তাঁদের আরাধ্য নিরাকার। কিন্তু তারাই রূপ দেন দেবী কালীর। কথায় বলে, ‘কর্মই ধর্ম’। পূর্ব মেদিনীপুরের পাশকুড়ায় রুবিনা, সুজাতারা কর্ম করেই ধর্মচারন করছেন প্রতিদিন। এ যেন বাংলায় আরও এক সম্প্রীতির ছবি। যাঁদের কাছে প্রতিমা গড়া শুধু জীবিকা নয়, বংশপরম্পরায় বয়ে চলা শিল্পসাধনা।
পাঁশকুড়ার খণ্ডখোলা গ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত কেশববাড় এলাকায় বাস রুবিনা, সুজাতাদের। তাঁদের এই পাড়ায় প্রায় ৫০ চিত্রকর পরিবারের বাস। এদের মধ্যে প্রায় ১০ পরিবার মূর্তি তৈরি করে। রুবিনা চিত্রকর, সুজাতা চিত্রকরা মুসলিম হলেও বংশ পরম্পরায় তারা তৈরি করছেন হিন্দু দেবদেবীর নানা মূর্তি। শুধু তাই নয়, এই পাড়ার বহু সদস্যরা ভিনরাজ্যেও যান প্রতিমার কাজে। আর এদিকে বাংলার উৎসবের মরশুমে দম ফেলবার সময় থাকে না রুবিনা, সুজাতাদের। যেখানে ধর্মের বেড়াজাল ছাপিয়ে শিল্পীসত্বার পরশেই প্রাণ পায় মৃন্ময়ী মূর্তি।
মূলত এই গ্রামের সকলেই পটশিল্পী। আগেকার দিনে প্রতিমার চালচিত্রের কাগজের উপর ছবি আঁকতেন তারা। সেখানেই কখনও ফুঁটিয়ে তুলতেন নানা পৌরাণিক কাহিনী। কখনও আবার আঁকতেন নিজেদের দুর্দশার কথা। সময় বদলেছে। বদলেছে কাজের চাহিদাও। এই গ্রামের অধিকাংশই এখন পোশাকে রঙিন নকশা তোলা, মাটির কাপে বাহারি ছবি আঁকার কাজ করেন। তবে, বর্তমানে সেই কাজের বাজারও খারাপ হতে থাকায় বেশ কিছু পরিবার বেছে নিয়েছে মূর্তি গড়ার কাজ।
তারা প্রতিমা বানিয়ে অন্ন সংস্থান করেন। আবার নিজেদের ধর্মপালনের জন্যে মেতে ওঠেন ঈদ, মহরম, সবেবরাতেও। আসলে, চাঁদ একটাই। আকার বদলে কখনও তা কোজাগরী লক্ষী পুজোর প্রতীকী, কখনও আবার পবিত্র ঈদের প্রতীক। যে আঙুলের তুলির টানে ফুটে ওঠে দেবীর চোখ, সে আঙুলের কাছে শিল্পই শেষ কথা। রুবিনা বা সুজাতারা বাংলার লোকশিল্পের উত্তরাধিকারী, যেখানে তাঁদের পরিচয়কে ধর্মের খোপে আটকে রাখা যায় না। বিভেদ ভুলে মিলেমিশে থাকার এই রীতিই তো বাংলার আজীবনের সম্পদ।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।