E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সুখাদ্যের স্মৃতিময় মানচিত্র

এখন মানুষ শহর চেনে অ্যাপ দিয়ে। ভাল খাবারের দোকান কোথায়, খোঁজ করার দরকার হয় না। রাত দুটো হোক, ধর্মঘটে শহর অচল থাক, অ্যাপে ক্লিক করলে পছন্দের খাবার নিমেষে দরজায় হাজির। তার মায়াবী মোড়কে মুগ্ধ গ্রাম, শহর।

সন্দীপন নন্দী

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৩২

করলা নদীর পাশে সমাজপাড়ায় এক সময় রোজ এক কুইন্টাল ময়দার ডালপুরি ভাজা হত। সঙ্গে হিং-ফোড়নের স্বর্গীয় তরকারি। ফুটপাতে লাইন দিয়ে কিনতেন সবাই। সেই স্বাদ-সুগন্ধ বহু দিন বিলীন, কিন্তু জলপাইগুড়ির এই রাস্তার নাম আজও ‘ডালপুরির গলি’। বালুরঘাটে রিকশায় উঠে “চলন্তিকা চলুন,” বললে চালক পৌঁছে দেন বাস স্ট্যান্ডে। চপ-কাটলেটের দোকানটি দীর্ঘ দিন বন্ধ ছিল, সম্প্রতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করছে। শহর কিন্তু তার নাম মুছে যেতে দেয়নি, সেটি বরাবরই এক ব্যস্ত মোড়ের পরিচিতি। মিষ্টি, জলখাবারের জনপ্রিয় দোকান এ ভাবেই শহরের মানচিত্রে নাম তুলেছে। দোকানের দুয়ার চিরতরে বন্ধ হলেও সমবেত স্মৃতিতে বেঁচে, অতীতের স্বাদ-আহ্লাদের স্মারক হয়ে। ‘ব্র্যান্ডিং’ কাকে বলে এ-সব দোকান-মালিকরা জানতেন না, বিজ্ঞাপন দেওয়ার সাধ্যও ছিল না। ক্রেতারাই দোকানগুলোকে ‘ব্র্যান্ড’ করে তুলেছিলেন মুখে মুখে। এর নিদর্শন ছড়িয়ে রাজ্য জুড়ে। অধরের চমচম, মানিকের কচুরি, অনন্ত কেবিনের কবিরাজি কাটলেট, ভাগ্নের হোটেলের চিংড়ির চপ— শহরবাসীর মাথাতেই থাকত ‘ফুড গাইড’।

এখন মানুষ শহর চেনে অ্যাপ দিয়ে। ভাল খাবারের দোকান কোথায়, খোঁজ করার দরকার হয় না। রাত দুটো হোক, ধর্মঘটে শহর অচল থাক, অ্যাপে ক্লিক করলে পছন্দের খাবার নিমেষে দরজায় হাজির। তার মায়াবী মোড়কে মুগ্ধ গ্রাম, শহর। মোগলাই, চাইনিজ়, ইটালিয়ান খাবার জোগায় প্রধানত বড় দোকানগুলি। পাড়ার দোকানগুলো ‘ডেলিভারি অ্যাপ’-এ ঠাঁই পায় না, তাদের ‘রেটিং’ও হয় না। জেলা-মফস্‌সলের অলিগলির দোকানগুলোও হয়ে উঠছে ‘ফ্র্যাঞ্চাইজ়ি’, বড় ব্র্যান্ডের স্থানীয় বিক্রয়কেন্দ্র। পিছু হটছে ‘পঞ্চানন সুইটস’, ‘আজ়াদ হিন্দ মিষ্টান্ন ভান্ডার’-এর মতো নামগুলো।

আর সেই সঙ্গে স্থানীয় ইতিহাস। কমল মোহন্তের দাদুর বাবা ছিলেন মাস্টারমশাই। সে থেকেই পরিবারের মিষ্টির দোকানের নাম ‘মাস্টারস্টল’। এখনও বালুরঘাটের বুড়িকালী রোডে তিন পুরুষের দোকান দাঁড়িয়ে। বালুরঘাট পাবলিক বাস স্ট‍্যান্ড কোথায়, জিজ্ঞেস করলে আজও উত্তর আসে, “চা-কেন্দ্রের পাশে।” সেই চা-কেন্দ্রের অবস্থা অবশ্য এখন নিবু-নিবু। সে ‘আপ‍্যায়ন’-ও নেই, তার শীতল দইও নেই। প্রবাসী বাঙালি ছুটিতে বাড়ি এসে বৃথাই খোঁজে। আবার কিছু খুঁজেও পায়। ওই তো ‘এলএমবি’! কে বলবে, এ হল মিষ্টির দোকানের নামের আদ্যক্ষর— মার্চেন্ট রোডের অদূরে লক্ষ্মীনারায়ণ মিষ্টান্ন ভান্ডার। পাশের রাস্তাটিও ‘এলএমবি-র গলি’ নামেই পরিচিত। এ সব নাম যখন তৈরি হয়েছে, তখন ‘ক্যাফে কালচার’ ছিল না। দু’-আড়াইশো টাকায় এক কাপ কফি কেনার কথা ভাবলেও আঁতকে উঠতেন মানুষ। তখন অপচয় ছিল অপরাধ। দোকানগুলিও ক্রেতার সন্তুষ্টির উপরেই নির্ভর করত সুনাম প্রচারের জন্য। “ক্রেতাই ভগবান, দোকান মন্দির,” লেখা থাকত দোকানে দোকানে।

