পুজো ফুরোতে চলল কিন্তু পুজো উপলক্ষে বামেদের বইয়ের বিপণি ঘিরে আক্রমণ এবং বিতর্ক থামল না!
যাদবপুরে বইয়ের বিপণি ভাঙতে বুলডোজ়ার নামানোর ঘটনার প্রেক্ষিতে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছিল সিপিএমের এরিয়া কমিটি। কিন্তু কলকাতা হাই কোর্ট মঙ্গলবার সেই মামলা খারিজ করে দিয়েছে। বিচারপতি পার্থপ্রতিম রায়ের বেঞ্চ বলেছে, বনগাঁর ঘটনা নিয়ে ডিভিশন বেঞ্চের যা নির্দেশ আছে, তার বাইরে এখন আর কিছু বলার নেই। আদালতের এই মতকে হাতিয়ার করেই পুজোয় বামেদের বইয়ের বিপণি বসানোর বিরুদ্ধে সওয়াল করেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। রাজ্যের প্রশাসনিক কর্ণধার যখন এই কথা বলেই যাচ্ছেন, রাজ্যের বিভিন্ন জায়গা থেকে বিক্ষিপ্ত ভাবে বামেদের বইয়ের স্টলে হামলার অভিযোগ এসেছে বিজেপি এবং আরএসএসের বাহিনীর বিরুদ্ধে। আর এই ডামাডোলের বাজারে অন্য বারের তুলনায় বইয়ের বিক্রি বেড়ে গিয়েছে বলে বাম শিবিরের দাবি।
চোরবাগানে পুজো মণ্ডপের বাইরে পদস্পৃষ্ট হয়ে মৃত আরতি সরকার বিশ্বাসের বাড়ি থেকে বেরিয়ে নদিয়ার চাকদহে মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু বলেছেন, ‘‘হাই কোর্ট যা বলার, বলে দিয়েছে। বিভিন্ন জায়গায় সিপিএমের অজস্র পার্টি অফিস রয়েছে। সেখানে লাইব্রেরি করে বই রাখুন। মানুষ সেখানে গিয়ে পড়বেন। যারা সনাতন, গীতা মানে না, তারা পুজোয় স্টল দেবে কেন?’’ সেই সঙ্গেই বামেদের প্রতি তাঁর তীব্র কটাক্ষ, ‘‘মানুষ এঁদের সঙ্গে নেই। এঁরা কখনও মানুষের রায়ে নির্বাচিত হননি। বিভিন্ন জায়গায় ভোটে দাঁড়িয়ে হেরেছেন। এঁদের বলব, সামনে পুরসভা ও পুর-নিগম নির্বাচন। সেখানে লড়াই করুন। দেখবেন মানুষ ওদের সঙ্গে নেই। জামানত বাজেয়াপ্ত হবে!’’
আরএসএসের নেতা জিষ্ণু বসু সোমবারই বলেছিলেন, ‘ক্ষমতার দম্ভে’ যারা এখন বইয়ের স্টল ভাঙচুর করছে, বিরোধীদের উপরে অত্যাচার করছে, তারা ‘কাপুরুষ’। পরে সুর বদলে তিনি অবশ্য দাবি করেছেন, অতীতেও বাম ও তৃণমূল কংগ্রেসের জমানায় সঙ্ঘ পরিবারের সাহিত্য বিক্রিতে নানা ভাবে বাধা দেওয়া হয়েছে। রাজ্যের অর্থমন্ত্রী স্বপন দাশগুপ্ত আরও স্পষ্ট করে বলেছিলেন, ‘‘গেরুয়া পরে গুন্ডামি চলছে!’’ এই ধরনের হামলায় মাথা নত হয়ে যাচ্ছে বলে মন্তব্য করার পাশাপাশিই স্বপনের বক্তব্য, হিন্দু ধর্মে নাস্তিকতারও স্বীকৃতি আছে। কেউ নাস্তিক বলে তাদের বইয়ের স্টলে হামলা করতে হবে, এই যুক্তি দাঁড়ায় না। মুখ্যমন্ত্রী তার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই অর্থমন্ত্রীর যুক্তির উল্টো পথে গিয়ে নিজের অবস্থানে অনড় রইলেন। শুধু তা-ই নয়, বইয়ের বিপণিতে হামলা দল অনুমোদন করে না বলে জানিয়ে বিজেপির রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য বলেছেন, অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য তিনি প্রশাসনকেও জানিয়েছেন। তবে শাসক শিবিরেরই একাংশের মত, তেমন সম্ভাবনা যে আপাতত বিশ বাঁও জলেই, মুখ্যমন্ত্রীর কথাতেই তার ইঙ্গিত আছে!
