কোনও এক দুর্গাপুজোর কথা। ছোট্ট হাতের মুঠোয় একরাশ লাল চন্দনের বীজ এনে দিদিকে দিয়ে শুভ বলেছিল, “মালা গেঁথে দিবি? পুতুলকে পরাব।” ভাইয়ের আবদার ফেলেনি দিদি। পুতুলের জন্য একটা, আর ভাইয়ের জন্য একটা মালা গেঁথে দিয়েছিল। নতুন জামা-প্যান্টের সঙ্গে সে বার টুকটুকে লাল মালা গলায় পুজোয় ঘুরেছিল শুভ।
দিদির পুতুলগুলোই ছিল ওর খেলার সঙ্গী। পাড়ার ছেলেরা খেলায় নেয় না। মেয়েরাও দূরে থাকে। তাই একাই ঘরের দাওয়ায় বসে মায়ের ছেড়ে রাখা শাড়ি গায়ে পেঁচিয়ে শুভ রান্নাবাটি খেলে। পুতুলকে সাজিয়ে বিয়ে দেয়। ভাবে, এক দিন ওরও বিয়ে হবে। শাড়ি, শাঁখা, সিঁদুরে কী সুন্দর লাগবে দেখতে! বয়স তখন দশ-বারো হবে, কপাল জুড়ে সিঁদুরের টিপ, ঠোঁটে লালির ছোঁয়া, কানে দুল, হাতে চুড়ি— মনসা পালায় মনসা সেজেছে শুভ। দিব্যি আঁচল সামলে নিজের ছন্দে নাচছে। ওস্তাদের পড়ানো বড় বড় গান গড়গড় করে বলে চলেছে। বেহুলা-লখিন্দর পালায় বেহুলার সাজে স্বামী হারানোর কান্নায় যখন সে মঞ্চ মাতিয়ে তোলে, মায়ায় জড়িয়ে যায় পাড়াগাঁয়ের মন। কত লোক এসে প্রণাম করেন, হাতে টাকা দেন। আবার কেউ বলেন, “তুই ছেলেমানুষ না মেয়েমানুষ রে? না কি কতি?”
ছোট্ট ছেলেটার নিজেকে ‘কতি’ পরিচয় দিতে মোটেই লজ্জা করেনি। বরং মনে হয়েছিল, “ঈশ্বর আমাকে যেমন বানিয়েছেন, আমি তেমনই।” নিজেকে বোঝার সেই যাত্রা সহজ ছিল না। কবে যেন ঘরে দিদির নাইটি পরতে শুরু করল শুভ। রে রে করে উঠেছিলেন বাবা, মা, দিদি— সবাই। পুজোয় দিদির পোশাক পরে ঘুরতে বেরিয়েছিল এক বার। হাই স্কুলে ক’জন বন্ধু হয়েছিল, তারাও ওরই মতো। স্কুলের নিয়ম মেনে প্যান্ট-শার্ট পরার ফাঁকেও নখে নেলপালিশ, ত্বক লোমহীন রাখা, বাঁকা ভুরুতে স্লিট কাটা— এ সবের মধ্যে দিয়েই নিজেদের সত্তা তৈরি করছিল ওরা। যৌন পরিচয় পুরুষ হলেও, লিঙ্গ চেতনা নিজেকে রূপান্তরকামী নারী ভাবতে শেখাচ্ছিল ওদের।
সেই শুভ এখন রূপালি (নাম পরিবর্তিত)। বয়স চব্বিশ। লম্বা, ছিপছিপে গড়ন। সিঁথিতে সিঁদুর-টিপ, পরনে ঢোলা পাজামা ও টপ। মাথায় খোঁপা। মূর্তি গড়েন, পালাগান লেখেন। মহিলা ঢাকিদের একটি দলের সঙ্গেও যুক্ত হয়েছেন। পুজো এলেই ওঁর ব্যস্ততা বাড়ে। মাটির গন্ধ, রং, ঢাকের শব্দ, গান— সব মিলিয়ে দুগ্গা যেন ওঁর জীবনের সঙ্গে মিশে যায়। রূপান্তরকামীদের একটি সংগঠনের সঙ্গেও যুক্ত, যারা ন’বছর ধরে দুর্গাপুজো করছে। দেবী সেখানে অর্ধনারীশ্বর। বৈষ্ণব মতে তাঁর পুজো হয়। বছর বছর এই মূর্তির অঙ্গরাগ করে থাকেন রূপালি। অর্থাৎ প্রতিমা রং করা, সাজানো, পুজোর জোগাড়— সবেতেই থাকে তাঁর হাত।
রঙের সরঞ্জাম গোছাতে গোছাতে রূপালি বলেন, “আমাদের মতো মানুষের জীবনে একাকিত্ব সব সময় আছে। আমার বরাবরই ছেলেদের ভাল লাগত। হিজড়া, কতি, ছক্কা, হোমো— শুনে শুনে অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। কলেজে ঢোকার পরে ছেলেদের থেকে আসতে থাকল প্রেম-ভালবাসা বলে যৌন সম্পর্কের প্রস্তাব। বুঝতাম, আমাকে ব্যবহার করছে। তবু, আমাকে যে ওরা সময় দিত, ওটাই ভাল লাগত।” এখন সে সব থেকে দূরে। বলেন, “শিল্পী হতে চেয়েছি। ধীরে ধীরে ঈশ্বরকে নিয়েই বাঁচতে শুরু করি।”
এক ফাঁকে মোবাইল স্ক্রিনে দেখে নেন, কপালের সিঁদুরটা ঠিক আছে তো! ফের বলতে থাকেন, “বিয়ে হয়েছিল একটি ছেলের সঙ্গে। শাস্ত্র মেনে। আমাদের গানবাজনার দলে ঢোল বাজায় ও। মাসছয়েকের ভালবাসা। বাড়ির লোক, পাড়ার ক’জন ডেকে বিয়ে করি আমরা। বছর দুয়েক ভাল কেটেছিল। হঠাৎ এক রাতে ঘরে সতীন নিয়ে এল। ষোলো বছরের একটা মেয়ে। মেয়েই যদি চাইতিস আমাকে বিয়েকরলি কেন?”
