ছাত্রাবস্থা জ্ঞান অর্জনের নয়, মার্কস অর্জনের সময়। জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়ে আছে গোটা জীবন’, এ ধরনের বিজ্ঞাপন চোখে পড়েছে অনেকেরই। স্কুলের পরীক্ষায় পাশ করানোর অব্যর্থ সাজেশন, নোটস মুখস্থ করানো— এক সময় কোচিং ব্যবসার প্রধান হাতিয়ার ছিল এগুলিই। কিন্তু কোচিংয়ের আর একটি জগৎও রয়েছে। সেখানে লক্ষ্য প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষায় উচ্চমেধার ছাত্রছাত্রীদের সাফল্য। মুখস্থবিদ্যার বদলে যুক্তি, বিশ্লেষণ ও বুদ্ধিচর্চার উপর জোর দিয়ে সেখানেও বেছে নেওয়া হয় সেরার মধ্যে সেরাদের।
দুই ধরনের কোচিংয়ের উদ্দেশ্য আলাদা হলেও, তাদের উত্থানের পিছনে একই বাস্তবতা: স্কুলের শিক্ষা আর ভবিষ্যতের নিশ্চয়তা দিতে পারছে না। উচ্চশিক্ষা ও চাকরির দরজা খুলতে চাই নির্দিষ্ট কিছু পরীক্ষায় সাফল্য। সেখানে এগিয়ে থাকতে প্রয়োজন বাড়তি প্রস্তুতি। ফলে স্কুলের পাশাপাশি তৈরি হয়েছে শিক্ষার এক বিশাল বাজার— যাকে বলা হয় ‘শ্যাডো এডুকেশন’ বা ছায়াশিক্ষা।
২০২৫-এর সরকারি ‘কম্প্রিহেনসিভ মডিউলার সার্ভে’ অনুযায়ী, দেশের ২৭ শতাংশ স্কুলপড়ুয়া প্রাইভেট কোচিং নিয়েছে অথবা নিচ্ছিল। শহরে এই হার ৩০.৭ শতাংশ, গ্রামে ২৫.৫ শতাংশ। শহরে পড়ুয়া-পিছু বার্ষিক গড় খরচ ৩,৯৮৮ টাকা, গ্রামে ১,৭৯৩ টাকা। উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে শহরে সেই খরচ ৯,৯৫০ টাকা। পশ্চিমবঙ্গে কোচিং নেওয়ার হার ৭৪.৬ শতাংশ; ওড়িশায় ৫৭.১ শতাংশ এবং বিহারে ৫২.৫ শতাংশ। কোচিংয়ের বড় কেন্দ্র রাজস্থানে এই হার মাত্র ৭.২ শতাংশ। অর্থাৎ, কোচিংয়ের বাজারের বিস্তার শুধু বড় প্রতিষ্ঠানের উপস্থিতি দিয়ে বোঝা যায় না।
আইএমএআরসি-গ্রুপ’এর হিসাব অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ভারতের সংগঠিত কোচিং ইনস্টিটিউটের বাজারমূল্য আনুমানিক ৭.২ বিলিয়ন ডলার। ২০৩৪ সালে তা ১৭.৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছতে পারে বলে পূর্বাভাস। প্রাইভেট টিউশন ও অনলাইন শিক্ষা যোগ করলে, ছায়াশিক্ষার পরিধি আরও বিস্তৃত।
বিশ্বের কঠিনতম পরীক্ষা বলে বিবেচিত হয় চিনের গাওকাও এবং ভারতের ইউপিএসসি, জেইই অ্যাডভান্সড ও নিট পরীক্ষা। ভারতে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা ঘিরে তৈরি হয়েছে কোচিং-কেন্দ্রিক অঞ্চল: জেইই ও নিট-এর জন্য রাজস্থানের কোটা, ইউপিএসসি-র জন্য দিল্লির রাজেন্দ্রনগর ও লক্ষ্মীনগর তার উদাহরণ। আইএসআই, আইআইএসইআর-এর মতো প্রতিষ্ঠানের প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্যও রয়েছে বিশেষ প্রশিক্ষণ ব্যবস্থা।