এই প্রেক্ষিতে সিপিএমের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য সুজন চক্রবর্তী বলেছেন, ‘‘হাই কোর্ট বনগাঁ সংক্রান্ত নির্দেশের কথা বলেছে। নাস্তিক বলে বইয়ের স্টল করা যাবে না তো বলেনি। ওটা মুখ্যমন্ত্রী মেশাচ্ছেন! আর উনি জানেন না, আমরা মানব-ধর্ম এবং দেশের সংবিধানকে মেনে চলি। আমার মা পুজো করতেন, লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়তেন। আমার দাদা পৈতে পরেন, আমি পরি না। সংবিধান তো এই অধিকার দিয়েছে।’’ তাঁর সংযোজন, ‘‘যত ওঁরা চোখ রাঙিয়েছে, মানুষের জেদ তত বেড়েছে। গত বারের চেয়ে এ বার অন্তত দেড় গুণ বেশি বিক্রি হয়েছে বই। জনতার আদালতে বিজেপির এই বাহিনীকে হারতে হবে।’’
সিপিএম সূত্রের খবর, যাদবপুরের যে স্টল ঘিরে প্রবল টানাপড়েন, সেখানে গত পুজোয় চার দিনে সাড়ে চার লক্ষ টাকার কিছু বেশি বই বিক্রি হয়েছিল। এ বার হয়েছে প্রায় ১৩ লক্ষ টাকার। হালতুতে ষে বিপণি পুলিশ তুলে দিতে বলেছিল, সেখানে দু’দিনে বিক্রি হয়েছে ২০ হাজার টাকার বেশি মূল্যের বই। একই ভাবে হাওড়ার বি গার্ডেন এরিয়া কমিটির অন্তর্গত কোলেবাজার, দানেশ শেখ লেন এবং বকুলতলা— এই তিন জায়গায় প্রগতিশীল বইয়ের স্টল প্রতি বছর হয়। এর মধ্যে দানেশ শেখ লেন এবং কোলেবাজারের স্টল মিলিয়ে গড়ে হাজার দশেক টাকার বই বিক্রি হত। পুলিশ এ বছর দানেশ শেখ লেনে স্টল বসানোর অনুমতি দেয়নি। পঞ্চমীর রাতে কোলেবাজারের স্টলে ভাঙচুরের অভিযোগ ওঠে বিজেপির বিরুদ্ধে। ভাঙা কাঠামোর উপরে টেবিল পেতে ষষ্ঠীর দিন থেকে ফের বুক স্টল শুরু হয়। ভাঙচুরের পরে শুধু কোলেবাজারের স্টলেই ২৫ হাজার টাকার বই বিক্রি হয়েছে। সন্তোষপুরে গিয়ে এ দিন বই বিক্রি করেছেন সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক মহম্মদ সেলিমও।
নবমীর রাতে শিলিগুড়িতে সিপিএমের জেলা দফতর অনিল বিশ্বাস ভবনের সামনে বই বিপণিতে শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের একটি বই বিক্রি করায় আপত্তি জানানোর অভিযোগ উঠেছে আরএসএস-বিজেপির বিরুদ্ধে। ঘটনাস্থলে পুলিশ গিয়েছে। বিজেপি অভিযোগ মানেনি। অশোকনগর শেরপুরে সিপিএমের বইয়ের স্টলে বিজেপির হামলার অভিযোগ উঠেছে, ঘটনা মোকাবিলায় গিয়ে এক পুলিশ-কর্মীও জখম হয়েছেন। ইসলামপুর বাসস্ট্যান্ডেও সিপিএমের স্টলে হামলার অভিযোগ এসেছে বিজেপির বিরুদ্ধে। ময়না, সোনামুখী, চাপড়া, নিমপীঠের মতো নানা জায়গায় শাসক দল ও পুলিশের ‘চাপ’ এবং হামলার অভিযোগ করেছে এসইউসি, সে সব প্রতিরোধ করে বই বিক্রিও চলেছে।
তবে এরই মধ্যে বিজেপির যুব মোর্চার রাজ্য সভাপতি তথা আমতার বিধায়ক অমিত সামন্ত সোমবার রাতে নিজের কেন্দ্রে নারিট বাজারে বামেদের স্টলে গিয়ে বই কিনেছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘এর সঙ্গে রাজনীতির কোনও সম্পর্ক নেই। আমরা বইয়ের স্টল ভাঙার বিরোধী। আমার বিধানসভা কেন্দ্রে ওরা বুক স্টল দিয়েছে। সেই খোঁজ খবর নিতেই গিয়েছিলাম।’’ তবে তাঁর মতে, ‘‘দুর্গা পুজো উপলক্ষে স্টলে দুর্গা পুজো কথাটা লেখা থাকাই উচিত।’’ নানা সময়ে হুমকি দিলেও ব্যারাকপুরে এসইউসি-র স্টলে গিয়েছিলেন বিজেপির বিধায়ক কৌস্তভ বাগচীও।