Advertisement
E-Paper

আতঙ্কের চেতলাই এখন শান্তির নীড়

আলসে দুপুরে ফেরিওয়ালা হাঁক দিত, ‘সে-লা-ই-জু-তো!’ ছোট্ট আমি বলতাম— বাবা, সেলাই জুতো খাব! আজ সাতাত্তর বছর বয়সেও দেখি এ পাড়ায় ফেরিওয়ালা ঘোরে আগের মতোই। কেউ মাথায় ঝাঁকা নিয়ে হাঁক দিয়ে যায়, কেউ বা আসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে।

নির্মলা মিশ্র

শেষ আপডেট: ১২ ডিসেম্বর ২০১৫ ০১:১৮
—বিশ্বনাথ বণিক।

—বিশ্বনাথ বণিক।

আলসে দুপুরে ফেরিওয়ালা হাঁক দিত, ‘সে-লা-ই-জু-তো!’

ছোট্ট আমি বলতাম— বাবা, সেলাই জুতো খাব!

আজ সাতাত্তর বছর বয়সেও দেখি এ পাড়ায় ফেরিওয়ালা ঘোরে আগের মতোই। কেউ মাথায় ঝাঁকা নিয়ে হাঁক দিয়ে যায়, কেউ বা আসে ঠেলাগাড়ি নিয়ে। আমার ছোট্টবেলার পাড়া অনেক বদলেছে এত বছরে। তবে কোথাও যেন রয়ে গিয়েছে তার সাবেকিয়ানার গন্ধটাও।

চেতলার এ পাড়াতেই জন্মেছি, এ পাড়াতেই বেড়ে ওঠা। আমার ছোটবেলা মানে বাবা পণ্ডিত মোহিনীমোহন মিশ্রের গানের জগতের বন্ধুদের ঘিরে থাকা। কত বড় বড় মানুষ সব আসতেন আমাদের বাড়ি। নিজের শিল্পী হিসেবে পরিচিতি, সে-ও তো এখানেই। বাপের বাড়িটা খানিক তফাতে। প্যারীমোহন রায় রোডের এই ফ্ল্যাটটায় উঠে এলাম বিয়ের পর। তার পর থেকে এটাই আমার ঠিকানা। এ পাড়ায় ক্লাব আছে, রকের আড্ডা আছে, তাতে তর্কও আছে। কিন্তু মারামারি, অশান্তি নেই। প্রণামের পাট উঠে যাওয়া শহরে এখনও এ পাড়ার ছেলেরা বিজয়ার দিনে বাড়ি-বাড়ি গিয়ে পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করে। নাড়ু-নিমকি খাওয়া হয় সর্বত্র। ছোটবেলায় বিজয়ার দিনটায় আমি তো ব্যাগ নিয়ে বেরোতাম, নাড়ু-নিমকি সব ভরে আনার জন্য।

খুব ডাকাবুকো, ডানপিটে ছিলাম তো ছোট থেকেই। ছেলেদের সঙ্গে সমানতালে খেলাধুলো, হুড়োহুড়ি। আমার নামই হয়ে গেল ঝামেলা! স্কুলে যাওয়ার আগে খেলা, স্কুল থেকে ফিরেই আবার খেলতে ছুট। সন্ধে নামলে বাড়ি ফিরে পড়াশোনা, গান। এখন বয়স হয়েছে। তবে ডাকাবুকো মেজাজটা আছে। এখনও অন্যায় দেখলে চুপ করে থাকতে পারি না। সোজাসাপ্টা কথা বলি। সে জন্যই পাড়ার সব বয়সের মানুষ ভালওবাসে আমায়, শ্রদ্ধা তো করেই। আমিও খুব ভালবাসি সকলকে। এ পাড়ার মানুষ এমনিতেই একটা পরিবারের মতো থাকেন। পাড়ার মেয়েদের কাউকে বেশি রাতে বাড়ি ফিরতে দেখলে আমি তো এখনও জানলা দিয়েই বকাঝকা করি। যা দিনকাল এখন! আমাদের পাড়াটা যদিও যথেষ্ট নিরাপদ।

আসলে চেতলাই তো আমূল বদলে গেল। আগে লোকে চেতলা শুনলে ভয় পেত, রাতবিরেতে ট্যাক্সিও আসতে চাইত না এ তল্লাটে। এখন দিব্যি আসে। মানুষ সাধ করে এ পাড়ায় বাসাও বাঁধেন। নতুন নতুন ফ্ল্যাট হচ্ছে রোজই। রাস্তাঘাট দিনে দু’তিন বার করে সাফাই হয়, ফলে ঝকঝকে-তকতকে। প্রচুর আলো বসেছে। ব্রিজটা হওয়ার পরে যাতায়াতটাও তো অনেক সুবিধার হয়ে গিয়েছে। তা ছাড়া, বাজারহাট, দোকানপাট সবই বেড়েছে। সবটারই কৃতিত্ব প্রাপ্য আমাদের পাড়ার ছেলে, রাজ্যের পুরমন্ত্রী ফিরহাদ (ববি) হাকিমের। ওর জন্যই এ পাড়া তো বটেই, গোটা চেতলায় এত উন্নয়ন। আর ববি নিজেও বড্ড ভাল। যখন হোক, যে কোনও দরকারে সব সময়ে পাশে আছে। দুঃস্থদের জন্য চারটে অ্যাম্বুল্যান্স, সৎকার গাড়ি করে দিয়েছে ও। এ ছাড়া, পাড়ায় নিয়মিত রক্তদান শিবির, স্বাস্থ্য শিবির, দুঃস্থদের সাহায্যের ব্যবস্থাও করে।

এ পাড়ার আর একটা চরিত্র হয়ে উঠেছে এখানকার ক্লাবগুলো। বেশ কয়েকটা ক্লাব। তাদের সদস্যদের মধ্যে রাজনৈতিক মতাদর্শের ভেদাভেদ যথেষ্ট আছে। পুজোয়, অনুষ্ঠানে, ফাংশনে সেই বিভেদ অবশ্য ছায়া ফেলে না এতটুকুও। রাজনৈতিক দূরত্ব ঘুচিয়ে সব দল, সব মতের মানুষই হইহই করে উদ্‌যাপনের আনন্দে মাতেন। মাঝেসাঝে জোরে মাইক বাজালে আমিই খানিক বকাঝকা করে দিই। আগেকার ছোট্ট পাড়ার পুজো চেতলা অগ্রণী এখন দক্ষিণের বড়, নামী পুজোগুলোর একটা। সেই পুজো ঘিরে প্রায় বছরভরের উদ্দীপনা থাকে। শীতলা পুজো হয়, দশমহাবিদ্যার পুজোও হয় বেশ বড় করে, ঠিক আমার বাড়ির সামনেটায়। আমার বাপের বাড়ির ২২৫ বছরের দুর্গাপুজো, সে-ও আছে। ফুলে-ফলে ঘেরা মাকালী বাগানের ঠাকুরদালানে। একটা বিশাল পুকুরও ছিল আগে। তা অবশ্য এখন বুজিয়ে ফেলা হচ্ছে।

আর ফাংশন? সারা সন্ধের ফাংশন, রাতভরের জলসা সবই আছে। নামীদামি শিল্পীরা আসেন। আমিও উপস্থিত থাকি প্রতিটা অনুষ্ঠানেই। তবে পাড়ার ফাংশনে এখন আর গাই না। আমার মেজদার নামে মুরারি সঙ্গীত সম্মেলন হত বহু বছর ধরেই। শাস্ত্রীয় সঙ্গীতের বড় বড় শিল্পীরা কে না এসেছেন তাতে! প্রতিযোগিতাও হত। সেখানে সবাই মিলে অংশ নিতাম। ছোটবেলায় আমি, আলো (আরতি মুখোপাধ্যায়) আর হৈমন্তী (শুক্ল)— তিন জনের ন্যাড়ামাথা একটা ছবি ছিল, বোধহয় কোনও এক বছরের এই সম্মেলনেরই। মাঝে বেশ ক’বছর বন্ধ ছিল। কিছু দিন হল আবার চালু করা গিয়েছে সেই সম্মেলন।

