রাজধানীর রাস্তাঘাটের ক্রমদুর্গায়ন, পথচারীর নিত্য দুর্ভোগ, রাজমণ্ডপের মতো সেজে ওঠা ভারতমণ্ডপম্, আমিষ নিরামিষের কূটকচালি— এ সব পার হয়ে ব্রিকস সম্মেলনের মহাযজ্ঞ ঘটে গেল। নিশিপ্রদীপের বহু তেল খরচের পর অবশেষে এল ‘নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্র’, তিন সপ্তাহ আগেও যা ছিল গভীর অনিশ্চিত। আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের খামখেয়ালি শুল্কপ্রহার, চিনের সঙ্গে সম্পর্কের অনিশ্চয়তা, পাকিস্তান, বাংলাদেশ-সহ প্রতিবেশী বলয়ে সদা জাগ্রত সিঁদুরে মেঘ, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ পরিণতি ও বন্ধ থাকা হরমুজ় প্রণালীর জেরে কম্পমান অর্থনীতির আবহে, নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রের এই ‘সাফল্য’ নিঃসন্দেহে সেবা তীর্থকে দু’দণ্ডের শান্তি দিতে পেরেছে।
শুধুমাত্র শীর্ষ নেতৃত্বের সদিচ্ছাই নয়, বিদেশ মন্ত্রকের অফিসারদের পরিশ্রম, মেধা ও সঙ্কল্প ব্যতীত এটা সম্ভব ছিল না। সম্মেলন শেষের পর হায়দরাবাদ হাউসের সিঁড়িতে মন্ত্রী (যিনি দীর্ঘ দিনের আমলাও বটে) জয়শঙ্করকে ঘিরে অফিসারদের ঘরোয়া ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকার যে ছবিটি জাতীয় সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠায়, তা এই জন্যেই বার্তাবহ। ওই ছবি জয়শঙ্কর এক্স-হ্যান্ডলে পোস্ট করে অফিসারদের দায়বদ্ধতা ও পেশাদারিত্বের উল্লেখ করেছেন। ব্রিকস সাফল্যের জন্য তাঁদের কৃতিত্ব দিয়েছেন— সঙ্গত ভাবেই।
ব্রিকস-এর সাফল্য অর্থাৎ ঘোষণাপত্রের সাফল্য। ভারত ও চিন বৈঠক, যুযুধান দু’পক্ষ সংযুক্ত আরব আমিরশাহি এবং ইরানের মহাবৈঠকের পর নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রে প্রধানতম তাৎপর্যবিন্দু নিঃসন্দেহে প্যালেস্টাইনের পাশে দাঁড়ানো। ইজ়রায়েল প্যালেস্টাইন যুদ্ধের নেহাতই দায়সারা উল্লেখ নয়, গাজ়া পরিস্থিতিকে রীতিমতো চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেওয়া হয়েছে। ঘোষণাপত্রে প্যালেস্টাইনবাসীদের জোর করে উৎখাতের বিরোধিতা করা হয়েছে, মানবিক সাহায্য পৌঁছনোর কথা বলা হয়েছে, পুনরায় জোর দেওয়া হয়েছে দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের উপর। ১৯৬৭ সালের সীমানার ভিত্তিতে পূর্ব জেরুসালেমকে রাজধানী করে একটি সার্বভৌম প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পক্ষেও সওয়াল করা হয়েছে। প্যালেস্টাইনের পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রপদও সমর্থন করেছে ব্রিকস।
তবে প্রশ্ন ব্রিকস কেন প্যালেস্টাইনের পাশে দাঁড়াল, কেবলমাত্র সেইটিই তো নয়। মূল কথা হল, পশ্চিম এশিয়ার যুদ্ধ নিয়ে নিজেদের মধ্যে তীব্র মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ভারত যে ঘোষণাপত্রটি ঐকমত্যের ভিত্তিতে তৈরি করতে পারল, সেখানে প্যালেস্টাইন কেন এত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠল? কারণ হয়তো এক নয়, একাধিক, ক্রমশ প্রকাশ্য। তবে চটজলদি এটুকু বলে দেওয়া চলে, প্যালেস্টাইন যে ক্রমশ গ্লোবাল সাউথের পাশে এসে পা মুড়ে বসছে, পশ্চিম-নির্ভর নয় এমন আন্তর্জাতিক ব্যবস্থার প্রতীক হয়ে উঠছে বিশ্বমাঝারে, তাতে কোনও সন্দেহ থাকছে না আর।
