নীলকণ্ঠ ভট্টাচার্য যাদবপুরের সেই মধ্যরাতে ক্যাম্পাসে ঢোকার কথা আগেই স্বীকার করেছিলেন, নীল জামা গায়ে লাঠি হাতে তাঁকে ক্যাম্পাসে দেখাও যায়। রবিবার নীলকণ্ঠের দাবি, নীল জামা অন্য কেউও পরে থাকতে পারেন। ফুটেজ সংবাদমাধ্যমের হাতে গেল কী করে প্রশ্ন তোলেন নীলকণ্ঠ। বৃহস্পতিবার যাদবপুরের ঐতিহ্যের প্রতীক পা-দানি হিসেবে ব্যবহার করে দাঁড়িয়ে থাকা গেরুয়া পতাকাধারী এবিভিপি-র মিছিলের দু’জনকে অন্তত স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে সংবাদমাধ্যমের ছবিতে। তাঁদের পরিচয় দিতে কিন্তু অস্বীকার করেন নীলকণ্ঠ। পাশাপাশি, এবিভিপি-র শুভঙ্করের অভিযোগ, “ক্যাম্পাসের ভিতরে কেন কিষেণজি, শারজিল ইমামের ছবি থাকবে? আমরা এনআইএ তদন্তের দাবি জানাচ্ছি।”
পোস্টার-জনিত অভিযোগের সারবত্তা মানতে আপত্তি রয়েছে যাদবপুরের শিক্ষকদের বড় অংশের। তাঁদের পাল্টা প্রশ্ন, কোন আচরণ দেশ-বিরোধী, সেটাই বা কোনও একটি দল কোন নিক্তিতে ঠিক করবে? যাদবপুরের ছাত্রছাত্রীরা দেশবিরোধী, যাদবপুরে জাতীয় পতাকা তোলা হয় না গোছের মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে সরব হয়েছে যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি বা জুটাও। স্বাধীনতা সংগ্রামের সঙ্গে যাদবপুরের ইতিহাসের যোগ, বিশ্ববিদ্যালয়ে নানা দেশাত্মবোধক অনুষ্ঠান, বৈদিক মন্ত্রোচ্চারণ ঐতিহ্যও তাঁরা মনে করিয়েছেন। যাদবপুরে বহিরাগত হামলার নিন্দা করেছেন প্রেসিডেন্সির শিক্ষক বৃন্দও। এর মধ্যে প্রেসিডেন্সির সামনে বহিরাগতদের হুমকিও তাঁরা শিক্ষাঙ্গনে গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য বিপজ্জনক বলে তাঁরা উৎকণ্ঠা প্রকাশ করেন।
অন্য দিকে যাদবপুরের ঘটনাবলি নিয়ে কর্তৃপক্ষের তৈরি অনুসন্ধান কমিটি কাজ শুরুর আগেই ভেস্তে যেতে বসেছে। পাঁচ সদস্যের কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে মনোনীত নেতাজি সুভাষ মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন উপাচার্য শুভশঙ্কর সরকার জানান, তাঁর অমতে তাঁকে এই দায়িত্ব দেন যাদবপুরের উপাচার্য চিরঞ্জীব ভট্টাচার্য। তিনি আগেই এই দায়িত্ব নিতে নিজের অপরাগতা প্রকাশ করেন। প্রবীণ শিক্ষাবিদ্ শুভশঙ্কর এখন দিল্লিতে রয়েছেন। তাঁর কলকাতায় ফিরতে আরও কিছুটা সময় লাগবে। এই অবস্থায় যাদবপুরের ঘটনাবলি নিয়ে কোনও দায়িত্ব পালন তাঁর পক্ষে সম্ভব নয় বলে জানান শুভশঙ্কর। কিন্তু তবু যাদবপুর কর্তৃপক্ষের নির্দেশিকায় ওঁর নামই অনুসন্ধান কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে দেওয়া হয়। অম্বেডকর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অরুণাশিস গোস্বামী, প্রেসিডেন্সি বিশ্ববিদ্যালয়ের আইকিউএসি ডিরেক্টর সৌম্যেন্দু চট্টোপাধ্যায়, যাদবপুরের মাইক্রো-অ্যানালিস্ট সুমন্ত জানা এবং যাদবপুরের ডেপুটি রেজিস্ট্রার আবুল হাসনাত অনুসন্ধান কমিটিতে রয়েছেন। বুধবার সন্ধ্যায় যাদবপুরে ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সভায় গোলমাল, মধ্যরাতে শিক্ষাপ্রাঙ্গণে দুর্বৃত্তদের গুন্ডামি এবং পরের দিন যাদবপুর-অভিযানের জেরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যের প্রতীক ভেঙে পড়ার ঘটনা পরম্পরা নিয়ে অনুসন্ধান কমিটি খোঁজখবর করবে।
এবিভিপি-র তরফে আবার যাদবপুরের অনুসন্ধান কমিটি নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়। তারা বলে, তদন্ত হোক উচ্চ শিক্ষা দফতরের অধীনে। এই উত্তপ্ত আবহে আজ, সোমবার যাদবপুরের সংশ্লিষ্ট সব মহলকে বৈঠকে ডেকেছেন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার সেলিম বক্স মণ্ডলের ডাকা বৈঠকে উপাচার্য, সহ-উপাচার্য, বিভিন্ন ডিন, উচ্চ আধিকারিক এবং সব মহলের প্রতিনিধি ছাড়াও বিভিন্ন ছাত্র সংগঠনের প্রতিনিধিকে ডাকা হয়েছে। তাতে বাম ছাত্র সংগঠনগুলির সঙ্গে এবিভিপি-রও থাকার কথা।