সত্যি বলতে কী, গত বছর দেশের স্বাধীনতা দিবসের কথা আলাদা করে মাথায় আসেনি। আসার কথাও নয়। কারণ, দেশের প্রকৃত নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও জোর করে আমাদের বাংলাদেশে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছিল। গত বছর ওই দিনটিতে ভিন্ দেশে ছিলাম। ভয়ে দিন কাটছিল। তার দিন কয়েক পরেই বাংলাদেশের পুলিশ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে আমাদের ধরে। এ দেশ আমাদের অনুপ্রবেশকারী তকমা দিয়ে ও দেশে পাঠাল। ও দেশেও আমরা অনুপ্রবেশকারী হিসেবেজেলে কাটালাম।
এ বার অনেক স্বস্তিতে আছি। কারণ, নিজের দেশে ফিরতে পেরেছি। সন্তানদের সঙ্গে থাকতে পারছি। বাংলাদেশ থেকে ফিরতে পেরেছেন আমার স্বামীও (দানিশ শেখ)। দেশ জুড়ে এ বার স্বাধীনতা দিবস পালন দেখতে পাব। কিন্তু স্বাধীন দেশের স্বাধীন নাগরিক হওয়ার মানসিক শান্তি এখনও অনুভব করতে পারছি না।
পাইকর দর্জিপাড়ায় আমার বাপের বাড়িটা খুব ছোট। তিন সন্তানকে নিয়ে কষ্ট করে সেখানেই আছি। স্বামী রাজমিস্ত্রির জোগাড়ের কাজ করছে। কাজ থাকলে, মজুরি দিনে ৩০০ টাকা। তাতেই চলছে সংসার। দিনের খরচ, ছেলেমেয়েদের পোশাক, লেখাপড়ার খরচ, ওষুধ কেনা— সবই ওই টাকায়।
অথচ, দিল্লিতে অনেক ভাল ছিলাম। আয় অনেকটাই বেশি ছিল। স্বামী কাবাড়ির (লোহালক্কড় কুড়োনো) কাজ করত। আমি গৃহ পরিচারিকার কাজ করতাম। টাকার জন্য এত ভাবতে হয়নি। গত বছর জুনে সব বদলে গেল, যখন আমার স্বামীকে পুলিশ ধরল। আমাকে ও আমার নাবালক ছেলেকে ধরল। স্বামীর সব নথি (প্যান কার্ড, আধার কার্ড) দিল্লি পুলিশ কেড়ে নিয়েছে। কবে সে সব ফের করানো যাবে, চিন্তায় আছি। আমার স্বামী দিল্লির স্কুলে পড়েছে তার নথি শুধু এখানে আছে। আর আছে ওদেরপারিবারিক দলিল।
আমার আধার, প্যান কার্ডের ফোটোকপি থাকায়, সে সব ফের হয়েছে। কিন্তু, ভোটার কার্ড নেই। আবেদন করেছি। কী হবে জানি না! ভোটার কার্ডে নাম নেই, তাই রেশন বন্ধ। অন্য সরকারি সুযোগ-সুবিধাও পাব না। সদ্যোজাত সন্তানের জন্ম রামপুরহাট হাসপাতালে হলেও, জন্মের শংসাপত্র হয়নি। কারণ, ওর বাবার আধার কার্ড নেই। কী ভাবে সব ঠিক হবে বুঝতে পারছি না। শনিবার দেশ ৮০ তম স্বাধীনতা দিবস পালন করবে। ভাল লাগছে। আক্ষেপ একটাই, স্বাধীন দেশের নাগরিক হয়েও স্বাধীন ভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার উপায় ও সুযোগ আমাদের নেই। মাঝেমাঝে ভাবি, আমাদের কী অন্যায় ছিল যে, এ দেশের প্রকৃত নাগরিক হওয়া সত্ত্বেও এত দুর্ভোগ ও কষ্ট পেতে হচ্ছে!
অনুলিখন: দয়াল সেনগুপ্ত