Health Partner
Comfort Partner
Knowledge Partner

কালীপুজোয় মঞ্চ কাঁপত শিখ যুবকের গানে, ভর করতেন স্বয়ং দেবী! তবু গানপাড়া অমৃককে দেগেছিল ‘জংলি গায়ক’ বলে

কালীভক্ত অমৃক সিং অরোরা শ্যামাসঙ্গীতে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু বাংলার বিখ্যাত শিল্পীরাই তাঁকে বলেছেন ‘জংলি’, ‘অশিক্ষিত’ আরও কত তিরস্কার। তথাকথিত অভিজাত সমাজে তিনি ছিলেন অবহেলিত। নীলকণ্ঠ মহাদেবের মতো সকল বিষ ধারণ করে শুধুই সুধা রস বাংলার শ্রোতা-দর্শকদের দিয়ে গেলেন তিনি।

শুভদীপ বন্দ্যোপাধ্যায়

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ১৮:২৮
প্রতীকী চিত্র

প্রতীকী চিত্র

অবিকল কালীঘাটের মতো বিশাল দেবীমূর্তি প্রতিষ্ঠিত ছিল তাঁর ঘরে। প্রতি সপ্তাহে শনি-মঙ্গলবার পুজো দিতে যেতেন কালীঘাট মন্দিরে। সঙ্গে সব সময়েই থাকত একটা অ্যাটাচি, যার ভিতরে রাখা মাতৃমূর্তির ছবি। প্রতিটি ফাংশনে অ্যাটাচি খুলে কালীর ছবিতে জবার মালা পরিয়ে, ধূপ জ্বালিয়ে তার পরে গান শুরু করতেন। বাঙালির শ্যামাসঙ্গীতে বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছিলেন জাতে শিখ, মনেপ্রাণে বাঙালি গায়ক অমৃক সিং অরোরা। শুধুমাত্র গায়ক নন, তিনি ছিলেন সত্যিকারের পারফর্মার। বিশেষত আট-নয়ের দশক জুড়ে কালী পুজো মানেই মাইকে কুমার শানু নয়,শুধু বাজত অমৃক সিং অরোরার গান। তাঁর জন্যই লেখা হত শ্যামাসঙ্গীত। ঘরে ঘরে তা বাজত। ঠিক যেমন অমৃকের কণ্ঠে কালজয়ী ‘আমার সর্ব অঙ্গে লিখে দিও কালী কালী নাম/ কালী ছাড়া মোর জীবনে কী আর আছে দাম’!

কালীভক্ত অমৃক সিং অরোরা শ্যামাসঙ্গীতে নিজেকে সমর্পণ করেছিলেন। কিন্তু বাংলার বিখ্যাত শিল্পীরাই তাঁকে বলেছেন ‘জংলি’, ‘অশিক্ষিত’ আরও কত তিরস্কার। তথাকথিত অভিজাত সমাজে তিনি ছিলেন অবহেলিত। নীলকণ্ঠ মহাদেবের মতো সকল বিষ ধারণ করে শুধুই সুধা রস বাংলার শ্রোতা-দর্শকদের দিয়ে গেলেন তিনি। তাঁর সময়ে তিনিই ছিলেন রাজা। কিন্তু আজ তিনি ব্রাত্য। শ্যামা পুজোর পূণ্যলগ্নে চিনে নেওয়া যাক মানুষ অমৃক সিং অরোরাকে।

শ্যামাসঙ্গীত মানেই রামপ্রসাদ, কমলাকান্ত, নজরুল, মুকুন্দরাম,পান্নালাল ভট্টাচার্য, ধনঞ্জয় ভট্টাচার্যের গান— কেউ গায়ক, কেউ বা রচয়িতা। যাঁরা শ্যামাসঙ্গীত চর্চা করে এসেছেন, সকলেই বাঙালি। কিন্তু শ্যামাসঙ্গীতে প্রথম অবাঙালি নাম হয়ে উঠলেন শিখ শিল্পী অমৃক সিং অরোরা। ধনঞ্জয় ভট্টাচার্য বা পান্নালাল ভট্টাচার্য রামপ্রসাদ, কমলাকান্তের শ্যামাসঙ্গীতই বেশি গাইতেন। কিন্তু অমৃক এমন এক অবাঙালি শিল্পী, যিনি গাইবেন বলে নতুন শ্যামাসঙ্গীত তৈরি করতেন সুরকার ও গীতিকার তাপস রায়।