লিঙ্গ পরিবর্তনের কথা ভেবেছেন কখনও? গলায় অদ্ভুত দৃঢ়তা এনে রূপালি বলেন, “যে মানুষটা আমাকে ভালবাসবে, আমার মতো করেই তো আমাকে গ্রহণ করবে।” একটু থেমে বলেন, “তা ছাড়া, লিঙ্গ বদলাব অত টাকা কোথায় আমার! পরে হলে হয়তো করাব। লেজ়ার করিয়েছি। দাড়ি-গোঁফ হয় না। পুজোর পরে ভেবেছি হরমোন থেরাপি নেব।” আবার একটু চুপ। ফের বলেন, “তবে কখনও কখনও মনে হয়, পূর্ণাঙ্গ নারী হয়ে উঠতে পারলে সংসারে সতীন আসত না হয়তো!” রূপালি যখন নিজের অধিকার নিয়ে আইনি লড়াইয়ে যেতে চেয়েছিলেন, নানা জটিলতা দেখতে হয়েছিল ওঁকে। বলেন, “সংসার ছাড়ব না ঠিক করেছিলাম। কিন্তু আমাকে গলায় ফাঁস দিয়েছিল ওরা। পাড়ার লোকে বাঁচায়। পুলিশও কী আমাদের কথা শোনে! কেসই নেয়নি তখন।”
কোর্ট থেকে হলফনামা করিয়ে আধার কার্ডে, ভোটার কার্ডেনিজের নাম রূপালি করেছেন। গত বছরও স্বামীর সঙ্গে পুজো দেখেছেন। এক সঙ্গে গানবাজনার দলে অনুষ্ঠান করতে গিয়েছেন। এ বছর আর সেই সব নেই।
রূপান্তরকামীদের যে সংগঠনের সঙ্গে রূপালি যুক্ত, সেই আবাসনের পিছনের দালানেই রয়েছে আরাধ্য অর্ধনারীশ্বর মূর্তিটি। সেখানে দেখা রাজার (নাম পরিবর্তিত) সঙ্গে। বছর তিরিশের রূপান্তরকামী পুরুষ। হরমোন থেরাপি করিয়েছেন। বলছিলেন, “যখন প্রথম ঋতুস্রাব হয়েছিল, মনে হয়েছিল, আমার সঙ্গে এমন কেন হচ্ছে! নিজেরশরীরটা নিজের মনে হত না। সে এক ট্রমা! চেষ্টা করতাম, মেয়ের শরীরের চিহ্ন যেন বাইরে থেকে বোঝা না যায়।” তার পর? “সমাজের সঙ্গে, মনের সঙ্গে লড়াই। তা-ও মনে হয় যদি এত কাটাছেঁড়া, মানসিক সংঘর্ষের পরেও আমার আত্মা আর শরীর এক হতে পারে, এ সব কষ্ট কিছুই না।” নাটকের দল করেন রাজা। বলেন, “এই দীর্ঘ লড়াইয়ে বাড়ির কেউ একটা টাকা দিয়ে সাহায্য করেনি। চাইওনা। আমি রূপান্তরিত হওয়ার লড়াই ছাড়ব না।”
রূপালি, রাজা— দু’জনের কাছেই এ বারের দুর্গাপুজো যেন অস্তিত্ব খুঁজে নেওয়ার যাত্রায় আর এক কদম এগিয়ে যাওয়া। রাজা বলেন, “এখানে আসার আগে পুজোয় বেরোতাম না। লজ্জা লাগত, ভয় লাগত। এখন আমরা এই অর্ধনারীশ্বরের পুজোয় নিজেদের খুঁজে পাই। মা আমাদের মতো একই অঙ্গে নারী-পুরুষ উভয় সত্তাকে ধারণ করেন।”
সন্ধ্যা নেমেছে। দালানে প্রতিমা রাখা। ভোর থেকে শুরু হবে অঙ্গরাগ। পুরনো সব রং, সব সাজ তুলে নতুন রূপ দেওয়া হবে দেবীকে। ওঁরাও আর একটা দিন শুরু করবেন নিজেকে নতুন করে সাজিয়ে তোলার স্বপ্নে।