রাজ্যে তৃণমূল কংগ্রেস ক্ষমতা হারানোর পরে বিরোধী পরিসর দখল করতে দৃশ্যতই সক্রিয়তা বাড়াচ্ছে কংগ্রেস। সেই অবস্থান থেকেই রাজ্যে নন্দীগ্রাম ও রেজিনগর কেন্দ্রের উপনির্বাচনে তারা প্রার্থীও দিয়েছে। এরই মধ্যে আদি তৃণমূলের নাম ও প্রতীকে নির্বাচন কমিশনের নিষেধাজ্ঞা, নন্দীগ্রামে ভোটে লড়া থেকে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের প্রার্থীর সরে দাঁড়ানোর পরে কংগ্রেসকে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সমর্থন এবং নন্দীগ্রামে কংগ্রেস প্রার্থী গ্রেফতারের ঘটনায় সর্বভারতীয় কংগ্রেসের প্রতিক্রিয়া-সহ নানা ঘটনা ঘটেছে শুক্রবার। পর পর ঘটনাপ্রবাহে আলোড়ন তৈরি হয়েছে কংগ্রেস শিবিরেও। দুর্নীতি-সহ নানা অনিয়মে অভিযুক্ত তৃণমূলের সঙ্গে ‘নৈকট্য’ গড়তে প্রদেশ কংগ্রেসের বড় অংশের এখনও আপত্তি আছে। ফলে, পরিবর্তিত পরিস্থিতিতে ‘বৃহত্তর লড়াই’য়ের কথা বলে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে নেমেছে তারা। পাশাপাশি, নন্দীগ্রামে তৃণমূলের সমর্থনকেও কিছুটা ‘দূরত্ব’ রেখেই মমতার ‘বাধ্যবাধকতা’ হিসাবে দেখছেন প্রদেশ কংগ্রেস নেতৃত্বের একাংশ।
তৃণমূলের প্রতীক-কাণ্ডে লোকসভার বিরোধী দলনেতা রাহুল গান্ধী বলেছেন, “এটা শুধু মমতার নয়, সব রাজনৈতিক দল, ভোটারের লড়াই।” কংগ্রেস শীর্ষ নেতৃত্বের বক্তব্য, রাহুল-সহ তাঁরা সকলেই বিজেপির বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মিলে বিরোধী ‘দল ভাঙানো’, কমিশনের বিরুদ্ধে ভোট চুরির অভিযোগে তৃণমূলের পাশে রয়েছেন। কিন্তু তৃণমূল-জমানায় দুর্নীতির প্রশ্নে কংগ্রেসের কোনও স্তরই মমতার পাশে নেই। তাই নন্দীগ্রাম, রেজিনগর উপনির্বাচনে মমতার সঙ্গে কোনও রকম সমঝোতাও করতে চায়নি কংগ্রেস। কারণ, সে ক্ষেত্রে দুর্নীতির ‘দায়’ কংগ্রেসের ঘাড়েও পড়বে। কংগ্রেস, তৃণমূল ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চে যেমন এক সঙ্গে ছিল, তেমন থাকবে। কিন্তু রাজ্য স্তরে এখনই আসন সমঝোতার প্রশ্ন নেই। ২০২৯-এর লোকসভা নির্বাচন এখনও অনেক দূর। তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী সিদ্ধান্ত হবে।
এই প্রেক্ষিতে নন্দীগ্রামের দলীয় প্রার্থীকে মমতার সমর্থন প্রসঙ্গে ইঙ্গিতে কিছুটা ‘দূরত্ব’ রেখেই প্রদেশ কংগ্রেস সভাপতি শুভঙ্কর সরকার বলেছেন, “বিজেপির তাণ্ডব, আগ্রাসনের বিরুদ্ধে যাঁরা লড়তে চান, তাঁদের সবার কংগ্রেসের প্রার্থীকে সমর্থন করা উচিত। কেউ আমাদের সমর্থন করতে চাইলে, আমরা কি বলব সমর্থন দরকার নেই?” সমর্থনের ‘সময়ে’র কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে কংগ্রেস ওয়ার্কিং কমিটির সদস্য অধীর চৌধুরী বলেছেন, “মমতা কখন (সমর্থনের কথা) বলছেন? ওঁর প্রতীকে খেলার খেলোয়াড়ই পেলেন না। আর খাম প্রতীকের তলায় বিজেপি যা দেওয়ার দিয়েছে। খামের মুখ খুলবে না। তাই মমতার মনে হয়েছে, তৃতীয় শক্তি হিসাবে কংগ্রেসকে সমর্থন করা দরকার।”
কিছুটা ‘দূরত্বে’র ইঙ্গিত সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহেও মিলছিল বলে রাজনৈতিক শিবিরের একাংশ মনে করছে। সম্প্রতি কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের সাংসদ কল্যাণ বন্দ্যোপাধ্যায় দাবি করেছিলেন, তিনি নন্দীগ্রাম, রেজিনগরে আসন সমঝোতা নিয়ে কংগ্রেসের সর্বভারতীয় সাধারণ সম্পাদক (সংগঠন) কে সি বেণুগোপালকে মমতার বার্তা পৌঁছে দিয়েছিলেন। কিন্তু জবাব মেলেনি। পরে কালীঘাটপন্থী তৃণমূলের আর এক সাংসদ ডেরেক ও’ব্রায়েনও কথা বলেছিলেন। কংগ্রেস সূত্রের বক্তব্য, মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর ছেড়ে যাওয়া আসন নন্দীগ্রাম কংগ্রেসের জন্য ছেড়ে দেওয়ার প্রস্তাবের কোনও যৌক্তিকতা ছিল না। বিশেষ করে যেখানে তৃণমূলই দু’টুকরো। তৃণমূল সূত্রের অবশ্য দাবি, গত জুনে ‘ইন্ডিয়া’ মঞ্চের আলোচনায় সনিয়া-রাহুল গান্ধীর সঙ্গে মমতা-অভিষেক বন্দ্যোপাধ্যায়ের কথা হয়েছিল।
তবে প্রতীক-কাণ্ডে রাহুল-সহ কংগ্রেসের একগুচ্ছ নেতা কমিশনের বিরুদ্ধে সরব হয়েছেন। রাহুল বলেছেন, “প্রথমে শিবসেনা, পরে এনসিপি, এ বার তৃণমূল। বিজেপি নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে মিলে প্রথমে দল ভাঙে। তার পরে প্রতীক কেড়ে নেয়। ভোট, সরকার, দল চুরি— এটাই গণতন্ত্রের অধঃপতনের প্রতীক।” বিজেপি মুখপাত্র সুধাংশু ত্রিবেদীর পাল্টা কটাক্ষ, “বাস্তবে কংগ্রেস ভেঙে তৈরি হয়েছে এনসিপি ও তৃণমূল। আর কংগ্রেস যে কত দল ভেঙেছে, কত সরকার ফেলেছে, তার ইয়ত্তা নেই!”
কংগ্রেস ভেঙে তৃণমূল সৃষ্টির ইতিহাস ইঙ্গিতে স্মরণ করিয়ে দিয়ে কংগ্রেস নেতা অধীরেরও কটাক্ষ, “বটগাছের নাম কংগ্রেস। সেই বটগাছ থেকে ঝরে পড়া শুকনো পাতাকে বটগাছ মনে করে ভোট দিলে বটগাছেরই অপমান হয়।”