এই বাজারের পিছনে রয়েছে অর্থনৈতিক উদারীকরণ, বেসরকারি এঞ্জিনিয়ারিং কলেজের বিস্তার এবং নির্দিষ্ট ডিগ্রির মাধ্যমে উন্নত চাকরি পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা। ‘ক্রেডেনশিয়ালিজ়ম’ বা ডিগ্রি-শংসাপত্রের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতা এবং ‘হাই-স্টেকস’ পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণ করছে উচ্চশিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সুযোগ। অভিজাত প্রতিষ্ঠানে পড়ে বহুজাতিক সংস্থায় চাকরি কিংবা বিদেশে কাজের সম্ভাবনাও কোচিংয়ের আকর্ষণ বাড়িয়েছে।
কিন্তু স্কুলশিক্ষার সহায়ক হিসাবে তৈরি হওয়া ব্যবস্থা এখন মূল শিক্ষাকেই গ্রাস করতে বসেছে। কিছু কোচিং সংস্থা নিজেদের স্কুল খুলছে; কিছু স্কুলের সঙ্গে তাদের এমন সমঝোতা হচ্ছে, যাতে পড়ুয়ারা মূলত কোচিংয়ে পড়েই বোর্ডের পরীক্ষায় বসতে পারে। স্কুলের দুর্বল পরিকাঠামো ও শিক্ষার মান নিয়ে অসন্তোষও এই নির্ভরতা বাড়ায়। প্রাথমিক শিক্ষায় পর্যাপ্ত সরকারি বিনিয়োগের অভাব শেখার ব্যবধান বাড়ালে আর্থিক ভাবে সচ্ছল পরিবারের সন্তানরা বাড়তি প্রস্তুতির সুযোগ পায়, অন্যরা পিছিয়ে পড়ে। স্কুলে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতি চালু করলেও তাই সমান সুযোগ ও পরিকাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি।
প্রযুক্তির উন্নয়ন এই বাজারে নতুন সম্ভাবনার পাশাপাশি তৈরি করেছে নতুন চ্যালেঞ্জও। সস্তা ইন্টারনেট, ওয়াইফাই, ইউটিউব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সাহায্যে এখন দূরে না গিয়েও উন্নত মানের পড়াশোনার সুযোগ মিলছে। কোটা বা অন্য বড় কোচিং-কেন্দ্রে পড়ার খরচের সঙ্গে বাসস্থান ও আনুষঙ্গিক ব্যয়ও যুক্ত হয়; অনলাইন শিক্ষা সেই ব্যয় অনেকটাই কমাতে পারে। কোভিডের সময় অনলাইন ক্লাসের প্রসার এই পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত করেছে। একই সঙ্গে, ডিজিটাল মাধ্যমের বিস্তারে ছোট ও নতুন কোচিং প্রতিষ্ঠানের উত্থান বড় সংস্থাগুলির একচেটিয়া আধিপত্য ও আয়ের উপর চাপ তৈরি করছে।
অন্য দিকে, আমেরিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশে অভিবাসন-বিরোধী অতিদক্ষিণপন্থী রাজনীতির উত্থান, কোভিড-পরবর্তী সময়ে কর্পোরেট ক্ষেত্রে বেতন-বৃদ্ধির স্থবিরতা ও বৃহৎ প্রযুক্তি সংস্থায় বিস্তর ছাঁটাই— সব মিলিয়ে অভিভাবকদের একাংশ আগের মতো কোচিংয়ে বিপুল অর্থ খরচ করতে আর উৎসাহিত হচ্ছেন না।
উদাহরণস্বরূপ, ২০১১ সালে কলকাতার গিরিশ পার্কে ভাড়াবাড়ির একটি ঘরে ম্যাথ অলিম্পিয়াড পড়ানো শুরু করেন জনৈক ব্যক্তি। পরে তিনি উচ্চস্তরের অঙ্কের ভিডিয়ো তৈরি শুরু করেন এবং বিনামূল্যের অনলাইন প্রচারের সুযোগ কাজে লাগান। আজ তাঁর প্রতিষ্ঠানে প্রায় হাজার ছাত্রছাত্রী, এবং ৫০ জন কর্মী কাজ করছেন। শুরুতে বাড়ির কাজ ও মক টেস্টে ব্যবহার করা হয় বিনামূল্যের ওপেন-সোর্স সফটওয়্যার। বড় পুঁজি ছাড়াও বিষয়ের উপর দখল ও প্রযুক্তির সাহায্যে প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার সম্ভাবনা এতে স্পষ্ট। বহু শিক্ষক অ্যাপের মাধ্যমে অঙ্ক শেখাচ্ছেন। পড়ার উপকরণ, অনুশীলন ও মক টেস্ট— সবই পাওয়া যাচ্ছে এক জায়গায়। প্রযুক্তির যুগে শুধু তত্ত্ব জানা নয়, সেই জ্ঞান ব্যবহার করে বাস্তব সমস্যার সমাধান করতে পারাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। তবে শিক্ষার মান নির্ভর করে শিক্ষকের দক্ষতা ও নিয়মিত জ্ঞানচর্চার উপর। বিপণনে বিপুল বিনিয়োগ হলেও শিক্ষক ও গবেষণার উন্নয়নে সমান গুরুত্ব না দেওয়া কোচিং শিল্পের একটি সমস্যা।