আমার কুকুরটা পায়ে পায়ে ঘোরে সারাক্ষণ। ওর মতো এ পাড়ার অন্যান্য পোষ্যরাও পার্কে গিয়ে মজায় মাতে। এ পাড়ায় চারটে পার্ক। তার সবগুলোতেই নানা বয়সের মানুষের আনাগোনা। কেউ প্রাতর্ভ্রমণ করেন, কেউ বা বিকেলে হাঁটেন। বয়স্করাও গোল হয়ে বসে তাস খেলেন। আর আড্ডা তো আছেই। পার্কে, পাড়ার রকগুলো জমিয়ে রাখে প্রাণখোলা সেই আড্ডা। এ পাড়ায় একটা বড় মাঠ বেঁচে আছে এখনও। অনেকখানি সবুজ। গাছগাছালিরও অভাব নেই। কত পাখি আসে— টিয়া, ময়না, কোকিল। আসে কাঠবিড়ালিও। পাখির ডাক ঘিরে রাখে চারপাশ।

বাজারহাটেরও বেশ সুবিধা হয়েছে এখন। চেতলার দুই বাজার, সিআইটি মার্কেট বা বাস্তুহারা বাজার দুটোই আমার বাড়ি থেকে খানিকটা দূরে। এখন আমার বাড়ির দু’পাশের ফুটপাথেই একটা ছোটখাটে বাজার বসে। এ ছাড়া সব্জির গাড়িও আছে। আর হ্যাঁ, এ কালের ছেলেমেয়েরা তো বড় হয়েই ঘরছাড়া হয়ে যায়, কেউ পড়তে, কেউ চাকরি সূত্রে। এ পাড়ায় থেকে যাওয়া ছেলেমেয়েদের সংখ্যাটা কিন্তু এখনও অনেক। পুজো, ফাংশন, ভোট— সবেতেই তাদের দেখা পাই। এ পাড়ায় পুরনো বাড়ি ভেঙে বহুতল উঠছে বটে একের পর এক। তবে তা নিয়ে খেদ নেই আমার। বাড়িগুলো ভেঙে পড়ছিল, বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল। সেগুলো ভেঙে না হয় বহুতল উঠল, ক্ষতি কী! ফ্ল্যাটবাড়ির হাত ধরে আপাদমস্তক বাঙালি পাড়াটায় এখন অবাঙালিদেরও বাস। কিছু এনআরআই-ও আছেন। তবে সবাই মিলেমিশে গিয়েছেন এ পাড়ার বাঙালিয়ানায়, তার সাবেকের সঙ্গে আধুনিকতার বুনোটে। রেস্তোরাঁ-শপিং মলে মুড়ে থাকা এই শহরটায় এখনও ব্যতিক্রমী এখানকার ঝাঁ-চকচকে রেস্তোরাঁর অনুপস্থিতি। তার বদলে এখনও এখানে ছোটখাটো খাবারের দোকান, বাঙালি হোটেলের জলযোগ।

তবে কি কিছুরই অভাব নেই আমার পাড়ায়? আছে। একটা হাসপাতাল বা নার্সিংহোম বড্ড জরুরি। পুরসভার চিকিৎসাকেন্দ্র আছে ঠিকই, তবে তার পরিকাঠামো তো কম। আর দরকার, চেতলা থেকে সরাসরি গড়িয়া-যাদবপুর যাওয়ার একটা বাস রুট। ওই রাসবিহারী মোড়ে গিয়ে বাস বদলটা বয়স্কদের পক্ষে বেশ অসুবিধের। তবু এই পাড়াটাই ভাল। এই রাম-রাজত্বেই অপার শান্তিতে থাকি। পাড়াটা মন্দ হলে কি আর এতগুলো বছর এখানেই কাটিয়ে দিতাম?

লেখক প্রবীণ সঙ্গীতশিল্পী

chetla law and problem nirmala mishra

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy