আর জি কর-আন্দোলনের পরে এ বার নিট-কেলেঙ্কারি ও দিল্লিতে ছাত্র-ছাত্রীদের উপরে পুলিশি ‘দমন-পীড়নে’র অভিযোগকে সামনে রেখে শুক্রবার প্রতিবাদে উত্তাল হল শহর। সিপিএমের গণ-সংগঠন এসএফআই-সহ ৮টি বাম ছাত্র-সংগঠনের ডাকে এ দিন প্রতিবাদ মিছিল, অবস্থানে ভিড় হয়েছিল চোখে পড়ার মতো। যোগ দিয়েছিল অরাজনৈতিক বিভিন্ন সংগঠন, সাধারণ ছাত্র-ছাত্রীদের একাংশ এবং ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) পশ্চিমবঙ্গ শাখাও। এই প্রেক্ষিতে গণতান্ত্রিক আন্দোলনে সমস্যা নেই জানানোর পাশাপাশি মিছিলের নামে হামলার বিরুদ্ধে কড়া ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিলেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী।
কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগ, ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি (এনটিএ) বাতিল, পুলিশি ‘অত্যাচারে’র বিচার— এই তিন দাবিতে শিয়ালদহ থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত মহামিছিল করেছে ছাত্র সংগঠন এসএফআই, আইসা, ডিএসও, ছাত্র ব্লক, এআইএসএফ, ডিওয়াইএসএ, পিডিএসএফ, পিএসইউ। এর আগেই মুখ্যমন্ত্রীর হুঁশিয়ারি, “উল্টো রথের দিনে এই সব (আন্দোলন) করছে। আগামী কালও করতে পারত। পুলিশকে বলেছি, কিছু করার দরকার নেই। যা বলার বলতে দিন। কিন্তু দেশ-বিরোধী স্লোগান দিলে চিহ্নিত করে পদক্ষেপ করব।” তাঁর সংযোজন, “দেশ-বিরোধী শক্তিকে পশ্চিমবঙ্গের মাটি থেকে উপড়ে ফেলার কাজ মুখ্যমন্ত্রী করবে। সবক শেখাব। এই মাটি স্বাধীনতা সংগ্রামীদের, ঋষি অরবিন্দের মাটি। উল্টোপাল্টা কাজ চলবে না!” মিছিলে অশান্তির ঘটনার পরে মুখ্যমন্ত্রী বলেছেন, “সবাইকে চিহ্নিত করা হয়েছে। উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সেই সঙ্গে, শুক্রবার মিছিল ডাকার মধ্যেও বিশেষ অভিসন্ধি ছিল বলেও ইঙ্গিত করেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি, যে পথে আন্দোলন হয়েছে, সেই একই রাস্তায় বিজেপির উত্তর কলকাতা সাংগঠনিক জেলার ডাকে তেরঙা-যাত্রা হবে বলেও মুখ্যমন্ত্রী জানিয়েছেন।
যদিও মিছিলের পরে রানি রাসমণি অ্যাভিনিউতে এসএফআই-সহ বাম ছাত্র সংগঠনগুলি অবস্থানও করেছে। সেখান থেকেই এসএফআই-এর রাজ্য সম্পাদক দেবাঞ্জন দে বলেছেন, “বাংলার ছাত্র সমাজ পশ্চিমবঙ্গের মাটিতে প্রতিরোধের যন্তর মন্তর তৈরি করেছে। ‘ধর্মতলা দখল’ হয়েছে। প্রতিরোধের যন্তর মন্তর এ বার বাংলার কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়বে।” পতাকা ছাড়াই মেদিনীপুর শহরেও হয়েছে মিছিল। ধর্মতলায় মেট্রো সিনেমার কাছে ‘রাত জাগো, দেশ জাগো’ কর্মসূচিও শুরু করেছে এসএফআই। সংগঠনের সর্বভারতীয় সম্পাদক সৃজন ভট্টাচার্য বলেছেন, “অমিত শাহের পুলিশের অত্যাচারের প্রতিবাদে গোটা দেশের সঙ্গে ফের ‘রাত দখল’ করছে কলকাতা। নরেন্দ্র মোদী সরকারকে ছাত্রদের কথা শুনতেই হবে।” পুলিশের লাঠিতে অনেকে আহত হয়েছেন বলে অভিযোগ তুলে আজ, শনিবার রাজ্য জুড়ে প্রতিবাদসভার ডাক দিয়েছেন এসইউসি-র রাজ্য সম্পাদক চণ্ডীদাস ভট্টাচার্য।
বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য পাল্টা বলেছেন, “এঁরা দেশ জুড়ে নৈরাজ্য তৈরির চেষ্টা করছেন। সিপিএম গৃহীত, পরীক্ষিত ও পরিত্যক্ত। ঘোলা জলে এই ভাবে মাছ ধরা যায় না, এটা সিপিএমের বোঝা উচিত। ওই একটু বাচ্চাদের সঙ্গে লাফালাফি করে নিচ্ছে।”
একই বিষয়ে ও লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধীকে আটকের প্রতিবাদে প্রদেশ কংগ্রেসের ডাকে কলেজ স্কোয়ারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের মূর্তি থেকে ধর্মতলা পর্যন্ত প্রতিবাদ মিছিল হয়েছে। ছিলেন প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার, দলের নেতা অমিতাভ চক্রবর্তী-সহ অন্যেরা। শুভঙ্কর বলেছেন, “মোদী সরকারের আমলে গত ১০ বছরে ১৫২ বার বিভিন্ন পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হয়েছে। ভেঙে পড়া শিক্ষা-ব্যবস্থা নিয়ে প্রথম সরব হয়েছিলেন রাহুল গান্ধী। সেই প্রতিবাদ ছাত্র-যুবদের গণ-আন্দোলনে পরিণত হয়েছে।” প্রসঙ্গত, নিট-কেলেঙ্কারি ও তার জেরে ‘আত্মঘাতী’ পড়ুয়াদের স্মৃতিতে যুব কংগ্রেস, এনএসইউআই-এর উদ্যোগে দেশ জুড়ে যে ‘ছাত্র কি গুঞ্জ’ কর্মসূচি চলছে, এ দিনের প্রতিবাদ মিছিলও তারই অংশ। ধর্মতলায় টিপু সুলতান মসজিদের কাছে ছাত্র পরিষদের সভানেত্রী প্রিয়াঙ্কা চৌধুরীর নেতৃত্বেও রাতভর অবস্থান-বিক্ষোভ হচ্ছে।
উল্টো দিকে, পরিস্থিতির মোকাবিলায় আরএসএস-প্রভাবিত বিভিন্ন সংগঠন এ দিন দুপুরে ‘শিক্ষা সংস্কৃতি সুরক্ষা মঞ্চে’র ব্যানারে কোচবিহার, রায়গঞ্জে পথে নেমেছে। এবিভিপি-র কেন্দ্রীয় কার্যসমিতির সদস্য শুভব্রত অধিকারী বলেছেন, “গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে আন্দোলনের অধিকার সবার রয়েছে। কিন্তু, আন্দোলনের নামে দেশবিরোধী চক্রান্ত ও কার্যকলাপ মানব না।’’