এ-ও এক ত্রিবেণী সঙ্গম।
দূরে পাহাড়ের ঢালে দাঁড়ালে চোখে পড়ছে ত্রিশূলী, সালানখু, বেত্রবতীর সঙ্গমস্থল। নদীর ঘোলা জল আর বিস্তৃত পলির চর। একটু দূরে খণ্ডহরের মতো দাঁড়ানো দোতলা, তিনতলা বাড়িগুলি। জনমানবহীন, প্রেতপুরীর মতো। দরজা, জানলা খসে গিয়েছে বাড়িগুলির। দূর থেকেই গায়ে কাদামাটির দাগ বোঝা যাচ্ছে। কোনও বাড়ির গায়ে গভীর ক্ষত। মাঝেমধ্যেই উড়ে আসছে সেনা কপ্টার। তা থেকে ওঠা-নামা করছেন উদ্ধারকারীরা।
নেপালের অন্যতম প্রাচীন জনপদ, তীর্থক্ষেত্র বেত্রবতী কার্যত নিশ্চিহ্ন। মঙ্গলবারই একটি বাড়িতে ঢুকেছিলেন উদ্ধারকারীরা। কাদা, জলের ভিতরে মিলেছে অনেকের দেহাবশেষ।
ত্রিশূলী, সালানখু, বেত্রবতী—তিব্বত থেকে নেমে আসা তিন নদীর মিলিত স্রোতেরই লোকমুখে নাম হয়েছে ভোটে কোশী (যার অর্থ তিব্বতের নদী)। কিন্তু নুয়াকোট এবং রাসুয়া জেলার সংযোগস্থলে অবস্থিত সঙ্গমস্থলের তীরবর্তী জনপদের নাম বেত্রবতী নদীর নামেই। ইতিহাস বলে, হাজার বছরেরও বেশি সময় ধরে নেপালের বণিক ‘নেওয়ার’ সম্প্রদায়ের আস্তানা বেত্রবতী। কথিত আছে, সপ্তম শতকে তিব্বতের রাজা সোং চেন গাম্পো নেপালি রাজকন্যা ভৃকুটিকে বিয়ে করেছিলেন। বিয়েতে রাজকন্যা উপহার হিসেবে চেয়ে নিয়েছিলেন নেপালি বণিকদের তিব্বতে ব্যবসার অধিকার। সেই আদি পর্ব থেকেই তিব্বতের সঙ্গে নেপালের বাণিজ্যিক সম্পর্কের মূল কেন্দ্র ছিল বেত্রবতী। সপ্তদশ-অষ্টাদশ শতকেও নেপাল-তিব্বত এবং নেপাল-চিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্বের সাক্ষী থেকেছে বেত্রবতী। ১৭৯২ সালে নেপাল-চিন রাজনৈতিক সন্ধি স্বাক্ষরিত হয়েছিল এখানেই। নদীর পাশে বিরাট পাথরের গায়ে সেই চুক্তিপত্র লেখা ছিল। এত দিন ইতিহাসের সাক্ষ্য বহন করত সেই পাথর। তিব্বতের পাহাড় থেকে নেমে আসা বরফগলা জল, কাদা, পাথরের স্রোত তা-ও মুছে দিয়েছে।
ত্রিশূলী থেকে ভোটে কোশী নদীর ধার ধরে রাস্তা চলে যেত বেত্রবতীতে। সেখান থেকে সেতু পেরিয়ে তিব্বতে ঢোকার শেষ ধাপ রাসুয়া। সে সব রাস্তা, সেতু নিশ্চিহ্ন। ত্রিশূলী থেকে ভোটে কোশীর পলির উপর দিয়ে হেঁটে ভইসে। সেখান থেকে আরও ঘণ্টাখানেক হাঁটলে বেত্রবতীর কাছাকাছি পৌঁছনো সম্ভব। তবে সেতু না থাকায় কালান্তক নদী পেরিয়ে বেত্রবতী পৌঁছনো যাচ্ছে না। তাই পাহাড়ের ঢাল বেয়ে, গাছের ডাল আঁকড়ে একশো মিটার উঠে দেখতে হচ্ছে প্রকৃতির রুদ্ররূপের প্রমাণ। অথচ বছরের পর বছর ধরে এখানেই গড়ে উঠেছিল বর্ধিষ্ণু জনপদ। স্কুল, হোটেল, লজ, হাসপাতাল, এমনকি প্রত্যন্ত এলাকা হলেও গ্রামীণ পুরসভা তৈরি হয়েছিল বেত্রবতীতে। তা শুধু যে নেওয়ার বণিকদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল, তা নয়। তীর্থযাত্রার পথও গড়ে তুলেছিল এই বাণিজ্যকেন্দ্র।
