তৃণমূল জমানায় সময়ের সঙ্গে সঙ্গে দুর্গাপুজোর অনুদান বৃদ্ধি পেয়েছে। সেই নিয়ে আলোচনা-বিতর্ক হয়েছে বিস্তর। রাজ্যের তৎকালীন বিরোধী দল বিজেপিও তা নিয়ে সমালোচনা করেছে। পশ্চিমবঙ্গে পালাবদলের পরে পুজো নিয়ে রাজ্যের বর্তমান শাসকদলের কী ভূমিকা থাকবে, তা নিয়ে কৌতূহল তৈরি হচ্ছিল। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী কিছুটা ইঙ্গিতও দিয়েছিলেন। সোমবার রাজ্যের পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে তাঁর বৈঠকে সেই বিষয়টিই স্পষ্ট হল। এ বছর বেশ কিছু বদল এসেছে পুজোর ঘোষণায়। পূর্বতন সরকারের দেওয়া অনুদানে যেমন কাটছাঁট করা হয়েছে, তেমন কিছু ‘উপহার’ আড়েবহরে বেড়েছে।
গত বছর তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় পুজো কমিটিগুলির জন্য এক লক্ষ ১০ হাজার টাকা অনুদান ঘোষণা করেছিলেন। তার পরে রাজ্য বিধানসভার তৎকালীন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু বলেছিলেন, “১ লাখ ১০ কেন, ২ লাখ ১০ দিন। তাতে কিছু এসে যায় না। আগে সরকারি কর্মচারীদের ডিএ মিটিয়ে দিন। ৬ লক্ষ সরকারি শূন্যপদ পূরণ করুন।’’
রাজ্যে পালাবদলের পরে গত মাসে নবান্নে কলকাতার দুর্গাপুজো কমিটিগুলির সম্মিলিত সংগঠন ‘ফোরাম ফর দুর্গোৎসব’-এর দুই কর্তার সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মুখ্যমন্ত্রী। বালিগঞ্জ কালচারালের অন্যতম কর্তা অঞ্জন উকিল এবং বেহালা নূতন দলের কর্মকর্তা সন্দীপন বন্দ্যোপাধ্যায় মুখ্যমন্ত্রীর সঙ্গে দেখা করে কলকাতার শারদোৎসব সংক্রান্ত বিভিন্ন বিষয় নিয়ে তাঁদের মতামত জানান। নবান্ন সূত্রেই জানা গিয়েছিল, ১০ লক্ষ টাকার নীচে বাজেটের পুজো কমিটিগুলিকে আর্থিক অনুদান দেওয়ার বিষয়টি নিয়ে ভাবনাচিন্তা করছে রাজ্য সরকার। সোমবার মুখ্যমন্ত্রী সব পুজো কমিটির জন্যই এক লক্ষ টাকা করে অনুদান ঘোষণা করলেন। তবে সেই সঙ্গে বড় পুজো কমিটিগুলিকে সেই অনুদান না নেওয়ার জন্য অনুরোধও করলেন।
অনুদান
২০১৮ সালে পুজোর অনুদান দেওয়া শুরু করেছিল মমতার সরকার। প্রথম বার ১০ হাজার টাকা করে। ২০১৯-এ অনুদানের পরিমাণ ২৫ হাজার টাকা করা হয়। করোনার সময়ে ২০২০ সালে দেওয়া হয় ৫০ হাজার টাকা করে। ধাপে ধাপে সেই অনুদানের পরিমাণ বাড়তে বাড়তে ২০২৫ সালে এক লক্ষ ১০ হাজার টাকায় পৌঁছোয়। কিন্তু মুখ্যমন্ত্রী হওয়ার পর শুভেন্দু অধিকারী জানিয়ে দিয়েছিলেন, তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার রাজ্যের সব পুজো কমিটিকে আর্থিক অনুদান দেবে না। বরং যে সব পুজো কমিটির সত্যিই প্রয়োজন রয়েছে, তাদের বাছাই করে অনুদান দেওয়া হবে। ততটা ‘কঠোর’ পদক্ষেপ যদিও করেননি মুখ্যমন্ত্রী, তবে করেছেন অনুরোধ। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘আগে এক কর্মসূচিতে বলেছিলাম, যাদের (কমিটি) ছোট বাজেট, তাদের অনুদান দেব। আমি মুখ্যমন্ত্রীর ক্ষমতার অপব্যবহার করতে চাই না। যারা সক্ষম (বড় বাজেটের পুজো কমিটি), তাদের বলব, সরকারের অর্থনৈতিক সাহায্য না-নিতে। যাঁরা এই টাকা না হলে পুজো করতে পারবেন না, তাঁদের জন্য সরকার এক লক্ষ টাকা দেবে।’’ তার পরেই শুভেন্দু কটাক্ষ করেন পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে। তিনি বলেন, ‘‘পূর্বতন মুখ্যমন্ত্রী যা করছিলেন, ঠিক নয়। গত বার কত দিয়েছিলাম, এ বার তা হলে এক লাখ। সকালে মাছের বাজারে এ সব করি (আমরা)। ঠিক নয়।’’ তিনি আরও বলেন, ‘‘রাজ্যে ২৫ হাজার দিয়ে শুরু হয়েছিল অনুদান (দুর্গাপুজোর) দেওয়া। ১ লক্ষ ১০ হাজার টাকায় পৌঁছেছে। ভোটে লাভ হয়নি।
বিদ্যুতে ছাড়
শুভেন্দু জানান, সোমবার পুজো কমিটিগুলির সঙ্গে বৈঠকের আগে রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। কথা হয়েছে সিইএসসির সঙ্গেও। কলকাতা-সহ গোটা রাজ্যের পুজো কমিটিগুলিকে বিনামূল্যে বিদ্যুৎ সরবরাহ করতে সম্মত হয়েছে তারা। অর্থাৎ বিদ্যুতের বিলে ১০০ শতাংশ ছাড় মিলবে। দমকলের ছাড়পত্র নিতেও কোনও টাকা খরচ করতে হবে না পুজো কমিটিগুলিকে, জানিয়েছেন শুভেন্দু। পূর্বতন সরকারের আমলে যদিও বিদ্যুতের মাশুলে ১০০ শতাংশ ছাড় ছিল না। গত বছর প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী মমতা পুজোর অনুদান ঘোষণা করতে গিয়ে জানিয়েছিলেন, পুজো কমিটিগুলিকে বিদ্যুতের মাশুলেও ৮০ শতাংশ ছাড় দেওয়ার জন্য সিইএসই এবং রাজ্য বিদ্যুৎ বণ্টন সংস্থাকে বলেছেন তিনি।
কার্নিভাল
পূর্বতন সরকারের আমলে দুর্গাপুজোর কার্নিভালে ইতি পরল। কার্নিভাল হবে না বলে জানিয়ে দিয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু। তাঁর কথায়, ‘‘যে চাপিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা ছিল, সেই কার্নিভাল হচ্ছে না।’’ তিনি এ-ও জানান, এর ফলে পুজো কমিটিগুলি ‘খুশি’ হয়েছে। বদলে মহালয়ার দিন ইডেনে হবে একটি কর্মসূচি। সেখানে আমন্ত্রিত থাকছেন খোদ প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী।