আর এখন? ঝুলে থাকে ‘আমাদের শাখা নেই’ বোর্ড। একে তো স্বাস্থ্য-সচেতনতার কোপ পড়েছে সাবেক মিষ্টি, শিঙাড়া-কচুরির উপরে, তার উপর বড় ব্র্যান্ডের মিষ্টি, কেক-প্যাটিসের দোকানের সঙ্গে লড়তে হচ্ছে পুরনো দোকানগুলোকে। ক্রেতা টানতে নানা ‘অফার’ দেওয়ার খেলায় ঢুকতে হচ্ছে স্বাধীন মালিকদের। নির্দিষ্ট টাকায় যত খুশি মিষ্টি খাওয়ার ‘সুবর্ণসুযোগ’ ঘোষণা করছে মিষ্টির দোকান, এমনও দেখা যাচ্ছে। ক্রেতা-বিক্রেতার ব্যক্তিগত পরিচিতির বন্ধন শিথিল হচ্ছে।

হারিয়ে যাচ্ছে স্বাদের বৈচিত্রও। শিঙাড়া, চপ, ডিমের ডেভিল— এক-এক দোকানের কারিগরের হাতে হয়ে উঠত এক-এক রকম স্বাদের উৎস। কোথাও শিঙাড়া কামড়ালে কুট করে মুখে পড়ত বাদাম, কোথাও মিলত কড়াইশুঁটির মিষ্টি আভাস। মিষ্টির তো কথাই নেই, কেবল রসগোল্লাই কত রূপে অবতীর্ণ এ বাংলায়! উত্তর থেকে দক্ষিণ, দোকানে দোকানে ছড়িয়ে ছিল আঞ্চলিক খাদ‍্যগরিমা। এখন পাড়ায় পাড়ায় একই সাইনবোর্ড— দু’-তিনটি মিষ্টান্ন সংস্থাই সহস্রপায়ে সর্বত্র দাঁড়িয়ে, একই পসরা সাজিয়ে। রেস্তরাঁর তো কথাই নেই— জাতীয় বা আন্তর্জাতিক কিছু চেনা নামের নিয়ন বোর্ড সর্বত্র।

আজ যাঁরা প্রৌঢ় কিংবা বৃদ্ধ, তাঁদের স্মৃতিতে জেগে রয়েছে পাড়ার দোকানের লজঝড়ে বেড়াবেষ্টিত ‘কেবিন’-এ আকাশকুসুম চয়নে কেটে-যাওয়া কত না সন্ধ্যা। সামান্য কিছু টাকা পকেটে নিয়েও এ সব কেবিনে চালানো যেত বান্ধবীর সঙ্গে নিভৃত সংলাপ। এসি রেস্তরাঁয় নরম গদির আরাম চেয়ার, ঝকঝকে শৌচাগারের প্রয়োজন হল এই সে দিন। তার আগে রেস্ত না থাকলেও রেস্তরাঁয় জায়গা পাওয়া যেত। প্রেম-বিরহ, আক্ষেপ-অভিমান, চাকরির পরীক্ষার টেনশন বা চাকরি চলে যাওয়ার হতাশা, সব কিছুর ভরসা ছিল রংচটা কেবিনগুলো। সেগুলোই ছিল মনের শুশ্রূষা। আজ ত্রিশ মিনিট কথা বলে কাটাতে চাইলে অর্ডার দিতে হয় তিন হাজার টাকার ডিশ। পকেট যার হালকা, সে রাস্তার দোকান থেকে পেট ভরানোর খাবার হয়তো পেতে পারে, মন-ভরানো আড্ডার জন্য বসার জায়গা সহজে খুঁজে পাবে না। অবশ্য অলস আড্ডার সময়ই বা আছে কার? প্রায়ই দেখা যায় কোনও রেস্তরাঁয় পাশের টেবিলের নবীন যুগলকে— প্রায় নীরবে কিছু খেয়ে, দু’-তিনটে সেলফি তুলে, হাতভরা বাজার নিয়ে ধাঁ হয়ে যেতে। ‘স্পেস’ আছে, ‘টাইম’ নেই।

জনারণ্যের মাঝেও নিজস্ব বৃত্ত গড়ে তোলার একটা সুযোগ করে দেয় খাবারের দোকানগুলি। পাড়ার চায়ের ঠেক উঠে গেলে শুরুর আগেই শেষ হয়ে যায় কত গান, গল্প, রসিকতা। পরিচিতির সেতু তৈরি না হলে তার জায়গা জুড়ে বসতে চায় কলহ আর বিদ্বেষ। পাড়ার খাবার দোকানগুলি হারিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে পাড়াও।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Online Delivery Food Delivery Apps Food History

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy