আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স’ বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নামটা বড়ই বেমানান, মনে করেন আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তাই এই প্রযুক্তির নতুন নাম ঠিক করতে এ বার ময়দানে নেমে পড়েছেন নিজেই। নিজস্ব সমাজমাধ্যম ‘ট্রুথ সোশ্যাল’-এ একটি পোস্ট করে তিনটি সম্ভাব্য নামও প্রস্তাব করেছেন প্রেসিডেন্ট। আর তাঁর ফলোয়ারদের কাছে জানতে চেয়েছেন কোন নামটি সব থেকে ‘উপযুক্ত’।
ট্রাম্পের প্রস্তাব— ‘কৃত্রিম’ শব্দটি ব্যবহার না করে বরং বুদ্ধিমত্তার আগে বসানো হোক অন্য কোনও শব্দ, যেটি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা’র সম্যক পরিচয় তুলে ধরবে। তাঁর পছন্দের তিনটি শব্দ ট্রাম্প নিজেই তাঁর পোস্টে উল্লেখ করেছেন— ‘সুপিরিয়র (উন্নততর)’, ‘একস্ট্রিম (চূড়ান্ত)’ এবং ‘সুপ্রিম (সর্বোচ্চ)’, এবং সাধারণ মানুষকে যে কোনও একটি বেছে নিতে বলেছেন। ট্রাম্পের এই পোস্টে কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ৬০ হাজারেরও বেশি ভোট পড়েছে এবং এখন পর্যন্ত পাল্লা ঝুঁকে রয়েছে ‘উন্নততর বুদ্ধিমত্তা’র দিকেই। এখানেই না থেমে প্রথম পোস্টের কয়েক ঘণ্টা পরেই দ্বিতীয় একটি পোস্ট করে ট্রাম্প লিখেছেন, ‘প্রতিযোগিতা থেকে ‘সর্বোচ্চ বুদ্ধিমত্তা’ আপাতত সরে গিয়েছে। এখন ভোটাভুটি হবে ‘উন্নততর বুদ্ধিমত্তা’ ও ‘চূড়ান্ত বুদ্ধিমত্তা’র মধ্যে।’
প্রেসিডেন্ট যখন নাম খুঁজতে ব্যস্ত, তখন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত বিকাশ এবং তার সম্ভাব্য ঝুঁকি নিয়ে আমেরিকা-সহ গোটা বিশ্বে আলোচনা চলছে। বিশেষ করে অত্যাধুনিক বা ‘ফ্রন্টিয়ার’ এআই মডেল তৈরির গতি কমানো উচিত কি না, তা নিয়ে ভাবছে প্রযুক্তি দুনিয়া। সম্প্রতি ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিয়োয় দেখা গিয়েছে, আমেরিকান কংগ্রেস সদস্য প্রমীলা জয়পালের সামনে দেওয়া এক বিবৃতিতে এক মা ব্যাখ্যা করছেন, কী ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নির্ভর চ্যাটজিপিটি তাঁর ১৮ বছরের ছেলেকে মাদক নিয়ে ভুল তথ্য দিয়েছিল, যার ফলে ছেলেটি অতিরিক্ত মাদক নিয়ে মারা যায়। আমেরিকান প্রযুক্তি সংস্থার শীর্ষ কর্তাদের অনেকেই কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতি নিয়ে দুনিয়াকে সতর্ক করেছেন। এঁদের মধ্যে রয়েছেন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে গবেষণা চালানো আমেরিকান সংস্থা ‘অ্যন্থ্রোপিক’-এর সিইও দারিয়ো আমোদেই। সম্প্রতি তিনি আমেরিকার আইনপ্রণেতা ও নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলিকে জানিয়েছেন যে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার দ্রুত অগ্রগতির সঙ্গে তাল মেলানোর জন্য এই প্রযুক্তির বিকাশের গতি কিছুটা কমানো প্রয়োজন।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভবিষ্যতে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে, এই আশঙ্কাকে অবশ্য কখনওই গুরুত্ব দিতে চান না ট্রাম্প। তাঁর বক্তব্য, শক্তিশালী রাজনৈতিক নেতৃত্ব থাকলে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার উপরে অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই। কোনও সংস্থা আইন ভাঙলে প্রচলিত নিয়ন্ত্রক ব্যবস্থার মাধ্যমেই বিরুদ্ধে পদক্ষেপ করা সম্ভব বলে মনে করেন তিনি।
এখানেই ট্রাম্পের অবস্থানের একটি বৈপরীত্য স্পষ্ট। এত দিন তিনি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার জন্য অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন নেই বলে সওয়াল করেছেন। বলেছেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে প্রয়োজন শুধু এক জন ‘শক্তিশালী ও বুদ্ধিমান’ প্রেসিডেন্টের। কিন্তু শনিবার তিনি জানিয়েছেন, এ বার একটি ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বাহিনী’ তৈরি করবেন, যার শীর্ষে থাকবেন ‘কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা জ়ার (সম্রাট)’। কী কাজ করবে সেই বাহিনী, তার কাঠামোই বা কেমন হবে, তা অবশ্য স্পষ্ট করেননি ট্রাম্প।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা নিয়ে ট্রাম্পের এই তৎপরতার সমান্তরালে রয়েছে এক প্রবল আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশ ও নিয়ন্ত্রণ ঘিরে আমেরিকা ও চিনের মধ্যে দৌড় তীব্র হচ্ছে। চিন মনে করছে, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার বিকাশের গতি কমানোর যে কথা দারিয়ো আমোদেইয়ের মতো কিছু অমেরিকান তথ্য-প্রযুক্তি সংস্থার কর্ণধারেরা বলছেন, তা আসলে প্রযুক্তিতে আমেরিকার এগিয়ে থাকা পাকাপোক্ত করার কৌশল। এই মুহূর্তে বেজিং আদপেই ‘ধীরে চলো’ নীতিতে বিশ্বাসী নয় এবং এই প্রযুক্তির বিকাশকে জাতীয় ক্ষমতার গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হিসেবেই দেখছে।
সতর্কবাণীতে কান না দিয়ে আপাতত চিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় এগিয়ে যাওয়াই পাখির চোখ প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের। আর এই লড়াইয়ে তাঁর হাতিয়ার— ‘উন্নততর বুদ্ধিমত্তা’।