এ কথাও মনে রাখতে হবে রিক, ব্রিক, ব্রিকস হয়ে আজকের এই ১১টি দেশের সংগঠন শুধু অর্থনৈতিক সহযোগিতার মঞ্চ নয় আর। ইরান, সংযুক্ত আরব আমিরশাহি, মিশর, ইথিয়োপিয়া ও ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশকে অন্তর্ভুক্ত করে এই জোট এখন উন্নয়নশীল ও উদীয়মান দেশগুলির এমন একটি মঞ্চ হয়ে উঠছে, যা আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক ভাষ্যে নিজেদের ডালপালা মেলতে তৎপর। আর এই প্রেক্ষাপটে প্যালেস্টাইন বিশেষ ভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। কারণ, গ্লোবাল সাউথের অধিকাংশ দেশই ঐতিহাসিক ভাবে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাকে সমর্থন করে এসেছে, দখলদারি ও পেশিবলে বলীয়ান হয়ে উৎখাতের বিরোধিতা করে এসেছে চিরকাল। দিল্লির ঘোষণাপত্রে যেটা করা সম্ভব হয়েছে তা হল, প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গকে বৃহত্তর একটি বিষয়ের সঙ্গে সফল ভাবে জুড়ে দেওয়া। সেই বিষয়টি, আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব, সাধারণ মানুষের সুরক্ষা এবং বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানের বিশ্বাসযোগ্যতা। একতরফা অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক চাপের বিরোধিতা এবং রাষ্ট্রপুঞ্জের সনদের উপর জোর দেওয়ার ভাষাও সেই বৃহত্তর অবস্থানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
ব্রিকস পরবর্তী পাঠ এটাই যে, গাজ়ার চলমান যুদ্ধের ভয়ঙ্করতা, প্যালেস্টাইন সমস্যাকে দীর্ঘদিনের একটি কূটনৈতিক প্রশ্ন থেকে বিশ্বের অন্যতম জরুরি মানবিক ও রাজনৈতিক সঙ্কটে পরিণত করেছে। পশ্চিম এশিয়ার স্থিতিশীলতা, জ্বালানি নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক নৌপথ এবং বিশ্বশান্তি নিয়ে আলোচনার প্রসঙ্গে ব্রিকসের পক্ষে গাজ়াকে এড়িয়ে যাওয়া কার্যত অসম্ভব ছিল। তাই ঘোষণাপত্র শুধু সাধারণ ভাবে শান্তির আহ্বান জানিয়ে থেমে থাকেনি। তার পরেও পা বাড়িয়েছে।
এ ক্ষেত্রে লক্ষণীয় ব্রিকস সম্মেলনে উপস্থিত দেশগুলির এ বছরের বিশেষ রাজনৈতিক অবস্থান। নয়াদিল্লিতে একই টেবিলে বসেছে ইরান এবং সংযুক্ত আরব আমিরশাহি। কিন্তু পশ্চিম এশিয়ার সংঘাত নিয়ে দু’দেশের স্বার্থ ভিন্নমুখী। ইরান আঞ্চলিক সংঘাতের সরাসরি অংশীদার; অন্য দিকে আমিরশাহির সঙ্গে আমেরিকার ঘনিষ্ঠ নিরাপত্তা ও কৌশলগত সম্পর্ক। স্বভাবতই ঘোষণাপত্রে ঐকমত্য তৈরির ক্ষেত্রেও ইরান-আমিরশাহির মতপার্থক্য একটি সঙ্কট তৈরি করেছিল। ফলে ভারতকে এমন ভাষা খুঁজে নিতে হয়েছে, যা পরস্পরবিরোধী অবস্থানগুলিকে একই ছাতার তলায় এনেও ব্রিকসকে আমেরিকা-বিরোধী বা ইজ়রায়েল-বিরোধী জোটের সরাসরি সিলমোহর না মারে। এখানেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গ। মানবিক সাহায্য এবং দ্বিরাষ্ট্র সমাধানের পক্ষে অবস্থান নেওয়া ব্রিকসের সদস্যদের কাছে তুলনামূলক ভাবে সহজ ঐকমত্যের ক্ষেত্র তৈরি করেছে।