পূর্বতন সরকারের আমলে পুজোর গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল এই কার্নিভাল। আগে ভাগেই সেই দিন ঘোষণা করতেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সেইমতো রেড রোডে প্রতিমা নিয়ে শোভাযাত্রা করত বিভিন্ন পুজো কমিটি। জেলায় জেলায় চলত একই শোভাযাত্রা। ২০২৪ সালে আরজি কর কাণ্ডের পরে তা বয়কটের ডাক দিয়েছিলেন শুভেন্দু। ২০২৫ সালে কলকাতায় পুজোর কার্নিভালের দিনেই দুর্যোগে মৃতদের জন্য ‘শোকমিছিল’ হয়েছিল শুভেন্দুর নেতৃত্বে। ২৩ সেপ্টেম্বর জলমগ্ন কলকাতায় ১২ জনের মৃত্যুর জন্য মেয়র ফিরহাদ হাকিমের গ্রেফতারির দাবি তোলা হয় মিছিল থেকে। এ বার সেই শুভেন্দু মুখ্যমন্ত্রী হয়ে কার্নিভাল বাতিল করেছেন। শুভেন্দু জানান, কোজাগরী লক্ষ্মীপুজো ২৫ অক্টোবর। তার আগের দিন, ২৪ অক্টোবরের মধ্যে সব পুজো কমিটিকে প্রতিমা নিরঞ্জন করতে হবে। তাঁর কথায়, ‘‘প্রতিমার নিরঞ্জন পঞ্জিকা মেনে হয়। নিজের ইচ্ছামতো হয় না। কাটঅফ ডেট রাখব। কারও উপর কিছু চাপিয়ে দিতে চাই না।’’
আরও পড়ুন:
নিষেধাজ্ঞা
এ বারের পুজো নিয়ে কিছু নিয়মনীতিও ঘোষণা করেছেন শুভেন্দু। তিনি জানিয়েছেন, অষ্টমীর দিন রাজ্যে সব মদের দোকান বন্ধ থাকবে। পানশালাও বন্ধ থাকবে ওই দিন। পুজোর ক’দিন বাজানো যাবে না ডিজে। আটকানো যাবে না জাতীয় সড়ক। মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘‘মহরমের শোভাযাত্রা ছিল, বলেছি ডিজে বাজাবেন না। অস্ত্র নিয়ে মিছিল করতে দিইনি। সকলের সহযোগিতা নিয়েই করেছি সেটা। এ বার পুজোয় ডিজে বাজানো নিষিদ্ধ ঘোষণা করছি। সহযোগিতা করবেন।’’ প্রতিমা নিরঞ্জনের সময় ক্রেন ব্যবহারও চলবে না।
২০১৬ সাল থেকে রাজ্য আবগারি দফতরের নীতি ছিল, পুজোয় কোনও ‘ড্রাই ডে’ নেই। সব দিনই খোলা থাকবে রাজ্যে মদের দোকান। কিন্তু খুচরো বিক্রেতাদের একাংশের দাবি ছিল, পুজোয় কর্মচারীদের কথা মাথায় রেখে ছুটির ব্যবস্থা করা হোক। সে দাবি মেনে ২০২৩ সালে রাজ্য সরকার এক নির্দেশিকা দিয়ে বলে, কোনও মদবিক্রেতা চাইলে দুর্গাপুজোর অষ্টমী এবং দশমীর দিন দোকান বন্ধ রাখতে পারেন। তবে সেটা অনুমতিসাপেক্ষ। পুজোয় দোকান বন্ধ রাখতে ইচ্ছুক বিক্রেতাদের আবেদন করতে হবে জেলা আবগারি দফতরের কাছে। ওই দফতর এলাকাগত ভাবে আবেদন বিবেচনা করে এক দিন বা দু’দিন বন্ধ রাখার অনুমতি দেবে। অতীতে দুর্গাপুজোর সময়ে দেড় দিন বন্ধ থাকত রাজ্যের সব মদের দোকান। অষ্টমীতে গোটা দিন এবং দশমীতে বিকেল ৫টার পরে। গত বছর দশমী এবং গান্ধী জয়ন্তী এক দিনে পড়েছিল বলে মদ বিক্রি বন্ধ ছিল। চলতি বছর অষ্টমীতে বন্ধ থাকবে।