চারদিকে বিঘের পর বিঘে ধানখেত। তারই মাঝখানে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে গোটা পাঁচেক টিনের ঘর। গরমে চাঁদি ফেটে যায়। বর্ষায় সামাল সামাল। কখনও বৃষ্টির ছাটে ভিজে যায় বইখাতা। কখনও ঘরে ঢুকে পড়ে সাপখোপ।
বারো মাসে বর্ষার ভয়টাই বড় বেশি। ওরা তাই সাবধানে থাকত। রাতে খাওয়া জুটুক, নাই বা জুটুক মশা ও সাপ থেকে বাঁচতে মশারি টাঙাতে ভুল হত না। কিন্তু তাতেও শেষরক্ষা হল না। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে সর্পদষ্ট হয়ে মৃত্যু হল চাপড়ার শিকরা গ্রামে আবাসিক এক খারিজি মাদ্রাসার দুই পড়ুয়ার। সাকিল বিলগাবা (১৩) ও আব্দুল কাদিল মহলদার (১৪) নামে ওই দুই পড়ুয়ার বাড়ি চাপড়ার বাঙালঝিতে। সর্পদষ্ট হয়ে ওই মাদ্রাসার আরও দু’জন ছাত্র শক্তিনগর ও কল্যাণী জেএনএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
এই ঘটনার পরে বেশ কিছু প্রশ্ন ভাবাচ্ছে পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশকে। তাঁদের প্রশ্ন, একটা সাপের পক্ষে কি চার জনকে ছোবল মারা সম্ভব? ওই চার জন ঘরের চার কোণায় ঘুমিয়েছিল। তাহলে কি ঘরের মধ্যে একাধিক সাপ ঢুকেছিল? স্থানীয় এক বাসিন্দা বলছেন, ‘‘ঘটনার পরেই ঘরে আলো জ্বালানো হয়। কিন্তু একটি সাপও দেখা যায়নি। মাঠের ধারে ওই মাদ্রাসা। এই সময় সাপের উপদ্রব বাড়ে। মাদ্রাসাতে সাপ ঢোকাও অস্বাভিক কিছু নয়। কিন্তু এক সঙ্গে চার জনকেই সাপে ছোবল মারল? এটাই আমরা বুঝতে পারছি না।’’
তবে প্রাথমিক ভাবে চিকিৎসকদের দাবি, সাপের ছোবলে মৃত্যু হয়েছে ওই দু’জনের। শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের চিকিৎসক ব্রজেশ্বর মুখোপাধ্যায় বলেন, “নিউরোটক্সিন জাতীয় বিষের কারণেই মৃত্যু হয়েছে সাকিল ও আব্দুলের। সাপের ছোবলের দাগও স্পষ্ট। বিষধর কোনও সাপের ছোবলেই এমন ঘটনা।’’ জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তন্ময় ভট্টাচার্য বলেন, “আমাদেরও মনে হচ্ছে সর্পদষ্ট হয়েই মৃত্যু। তবে ময়নাতদন্তের রিপোর্ট পাওয়ার পরেই মৃত্যুর কারণ নিশ্চিত ভাবে বলা যাবে।’’
বছর চারেক আগে শিকরা গ্রামে এই আবাসিক খারিজি মাদ্রাসাটি প্রতিষ্ঠিত হয়। ৩৫ থেকে বাড়তে বাড়তে বর্তমানে পড়ুয়ার সংখ্যা ৭৫ জন। সিমেন্টের মেঝে আর বাঁশের কাঠামোর উপরে টিনের দেওয়াল। ছাদও টিনের। মেঝে আর টিনের বেড়ার ফাঁক দিয়ে রোদ-বৃষ্টি-সাপ সবই ঢুকতে পারে। ওই ঘরেই দিনের বেলা চলে পড়াশোনা। রাতে সেখানেই বিছানা পেতে ঘুমিয়ে পড়া। সেই রোজনামচার তাল কাটল এ দিন রাতে।
একটি ঘরে সাকিল, আব্দুল-সহ ১৯ জন ছাত্র ঘুমিয়েছিল। রাত সাড়ে বারোটা নাগাদ চার জন সর্পদষ্ট হয়। তাদের চিৎকারে ছুটে আসেন মাদ্রাসার শিক্ষক ও কর্তব্যরত এক সিভিক ভলান্টিয়ার। তাঁরাই গাড়ি জোগাড় করে চার জনকে নিয়ে যান চাপড়া গ্রামীণ হাসপাতালে। সেখান থেকে তাদের শক্তিনগর জেলা হাসপাতালে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানেই মারা যায় সাকিল ও আব্দুল।
শক্তিনগর জেলা হাসপাতালের বিছানায় শুয়ে বছর বারোর জুম্মাত ইটলে বলছে, ‘‘রাতে চিৎকার শুনে আমিও জেগে গিয়েছিলাম। কিন্তু বুঝতে পারিনি আমাকেও সাপে ছোবল মেরেছে। সকালে দেখি হাতের আঙুল ফুলে গিয়েছে। প্রচণ্ড ব্যথা।’’
ওই মাদ্রাসায় যারা থাকে তারা কেউ কৈশোর পোরোয়নি। বাড়িতে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। তাই অভিভাবকেরা ওই খারিজি মাদ্রায় ভরসা করে রেখে যান। লেখাপড়া-থাকা-খাওয়া সবই জোটে প্রায় নিখরচায়। মাদ্রাসার পরিচালন সমিতির সম্পাদক আলাউদ্দিন মণ্ডলের কথায়, ‘‘অভিভাবকেরা বিশ্বাস ও ভরসা করে আমাদের হাতে তুলে দেন। কিন্তু কী ভাবে যে এ সব ঘটে গেল, ভাবতেই পারছি না।’’
তবে এই ঘটনার পরে অভিভবাকেরা আর ভরসা রাখতে পারছেন না। শুক্রবার সকাল
থেকেই বহু অভিভাবক লোটাকম্বল গুটিয়ে ছেলেকে নিয়ে বাড়ি চলে গিয়েছেন। নাকাশিপাড়া ফিরোজা বিবি, পাটপুকুরের সমশের শেখেরা বলছেন, ‘‘আগে তো বাড়ি নিয়ে যায়। পরে আবার পাঠাব কি না
ভেবে দেখব।’’