মনে রাখতে হবে, আমেরিকার সঙ্গে যৌথভাবে ইজ়রায়েল, প্যালেস্টাইনের উপর হামলা করার ঠিক আগে, গত ফেব্রুয়ারিতে সে দেশের মাটিতে দাঁড়িয়ে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে ইজ়রায়েলের প্রধানমন্ত্রীর ‘ভাই’ বলে সম্বোধন, ভারতীয় পোশাক পরিহিত হয়ে নৈশভোজে আপ্যায়ন করেছিলেন বেজায় খুশি বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু! নিজে দেশে ভোটের মুখে দাঁড়িয়ে তিনি। দুর্নীতি, নিরাপত্তা এবং গাজ়ায় গণহত্যার খলনায়ক হিসাবে দেশের ভিতরে ও পশ্চিমের বড় শক্তিগুলির কাছে ক্রমশ অপ্রিয় হয়ে ওঠা নেতানিয়াহুর কাছে মোদীর সেই সফর ছিল মধুময়। অন্য দিকে ইজ়রায়েলের সংসদে মোদী তাঁর বক্তৃতায় নেতানিয়াহুর হাত শক্ত করেই ফিরেছিলেন। প্যালেস্টাইনের সার্বভৌমত্ব নিয়ে সরাসরি মন্তব্য করেননি মোদী, যা নেতানিয়াহুর জন্য স্বস্তির। প্রধানমন্ত্রী ২০২৩ সালের অক্টোবরে ইজ়রায়েলের উপর হামলার জন্য ভারতের হয়ে দুঃখপ্রকাশ করেছেন ঠিকই, কিন্তু তার পর থেকে ইজ়রায়েলের প্রত্যাঘাতে গাজ়ার ৭২ হাজার মানুষের প্রাণহানি নিয়ে সে ভাবে কোনও শব্দ খরচ করেননি।
স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, তা হলে ব্রিকস ঘোষণাপত্র কি ভারতের ইজ়রায়েল প্যালেস্টাইন নীতির থেকে কিছুটা সরে আসার লক্ষণ? উত্তর, একইসঙ্গে হ্যাঁ এবং না। এটি ইজ়রায়েলের থেকে ভারতের আদৌ কৌশলগত সরণ নয়, বরং কূটনৈতিক অবস্থানের সূক্ষ্ম পুনর্বিন্যাস। নয়াদিল্লি ঘোষণাপত্রকে ভারতের ইজ়রায়েল নীতিতে আকস্মিক পরিবর্তন না ভেবে, ভারতের গ্লোবাল সাউথ কূটনীতিতে প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গকে আরও শক্তিশালী করার আয়ুধ বলা বেশি প্রাসঙ্গিক। এটি ভারতের কৌশলগত স্বায়ত্তশাসনেরই অন্য এক প্রকাশ— এক দিকে ইজ়রায়েল ও আমেরিকার সঙ্গে কৌশলগত সম্পর্ক আরও গভীর করা, অন্য দিকে প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ঐতিহাসিক প্রতিশ্রুতি বজায় রেখে গ্লোবাল সাউথের পক্ষে নিজের কূটনৈতিক ভূমিকা জোরদার করা।
এটা সত্য যে, প্যালেস্টাইন-ইজ়রায়েল প্রসঙ্গে ঘোষণায় ইজ়রায়েলের নাম যে-ভাবে সরাসরি এসেছে, তা ভারতের সতর্ক বয়ানের তুলনায় অনেকটাই কড়া। আবার একই সঙ্গে ঘোষণাপত্রকে সামগ্রিক ভাবে ইজ়রায়েল-বিরোধী করে তোলাও হয়নি। প্যালেস্টাইন প্রসঙ্গে ইজ়রায়েলের কথা উঠলেও লেবাননের ক্ষেত্রে তা নেই। দিল্লির ব্রিকস ঐকমত্যের মূল বৈশিষ্ট্যই ছিল এই ভারসাম্য।
কিন্তু আসল নজর রাখার বিষয় এর পরের ভারতের প্যালেস্টাইন নীতি কোন পথে এগোয়। দেখতে হবে মোদীর পরবর্তী নেতানিয়াহু বৈঠকে গাজ়া ও প্যালেস্টাইন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রশ্নে ভারতের বক্তব্য কী হয়। রাষ্ট্রপুঞ্জের সাধারণ সম্মেলনে ভারতের ভোটাভুটি, গাজ়ায় মানবিক সাহায্য পৌঁছনোর ক্ষেত্রে নয়াদিল্লি কী ধরনের ভাষা ব্যবহার করে। শেষে ইজ়রায়েলের সঙ্গে ভারতের প্রতিরক্ষা ও কৌশলগত সহযোগিতা যদি আগের মাত্রাতেই চলতে থাকে (যার সম্ভাবনা সমূহ), তা হলে স্পষ্ট হবে যে নয়াদিল্লি ঘোষণার ফলে ভারত-ইজ়রায়েল সম্পর্কে কোনও মৌলিক প্রভেদ ঘটেনি।