ভারতবর্ষ বৈচিত্র্যময় দেশ। রাজ্য থেকে জেলা, শহর থেকে প্রান্তিক গ্রামে ছড়িয়ে রয়েছে নানা ভাষা, বর্ণ ও সংস্কৃতির বহু মানুষ। তাঁদের নিজস্ব শিল্প, পার্বণ ও জীবনধারার সঙ্গেই ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে রয়েছে বিচিত্র সব লোকবিশ্বাস ও প্রাচীন উপকথা।
ঠিক তেমনই এক রাজ্য মেঘালয়। মেঘেদের দেশ বলতেই চোখে ভাসে সবুজ উপত্যকা, আর কাচের মতো স্বচ্ছ নদী। কিন্তু এই মনভোলানো প্রাকৃতিক রূপের আড়ালেই বহু যুগ ধরে লুকিয়ে রয়েছে এক হাড়হিম করা আখ্যান। স্থানীয় খাসি জনজাতির মুখে মুখে ফেরা সেই লোকগাথার দুই মূল চরিত্র— ‘কা ক্মা খারাই’ এবং তার সন্তান ‘উ থলেন’।
১৯২০ সালে প্রকাশিত কে ইউ রাফির লেখা ‘ফোক-টেলস অব দ্য খাসিস’ বইটিতে প্রথম বিশদে উল্লেখ মেলে কা ক্মা খারাইয়ের। খাসি বিশ্বাস অনুযায়ী, এই রহস্যময়ীর মধ্যে ছিল রূপ পরিবর্তনের আশ্চর্য ক্ষমতা। মানুষের বেশ ধারণ করে লোকালয়ে অনায়াসে মিশে যেত সে, অথচ কেউই তার আসল পরিচয় টের পেত না।
তবে এই কাহিনির আসল ভয়ংকর পর্ব শুরু হয় কা ক্মা খারাইয়ের সন্তান উ থলেনকে কেন্দ্র করে। খাসি উপকথা বলে, উ থলেন ছিল বিশালাকার সাপের রূপধারী এক দানব, যার প্রধান খিদে ছিল মানুষের তাজা রক্ত আর নরমাংস! ইচ্ছামতো নিজের শরীরের আকার বদলাতে পারত এই প্রাণী, কখনও হয়ে উঠত সুতোর মতো সরু, আবার পরক্ষণেই ধারণ করত পাহাড়সমান এক প্রকাণ্ড রূপ।
ছেলে উ থলেনের খিদের জ্বালা মেটাতে মা কা ক্মা খারাই মানুষের রূপ ধরে নানা ছলনায় মানুষ ভুলিয়ে আনত নিজের আস্তানায়। প্রচলিত বিশ্বাস, সে অনেককে এমন এক জাদুকরী আংটি দিত, যার ছোঁয়ায় সমস্ত মনস্কামনা পূরণ হয়ে যেত। কিন্তু সেই ধনসম্পদ বা বর পাওয়ার নেপথ্যে থাকত এক চরম শর্ত, উ থলেনের ক্ষুধার অন্ন জোগাতে নিয়ে আসতে হবে কোনও রক্তমাংসের মানুষকে!
চেরাপুঞ্জির বিখ্যাত ডায়েনথলেন জলপ্রপাতের কাছে এক গভীর অন্ধকার গুহায় ছিল এই সর্পদানবের আস্তানা। জনশ্রুতি, পাহাড়ি রাস্তায় নজর রেখে পথচলতি মানুষদের টেনে নিয়ে গিয়ে নিঃশব্দে আস্ত গিলে খেত উ থলেন।
লোককথা অনুযায়ী, বহু বছর বাদে কৌশলে বধ করা হয় এই দানবকে। প্রচলিত বিশ্বাস রক্তপিপাসু সেই সাপের মৃত্যু হলেও, মেঘালয়ের বুকে চিরতরে থেকে যায় তার ভয়াল আত্মা। কথিত আছে, রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে পরবর্তী কালে খাসিদের একাংশ গোপনে উ থলেনের পুজো শুরু করে। লোকমুখে এই উপাসকদের বলা হতো ‘নংশুহন’ যার বাংলা তর্জমা করলে দাঁড়ায় নরবলিদাতা।
তবে এই ধনলাভের পথ ছিল অত্যন্ত মারাত্মক। সময়ের ব্যবধানে উ থলেনের অতৃপ্ত আত্মাকে নরবলি নিবেদন করতে না পারলে নেমে আসত তার চরম রোষ। পুজো দেওয়া পরিবারের সদস্যদের একের পর এক রহস্যময় মৃত্যু ঘটে সম্পূর্ণ বংশ ধ্বংস হয়ে যেত।
আজও মেঘালয়ের পাহাড়ে কান পাতলে শোনা যায় সেই অন্ধকার অতীতের কথা। এখনও এমন বিশ্বাস রয়েছে যে, সেখানকার কিছু প্রাচীন পরিবারের ওপর আজও তাড়া করে বেড়াচ্ছে উ থলেনের সেই অভিশাপ। তাই লোকসমাজে আজও চিহ্নিত করে এড়িয়ে চলা হয় সেই পরিবারগুলিকে।
বিজ্ঞানের যুগে দাঁড়িয়ে এই রক্তহিম কাহিনির কোনও ঐতিহাসিক বা বাস্তবিক প্রমাণ না মিললেও, খাসি জনজাতির শতাব্দীপ্রাচীন বিশ্বাস ও সংস্কারে আজও অবিচ্ছেদ্য হয়ে রয়ে গেছে দানব উ থলেনের নাম।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।