পশ্চিম এশিয়ায় দশ বছর শিক্ষকতা করা এ রাজ্যের এক যুবকও স্কুলের সঙ্গে চুক্তি করে ইন্টারনেট ও এআই-এর সাহায্যে প্রত্যন্ত এলাকার পড়ুয়াদের স্কুলের সময়েই নিট বা জেইই অ্যাডভান্সড-এর প্রস্তুতি দেওয়ার পরিকল্পনা করছেন। সফল হলে ঋণ করে দূরের শহরে পড়তে যাওয়ার প্রয়োজন কমতে পারে। তবে ছোট প্রতিষ্ঠানগুলির সামনে রয়েছে পুঁজি, প্রযুক্তি ও করের বাধা। বাণিজ্যিক কোচিং পরিষেবায় ১৮ শতাংশ জিএসটি প্রযোজ্য। এক প্রতিষ্ঠানকর্তার মতে, “আমি হিসাব করে দেখেছিলাম, যদি এই ১৮ টাকা আমার কাছে থাকত, তা হলে আমরা আরও ২০ জনকে নিযুক্ত করতে পারতাম। অথবা ১০ জনকে নিযুক্ত করে ৮ টাকা রিসার্চ অ্যান্ড ডেভলপমেন্টে লাগাতে পারতাম। এই জিএসটি-র জন্য এক দিকে বাজারে কর্মসংস্থান যেমন কম হচ্ছে, তেমনই আমাদের বিকাশও আটকে যাচ্ছে। ১৮ টাকা যদি কর দিতেই চলে যায়, তবে গ্রাফিক্যাল প্রসেসিং ইউনিট কী ভাবে তৈরি করব, কী ভাবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় বিনিয়োগ করব?”
এক দিকে দুর্বল প্রাথমিক শিক্ষা, অপর্যাপ্ত সরকারি স্কুলব্যবস্থা এবং দুনিয়ার কঠিনতম প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষা, অন্য দিকে ৯০% ভারতীয়ের আয় ২৫,০০০ টাকার কম হওয়া এবং বৃহৎ কর্পোরেট ক্ষেত্রে কর্মী-নিয়োগ কমে আসা; প্রযুক্তির উন্নতির ধাক্কায় বড় কোচিং ভেঙে যাওয়ার উল্টো দিকে ছোট কোচিংয়ের বেড়ে ওঠারও ব্যাপক প্রতিবন্ধকতা। কোচিং যেমন উচ্চপদে চাকরির জন্য শিক্ষার্থীদের তৈরি করছে, তেমনই নিজেও বিপুল পরিমাণ কর্মসংস্থান সৃষ্টি করছে। এই পরস্পরবিরোধী দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে এগিয়ে চলেছে এই সময়ের ছায়াশিক্ষা।
প্রশ্ন হল, ছায়াশিক্ষা কি শেষ পর্যন্ত মূলধারার শিক্ষাকেই প্রতিস্থাপন করবে? নাকি সরকার স্কুলশিক্ষায় বিনিয়োগ বাড়িয়ে, প্রাথমিক শিক্ষার ভিত মজবুত করে এবং প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে সমান সুযোগ তৈরি করে এই নির্ভরতা কমাবে? প্রযুক্তির সুফল যেন শুধু সামর্থ্যবানদের হাতে না পৌঁছয়, তা নিশ্চিত করাও জরুরি। ভারত ও চিনের মধ্যে জ্ঞান, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও ব্যবসায় প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকতে হলে কয়েকটি অভিজাত প্রতিষ্ঠানে মেধা তৈরিই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে জ্ঞানচর্চার সুযোগ ছড়িয়ে দেওয়া। ছায়াশিক্ষার ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য তৈরির উপর।