তিনি ছিলেন জাত ফিরিঙ্গি। একঘরে করেছিলেন সমাজের কেউকেটারা। ম্লেচ্ছর হাতে দুর্গাপুজো— এ অপরাধে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তাঁর বাড়ি। অথচ সমস্ত সামাজিক অবজ্ঞা আর সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষের ঊর্ধ্বে উঠে তিনি আজীবন কথা বলেছেন মানুষের মিলনের পক্ষে। উনিশ শতকের প্রখ্যাত কবিয়াল রাম বসুর ধর্মীয় বিদ্রূপের জবাবে তাঁর কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল মানবতাবাদী উপলব্ধি, “আমার খোদা যে হিন্দুর হরি সে, ঐ দ্যাখো শ্যাম দাঁড়িয়ে আছে; আমার মানবজনম সফল হবে যদি রাঙা চরণ পাই।" তিনি পর্তুগিজ বংশোদ্ভূত অ্যান্টনি হেন্সম্যান। উনিশ শতকের বাংলার অন্যতম আধুনিক মানুষ, নবজাগরণের যাত্রায় এক পরিচিত নাম।
ছবি: সংগৃহীত
এই বাংলায় শ্যামাসঙ্গীত লিখেছেন কাজী নজরুল ইসলাম। এই বাংলাতেই অতুলপ্রসাদ সেন তাঁর গানে সুফি মরমীবাদকে ফুটিয়ে তুলেছেন। সৃষ্টিকর্তাকে সম্বোধন করেছেন 'সাঁই' হিসেবে। ধর্মের ঊর্ধ্বে উঠে বারবার এ ভাবেই মানবতার জয়গান গেয়েছে বাঙালি। সে এপার বাংলাই হোক বা ওপার। আজও তাই তার এক উঠোনে বাতাসে একযোগে মেশে আতর আর অগুরুর গন্ধ। একই উঠোনে মাজারে ওঠে মালা আর দেবী মূর্তিতে নিবেদন করা হয় পুষ্পার্ঘ্য। আপসের সহাবস্থান নয়, এ যে বাঙালির সহজাত আত্মপরিচয়।
সে ভাবেই সম্প্রীতির আর এক নাম হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের লালমনিরহাট। যে শহরে একই উঠোনে সহাবস্থান মন্দির ও মসজিদের। আনুমানিক ১৮৩৬ সালে অবিভক্ত বাংলার এই অঞ্চলে প্রতিষ্ঠা হয় কেন্দ্রীয় কালীবাড়ি শ্রীশ্রী দুর্গা ও কালী মন্দির। পরবর্তী সময়ে এলাকায় আসা মুসলিম ব্যবসায়ীরা নমাজের পড়ার উদ্দেশ্যে এক প্রার্থনাস্থল তৈরি করেন মন্দিরের পাশেই। কালের নিয়মে আজ সেই প্রার্থনাস্থলই পুরান বাজার জামে মসজিদ। শতাব্দীপ্রাচীন কালী মন্দির ও মসজিদের মধ্যে দূরত্ব মাত্র কয়েক ফুটের।
শুধু সহাবস্থানই নয়, দুর্গাপুজোর সময়ে মন্দিরের আয়োজনেও স্থানীয় মুসলিমদের সহযোগিতা থাকে। মসজিদে নমাজের সময়ে বন্ধ রাখা হয় মন্দিরের বাদ্যযন্ত্র-মাইক। আবার পুজোর আগেই দুই কর্তৃপক্ষের আলোচনা সাপেক্ষে তৈরি হয় মসজিদের কর্মসূচি। যাতে কারও ধর্মীয় আচারে বিঘ্ন না ঘটে। দূরদূরান্ত থেকে বহু মানুষ আসেন লালমনিরহাটের কালীমন্দিরে। মানুষ আসেন এই বিরল সম্প্রীতির ছবি দেখতে।
আরও পড়ুন:
এপার বাংলা-ওপার বাংলা কালের নিয়মে আজ দ্বিখণ্ডিত। তবু দুই দেশের ভাষা থেকে শুরু করে সংস্কৃতি, লোকাচার, উৎসব সবই এক। দুই বাংলায় আজও বসন্তে কোকিল ডাকে, মানুষের দুঃখে আজও মানুষ কাঁদে। ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ মাতে উৎসবে। আসলে এই বাংলা রবীন্দ্রনাথের বাংলা, সম্প্রীতির দলিল হিসেবে যিনি লিখে গিয়েছেন, “অহরহ তব আহ্বান প্রচারিত, শুনি তব উদার বাণী; হিন্দু বৌদ্ধ শিখ জৈন পারসিক মুসলমান খৃস্টানী; পূরব পশ্চিম আসে তব সিংহাসন-পাশে, প্রেমহার হয় গাঁথা।”
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।