১৯৪৩ সালে অমৃকের জন্ম কলকাতার এক শিখ পরিবারে। আদি পরিবার ছিল পঞ্জাবে। কলকাতায় তাঁদের ঝরনা কলমের কালির ব্যবসা ছিল। বাবার ইচ্ছে ছিল ছেলে ব্যবসাই করুক। কিন্তু ছেলে যে গান পাগল! বাবার কাছে মার খেতেও হত সে জন্য। বাংলা গানের উপরে অমৃকের ছোট থেকেই টান। পাশাপাশি কিশোর কুমার আর মহম্মদ রফির হিন্দি গান গেয়েও জলসা জমিয়ে দিতেন অমৃক। রাগ করে হারমোনিয়াম ছুড়ে ভেঙে দিয়েছিলেন বাবা। শেষমেশ বাড়িও ছাড়তে হল। ‘বার সিঙ্গার’ হিসেবে গানকে পেশা করা তার পরেই। এই সময়ে অমৃকের যাতায়াত ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের বাড়ি। হেমন্তর গানের নিখাদ ভক্ত তিনি। এই সময়ে অমৃক কিন্তু কালীভক্ত ছিলেন না। হেমন্ত তাঁর বহুদিন পড়ে থাকা একটা গান অমৃককে দিয়েছিলেন। ‘রূপসী দোহাই তোমায়’— সেই আধুনিক বাংলা গান গেয়েই প্রথম লাইমলাইটে চলে এলেন তিনি। হেমন্তর সুরে এই গান অমৃকের ‘সিগনেচার গান’ হয়ে রইল।

অমৃক তাঁর রংবেরংয়ের পোশাক, ঝলমলে পাগড়ি, চাপ দাড়ি আর সুমিষ্ট কণ্ঠ ও দুর্দান্ত পারফরম্যান্সের জোরে সুপারহিট ফাংশন আর্টিস্ট হয়ে উঠলেন। গানের প্রথাগত শিক্ষা তাঁর ছিল না। কিন্তু তাঁকে ছাড়া বাংলায় কোনও বিচিত্রানুষ্ঠান সম্পূর্ণ হত না। অথচ এই সব ফাংশনে গাইতে গিয়ে বর্ষীয়ান শিল্পীদের থেকে নিজের নামে কটুক্তি, টিটকিরি শুনতে হত। তিনি নাকি ‘জংলি’, ‘অশিক্ষিত’, এমন কত কী! সেই বর্ষীয়ান শিল্পীদের পায়ের কাছে গিয়ে বসে থাকতেন অমৃক। অথচ আট-নয়ের দশকে ওই প্রবীণ, বিশিষ্ট শিল্পীদের তুলনায় অমৃকের পারিশ্রমিক ও জনপ্রিয়তা দুই-ই তখন অনেক বেশি। অমৃক কোনও ফাংশনে এতটাই জমিয়ে দিতেন বাংলা, হিন্দি ও পঞ্জাবী ভাষার গান গেয়ে, যে তাঁর পরে মঞ্চে উঠতে আর কোনও শিল্পীই সাহস পেতেন না। সেই সময়ে ছবিতে প্লেব্যাক থেকে টুকটাক অভিনয়ও করেছেন অমৃক।