এক দিকে মান সরোবরে রওনা দেওয়া হিন্দু তীর্থযাত্রীদের সারি। অন্য দিকে, ত্রিবেণী সঙ্গমে নেপালের হিন্দুদের পারলৌকিক ক্রিয়ার রীতি। বেত্রবতীর উত্তর-পূর্ব কোণে গড়ে উঠেছিল আরও একটি ছোট তীর্থক্ষেত্র, উত্তর গয়া। ভারতের বিহারের গয়া যেমন পিণ্ডদান এবং পূর্বপুরুষের মোক্ষলাভের ক্ষেত্র, তারই নেপালি রূপ উত্তর গয়া। ধর্মীয় রীতি, পৌরাণিক কাহিনির হাত ধরে এ ভাবেই এক সুতোয় গেঁথে গিয়েছিল দুই দেশ। প্রতি বছর পৌষ পূর্ণিমায় নেপালি হিন্দুরা দল বেঁধে উত্তর গয়ায় পূর্বপুরুষের পিণ্ড দিতে যেতেন। এই ধর্মের হাত ধরেই জমজমাট ছিল বেত্রবতী বাজার। ধাবা, চটি, পুজোর উপকরণের দোকান। সে সবই ধুয়েমুছে সাফ হয়ে গিয়েছে। উদ্ধারকারী দলের সদস্যেরা বলছিলেন, তীর্থযাত্রার সময়ে বেত্রবতী বাজার জমজমাট ছিল। সাতসকালে গমগম করা বাজারে হড়পা বান এসে পড়লে কী হতে পারে, বুঝতে অসুবিধা হয় না। ত্রিশূলী, ভইসে গ্রামের লোকজন পাহাড়ের ঢাল বেয়ে উঠে প্রাণ বাঁচাতে পেরেছিলেন। বেত্রবতী বাজারে সে উপায় ছিল না। তবুও উত্তর গয়ার পশ্চিম পারে উঁচু বাড়িগুলির ছাদে কিছু লোক আশ্রয় নিতে পেরেছিলেন। পরে তাঁদের সেনা হেলিকপ্টার উদ্ধার করেছে। ঘন অন্ধকারে ওটুকুই আলোর রেখা মাত্র।
নেপালিদের পৌরাণিক বিশ্বাস, সমুদ্র মন্থনের পরে হলাহল পান করে সৃষ্টিকে রক্ষা করেছিলেন শিব। তবে বিষের জ্বালায় অস্থির হয়ে পড়েন তিনি। কৈলাস থেকে গোঁসাইকুণ্ডে নামার পথে বেত দিয়ে মাটিতে আঘাত করলে তা থেকেই বেত্রবতীর সৃষ্টি। বেত্রবতীর জলপানে বিষের জ্বালামুক্ত হয়েছিলেন শিব। তাই নেপালি হিন্দুদের ধর্মীয় বিশ্বাসে বেত্রবতীর জলপানে রোগ ব্যাধি দূর হয়, বেত্রবতীতে স্নান করলে পাপমুক্ত হয়ে মোক্ষলাভ হয়। ভোটে কোশীর যে বিপর্যয়, তার পিছনে বিজ্ঞানীরা দায়ী করছেন আধুনিক মানবজাতির সৃষ্ট হলাহল, উষ্ণায়নকে। সেই বিষই কার্যত পলি, পাথরের স্রোত হয়ে নেমেছে বেত্রবতীতে।
কাঠমান্ডু প্রশাসন মনে করছে, ভারত, চিন এবং আমেরিকার দূষণের কারণেই বিপর্যয়ে বিধ্বস্ত নেপাল। সেই কারণে এই তিন দেশের কাছে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চাইছে তারা। সেপ্টেম্বরে রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সভায় বিষয়টি উত্থাপন করতে পারেন নেপালের প্রধানমন্ত্রী বলেন্দ্র শাহ।