ইআরে রক্ষা নেই, পাসপোর্ট দোসর।
মাত্র মাস কয়েক আগে নথি জোগাড়ের ঝক্কি সামলে ভোটার তালিকায় নাম উঠলেও পাসপোর্ট পাওয়া বা নবীকরণে ফের নথি-জটিলতা। বিশেষত জন্মের শংসাপত্র যাচাই ঘিরে সমস্যা বেশি। ভুক্তভোগীদের দাবি, আবেদন করে নতুন পাসপোর্ট পেতে দেরি তো হচ্ছেই, পাসপোর্ট নবীকরণের ক্ষেত্রেও অনির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করতে হচ্ছে। জন্মের শংসাপত্র-সহ সমস্ত নথি নিয়ে বার বার হাজিরার নির্দেশ দেওয়া হচ্ছে। এমনকি তৎকাল পাসপোর্টের জন্যও অপেক্ষায় থাকতে হচ্ছে। খোঁজ করলে বলা হচ্ছে ‘পুলিশ ভেরিফিকেশন’ চলছে! কবে শেষ হবে ‘ভেরিফিকেশন’? উত্তর নেই। বহু ক্ষেত্রে জানাও যাচ্ছে না দেরির কারণ! আটকে যাচ্ছে জরুরি কাজ, চাকরি, পড়াশোনা বা চিকিৎসার জন্যবিদেশে যাওয়া।
রিজিয়োনাল পাসপোর্ট অফিস (কলকাতা) সূত্রে খবর, এই মুহূর্তে শুধু কলকাতায় অন্তত ২০ হাজার পাসপোর্টের আবেদন পুলিশের কাছে জমা পড়ে রয়েছে। রয়েছে আরও কয়েক হাজার পাসপোর্ট নবীকরণের আবেদন। থানায় থানায় আবেদনের পাহাড় বাড়ছে প্রতিদিন।
এর সঙ্গে অনেকেই মিল পাচ্ছেন এসআইআর (ভোটার তালিকায় বিশেষ নিবিড় সংশোধন) পরিস্থিতির। অনেকেরই দাবি, মাস কয়েক আগেই সমস্ত নথিপত্র দিয়ে নিজেকে নাগরিক প্রমাণ করে ভোটার তালিকায় নাম তুলতে হয়েছে। তার পরেও ফের নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য কালঘাম ছুটে যাচ্ছে। কলকাতার রিজিয়োনাল পাসপোর্ট অফিস এবং পাসপোর্টের নথি খতিয়ে দেখার দায়িত্বপ্রাপ্ত কলকাতা পুলিশের সিকিউরিটি কন্ট্রোল অর্গানাইজ়েশনের কর্তাদের দাবি, ‘‘ভুল লোকের হাতে যাতে পাসপোর্ট না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে নথি খতিয়ে দেখায় নতুন কড়াকড়ি করা হয়েছে। তাতে কিছুটা সময় লাগছে।’’ স্বরাষ্ট্র দফতর সূত্রেও দাবি, পাসপোর্ট-সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ নথির ক্ষেত্রে বিগত কয়েক বছরে এত রকম জালিয়াতির অভিযোগ নজরে এসেছে যে, এখন সমস্ত নথিপত্র নতুন করে যাচাই করা হচ্ছে। তার ফলে কিছু প্রক্রিয়াগত সমস্যা তৈরি হচ্ছে।
সিকিয়োরিটি কন্ট্রোল অর্গানাইজ়েশন সূত্রের বক্তব্য, রিজিয়োনাল পাসপোর্ট অফিস থেকে নথি যাচাই করার জন্য তাঁদের কাছে পাঠানো হয়। কিন্তু গত কয়েক মাসে নথি যাচাইয়ের প্রক্রিয়া বদলে ফেলা হয়েছে। সিকিউরিটি কন্ট্রোলের এক আধিকারিক বলেন, ‘‘আগে আধার কার্ড নম্বর মিলিয়ে দেখে নিলেই হত। এখন আধার নম্বর, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম এবং অন্যান্য তথ্য দিয়ে ইউনিক আইডেন্টিফিকেশন অথরিটি অব ইন্ডিয়ায় (ইউআইডিএআই) মেল করা হচ্ছে। উত্তর আসার পরে খতিয়ে দেখা হচ্ছে জন্মের শংসাপত্র। আবার জন্মের শংসাপত্র থাকলেও সংশ্লিষ্ট হাসপাতালের থেকে তথ্য চেয়ে পাঠানো হচ্ছে।’’ তিনি জানাচ্ছেন, আবেদনকারীর বাবা-মায়ের নাম এবং জন্মের তারিখ উল্লেখ করে জানতে চাওয়া হচ্ছে, ওই নির্দিষ্ট দিনে সংশ্লিষ্ট মহিলার সন্তান হওয়ার তথ্য হাসপাতালে রয়েছে কি না। যদি থাকে তা হলে সেই সন্তানের লিঙ্গ জন্মের শংসাপত্রের সঙ্গে মিলছে কি না, দেখা হচ্ছে। হাসপাতাল থেকে তথ্য এলেও সংশ্লিষ্ট পুর-প্রশাসনের কাছ থেকেও জন্মের শংসাপত্র সংক্রান্ত তথ্য চেয়ে মিলিয়ে দেখা হচ্ছে। সিকিয়োরিটি কন্ট্রোলের এক আধিকারিকের দাবি, ‘‘সব দিক মিলিয়ে দেখতে দেখতে অনেকটা সময় চলে যাচ্ছে।’’
কিন্তু হাসপাতালেই তো সকলের জন্ম হয়নি। তা হলে? পাসপোর্ট কর্তাদের দাবি, সে ক্ষেত্রে দেখা হচ্ছে ছোটবেলায় ভারতে কাটিয়েছেন কি না। জোর দেওয়া হচ্ছে স্কুল পাশের নথির (যেখানে জন্মের তারিখ উল্লেখ রয়েছে) উপরে। কিন্তু অনেকেই তো স্কুলে পড়েননি। সে ক্ষেত্রে বাবা-মায়ের নথিতে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এক পাসপোর্ট কর্তার মন্তব্য, ‘‘আবেদনকারী ভারতীয় নাগরিক কি না, সেটা আগে ১০০ শতাংশ নিশ্চিত হয়ে এগোতে বলা হচ্ছে সরকার থেকে। ভুল থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্মীর বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা হবে। ফলে যে কাজ এক মাসে হত, সেটা কত দিনে শেষ হবে কেউ বলতে পারছেন না।’’
রিজিয়োনাল পাসপোর্ট অফিস এবং কলকাতা পুলিশের সিকিয়োরিটি কন্ট্রোল অর্গানাইজ়েশন ভবন ঘুরে দেখা গেল, মূল জটিলতা নাগরিকত্বের প্রামাণ্য নথি নিয়ে। পাসপোর্ট কর্তারা জানাচ্ছেন, ভারতে নাগরিকত্ব প্রমাণের জন্য সুনির্দিষ্ট পরিচয়পত্র বা নথি নেই। ঠিকানা যাচাই করতে আধার কার্ড ব্যবহৃত হলেও সেটি নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নয়। প্যান কার্ড কারও আয়-ব্যয়ের হিসাব খতিয়ে দেখার জন্য ব্যবহৃত হলেও তা নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নয়। সম্প্রতি সুপ্রিম কোর্ট জানিয়েছে, ভোটার তালিকায় কারও নাম না-থাকলেই তিনি নাগরিকত্ব হারিয়েছেন, এমন মনে করার কারণ নেই। এই যুক্তিতে ভোটার কার্ডও নাগরিকত্ব প্রমাণের নথি নয়। এ দেশে কোনও ব্যক্তির নাগরিকত্ব যাচাইয়ের জন্য সাধারণত একাধিক নথি (জন্ম শংসাপত্র, পাসপোর্ট, মাধ্যমিকের শংসাপত্র) খতিয়ে দেখা হয়। ক্ষেত্রবিশেষে দেখা হয় বংশলতিকাও। এই মুহূর্তে জন্মের শংসাপত্র বা স্কুল পাশের শংসাপত্রকেই সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া অলিখিত নিয়ম হয়ে উঠেছে। আবার সেই নথি দিলেও তা যাচাই করার প্রক্রিয়ায় মাসের পর মাস কাটিয়ে দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ। পরিস্থিতি কবে স্বাভাবিক হবে? দিশা দেখাতে পারছেন না কেউই।