এর পরে শ্যামাসঙ্গীত গেয়ে কালীভক্ত হয়ে পড়লেন অমৃক। তাঁর কাছে শ্যামাসঙ্গীত গাওয়া ছিল পুজোর মতো। দক্ষিণেশ্বর, আদ্যাপীঠ, তারাপীঠের মন্দিরে তাঁর গানের জলসা হামেশাই থাকত। সে প্রসঙ্গে তাঁর দলে দীর্ঘ সময় তবলায় সঙ্গত করা তবলাশিল্পী দীপঙ্কর আচার্য বললেন, ‘‘স্টেজ শো থেকে রেকর্ডিং, সবেতেই আমি অমৃকের সঙ্গে বাজিয়েছি। আমার বাড়ি তখন চেতলায়। কালীঘাট মন্দিরে প্রতি শনি-মঙ্গলবার পুজো দিয়ে পেঁড়া প্রসাদ নিয়ে অমৃক আমার বাড়ি চলে আসত। আমাকে মাকে মা বলে ডাকত। ওঁকে দেখতে আমার বাড়ির গলিতে ভিড় জমে যেত। ভীষণ দয়ালু,দিলখোলা ছিল। মন খুলে খাওয়াত, কত কী উপহার দিত। ওঁর গানের দলের বাকি যন্ত্রশিল্পীরা সুরার নেশায় আসক্ত হলেও অমৃকের শুধু ছিল সুরের নেশা। প্রতিদিন নিজের পোশাক বদলাত। নিজেই নিজের পোশাক ডিজাইন করে দর্জিকে বানাতে দিত, বিদেশি সেন্ট ব্যবহার করত। এত শৌখিন শিল্পী কম ছিল তখন। ওঁর গাড়ি অবধি ছিল দুর্দান্ত সাজানো। আর ছিল ভীষণ আবেগপ্রবণ। আধুনিক গানের শিল্পী হয়েও শ্যামাসঙ্গীত শিল্পী হয়ে গিয়েছিল। গান গাওয়ার শুরুতেই অ্যাটাচি খুলে মা কালীর ছবিতে জবার মালা পরিয়ে ধূপ দিয়ে আরতি করত। তার পরে গান আরম্ভ করত। একের পর এক শ্যামাসঙ্গীত গাইতে গাইতে মঞ্চেই মায়ের ভর হত অমৃক সিং অরোরার। গা-হাত-পা শিউরে উঠত ওঁর, কেঁদে ফেলত, স্টেজেই অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছে। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর প্রতিটা কালীবাড়ি কিংবা ফাংশনে একশো বার দেখেছি ওঁর ভর হতে। অমৃক বলত মায়ের গান গাইলেই মা আমার উপর ভর করেন। অথচ ওঁকে শিল্পী বলে সম্মান দিতেন না সেই সময়ের বিখ্যাত শিল্পীরা কেউই। ওঁর মৃত্যুর পরেও কোনও স্মরণসভা করেনি মিউজিক ইন্ডাস্ট্রি। ওঁর বেশি পারিশ্রমিক, বিপুল জনপ্রিয়তা সবার চক্ষুশূল ছিল। তবে মা কালীর গান হলে কম টাকাতেও গেয়ে দিত।”

অমৃকের বাড়িতেও প্রতিষ্ঠিত ছিল কালীঘাটের মতো বিশাল কালীমূর্তি। দু’বেলা পুজো করতেন। লালবাজার, বাগুইআটি ও শেষে চিনার পার্ক— সব বাড়িতেই সঙ্গে ছিল মা কালী। সব রকমের ভক্তিগীতিতেই গ্রামবাংলার মানুষের নয়নের মণি ছিলেন তিনি। শহরেও তাঁকে দেখতে লোক জমে যেত। তিনি যে ছিলেন এক জন ফ্যাশন আইকনও।

পরবর্তীতে প্রস্টেট ক্যানসার হওয়ার পর থেকেই ফাংশন কমিয়ে দেন অমৃক সিং অরোরা। নিজের জমানো অর্থ দিয়েই চিকিৎসা করেছিলেন। ঘনিষ্ঠ মহল সূত্রে জানা গেল, ইন্ডাস্ট্রির শিল্পীরা তাঁর পাশে দাঁড়াননি। তাঁর মারণরোগের চিকিৎসায় কোনও ফান্ড আসেনি। এমনকি নামী শিল্পীরা তাঁর খোঁজ অবধি নেননি। মৃত্যুশয্যায় অমৃক বলতেন, ‘‘এই যন্ত্রণার থেকে মুক্তি দিয়ে মা যেন আমাকে কোলে তুলে নেন।” চোখের জল গড়িয়ে পড়ত। স্ত্রী, দুই ছেলে, দুই মেয়ে, পরিবার অবশ্য পাশে ছিল তাঁর। শেষযাত্রায় বেজেছিল তাঁরই গান—

‘যেদিন আমি জন্মেছিলাম মা মা বলে ডেকেছিলাম

আবার অন্তিমকালে কালী বলে যাব ছেড়ে এই ধরাধাম, কালী ছাড়া মোর জীবনে কী আর আছে দাম।’

এটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।

Shyamasangeet Songs kalipuja festival

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy