মুখের আদলে ছবি তৈরি করে যন্ত্রকে বোকা বানিয়ে বা আঙুলের ছাপ হুবহু নকল করে প্রতারণার ঘটনা ঘটেছে বহু বার। এ সবের থেকে পুরোপুরি আলাদা, যাকে সবচেয়ে বেশি সুরক্ষিত বলেন সাইবার গবেষকেরা, সেই আইরিস বা চোখের রেটিনা স্ক্যানও কি আর নিরাপদ রয়েছে? এই প্রশ্নই উঠছে সাম্প্রতিক একাধিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে। পুলিশ সূত্রের খবর, সম্প্রতি একাধিক অভিযোগ তারা পেয়েছে, যেখানে দেখা যাচ্ছে কোনও ব্যক্তির চোখের রেটিনা স্ক্যান এবং ভিতরের রক্তনালীর ছবি, যা এত দিন সবচেয়ে বড় সুরক্ষা-বর্ম হিসাবে ধরা হয়েছে, বোকা বানিয়ে ফেলা হয়েছে সেই পদ্ধতিকেও। এই পথে কারও পরিচয় চুরি করে মোটা টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে, কারও অ্যাকাউন্ট থেকে সরিয়ে ফেলা হয়েছে লক্ষ লক্ষ টাকা!
ঘটনাটি ঠিক কী? সম্প্রতি এক তরুণী পুলিশকে জানিয়েছেন, তিনি চাকরির খোঁজ করছিলেন। সেই সূত্রে তাঁর কাছে ইন্টারভিউয়ের ইমেল আসে। সেখানে কথাবার্তা চালানোর পরে ইন্টারভিউয়ের তারিখ স্থির হয়। নির্দিষ্ট দিনে, নির্দিষ্ট সময়ে ল্যাপটপে বসে তরুণী ভিডিয়ো কলে ইন্টারভিউ দেন। এর এক মাসের মধ্যেই ব্যাঙ্ক থেকে এই মর্মে ইমেল আসে যে, তাঁর নামে ৬০ লক্ষ টাকা ঋণ নেওয়া হয়েছে। হতচকিত ওই তরুণী পুলিশকে জানান, ইন্টারভিউ চলাকালীন তাঁকে পাঁচ মিনিট ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কিছু বলতে বলা হয়েছিল। পুলিশের অনুমান, সেই সময়েই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে ডিপ ফেক পদ্ধতিতে তরুণীর চোখের রেটিনা স্ক্যান করে নেওয়া হয়। আর একটি ঘটনায়, ভিডিয়ো কলে কথা বলা এক ব্যক্তির নামে ই-ওয়ালেট খুলে হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে কয়েক লক্ষ টাকা।
ইন্ডিয়ান স্কুল অব অ্যান্টি হ্যাকিংয়ের অধিকর্তা সন্দীপ সেনগুপ্ত বলেন, ‘‘রেটিনা স্ক্যান পদ্ধতিতে চোখের ভিতরের রক্তনালীর সব কিছু স্ক্যান করা হয় এবং এতে এক জনের সঙ্গে অন্য জনের মিল থাকা সম্ভব নয়। তার মধ্যেও এমন প্রতারণা ঘটলে বিষয়টা চিন্তার।’’
সাইবার গবেষকেরা জানাচ্ছেন, আঙুলের ছাপের মতো প্রত্যেক মানুষের চোখের রেটিনার ধরনও আলাদা। সেই কারণেই আধার কার্ড করাতে, বেশি টাকার লেনদেনে, এমনকি দেশের রেশন ব্যবস্থাতেও এই পদ্ধতি যুক্ত করা হয়েছে। যদিও পুলিশ জানাচ্ছে, বিভিন্ন ভুঁইফোড় সংস্থা বিনামূল্যে ডিজিটাল মুদ্রা, গিফট কার্ড বা নগদ টাকার লোভ দেখিয়ে সাধারণ মানুষের চোখের রেটিনা স্ক্যান করে নিচ্ছে। সেই তথ্য ডার্ক ওয়েবে বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে অথবা ভুয়ো পরিচয় তৈরি করে অপরাধমূলক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে।
কলকাতা পুলিশের এক কর্তার দাবি, এর জন্য সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হচ্ছে ভুয়ো স্বাস্থ্য শিবির বা পরিচয়পত্র যাচাইয়ের বন্দোবস্ত। অনেক সময়ে বিনামূল্যে চোখ পরীক্ষার অজুহাতে বা অনুমোদনহীন অ্যাপের বায়োমেট্রিক ভেরিফিকেশনের বাহানায় তথ্য হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে। ব্যাঙ্কের পিন চুরি হলে তা সহজেই পরিবর্তন করা যায়, কিন্তু চোখের রেটিনা স্ক্যান যে হেতু কখনওই পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তাই এর বিপদ আরও বেশি।
কলকাতা পুলিশের এক গোয়েন্দার দাবি, এক সময়ে অপরাধীরা ভুক্তভোগীর চোখের উচ্চ মানের প্রিন্ট করা ছবি ব্যবহার করে বায়োমেট্রিক যন্ত্রকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছিল। এখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে লাইভ ভিডিয়ো তৈরি করা হচ্ছে। বহু ক্ষেত্রে কোনও নির্দিষ্ট ব্যক্তির চোখের ধরন অনুকরণ করে বিশেষ ভাবে তৈরি কন্ট্যাক্ট লেন্স পরে নিরাপত্তা ভাঙার চেষ্টা হচ্ছে।
তা হলে সুরক্ষিত থাকার উপায় কী? পুলিশ বলছে, উপহার, টাকা বা ক্রিপ্টোকারেন্সির লোভে অপরিচিত সংস্থাকে যে কোনও বায়োমেট্রিক তথ্য দেওয়া থেকে বিরত থাকতে হবে। কোনও সংস্থা বায়োমেট্রিক তথ্য সংগ্রহ করতে চাইলে তাদের প্রাতিষ্ঠানিক বৈধতা আগে যাচাই করে নিতে হবে।
এক পুলিশকর্তার দাবি, ‘‘যতটা সম্ভব ক্যামেরার দিকে তাকিয়ে কথা বলা এড়িয়ে চলা ভাল। বিশেষত, চাকরির ইন্টারভিউ এবং অপরিচিত কারও সঙ্গে ভিডিয়ো কলে কথা বলার সময়ে বাড়তি সতর্ক থাকতে হবে।’’