ভূত চতুর্দশী আর কয়েক দিন পরেই। ঠিক এই সময়টায় গা ছমছমে ভূতের গল্প শোনার রোমাঞ্চই আলাদা! ভূত কি সত্যি আছে? নাকি সবটাই কল্পনা? ভূতেদের অদ্ভুতুড়ে কাণ্ডকারখানার ঠিক কতখানি সত্যি? ভূত যে আছে, মনেপ্রাণে বিশ্বাস করেন অভিনেত্রী তনিমা সেন। পর্দায় তনিমা থাকা মানেই হাসি আর মজা। সেই তাঁকেই নাকি এক বার সত্যি সত্যি নাস্তানাবুদ করে ছেড়েছিল ভূত। আনন্দ উৎসবে সেই গা শিরশিরানি গল্প শোনালেন তনিমা নিজেই।
এ ঘটনা কারও মুখে শোনা নয়। একেবারে অভিনেত্রীর নিজের জীবনের ঘটনা। ভূতেদের সেই কীর্তিকলাপ তিনি নিজে টের পেয়েছেন, দস্তুরমতো নিজের কানে শুনেছেন। সেই ভয়ঙ্কর রাত আজও ভুলতে পারেন না অভিনেত্রী। বেড়াতে গিয়ে গ্যাংটকে স্রেফ গন্ডগোল নয়, একেবারে তেনাদের খপ্পরে। তনিমা আনন্দবাজার ডট কম-কে বলেন ‘‘আমি ছেলেখেলা করছি না। মিথ্যে কথাও বলছি না। আজ যে ভূতুড়ে ঘটনাটা বলব, সেটা গল্প নয়। আমার নিজের জীবনে ঘটা সত্যি ঘটনা। আমি, আমার বর, মেয়ে, জামাই আর নাতি যাচ্ছিলাম গ্যাংটক। সেই প্রথম আমরা নিজস্ব গাড়ি নিয়ে না বেরিয়ে ট্রেনে-বাসে করে যাচ্ছিলাম। গ্যাংটকে আমার জামাইয়ের এক বন্ধু নতুন হোটেল কিনেছিল। সেই হোটেলে আমাদের দুটো ঘর বুক করা হয়েছিল। ট্রেন থেকে নেমে গ্যাংটকের বাসে ওঠার সময়ে এক বাঙালি দম্পতির সঙ্গে আমাদের আলাপ হল। আমার তো গায়ে পড়ে গল্প করা স্বভাব! কথা বলতে বলতে জানলাম, তাঁদের গ্যাংটকে কোনও হোটেল বুকিং নেই। আমার ধারণা ছিল— আমাদের বুকিং করা হোটেলটা নতুন, অনেক ঘর নিশ্চয়ই থাকবে তাতে। ওই দম্পতিকেও তাই আমি হোটেলটার হদিশ দিলাম। তাঁরাও রাজি হলেন আমাদের হোটেলে যেতে।
সন্ধের দিকে যখন হোটেলে গিয়ে পৌঁছলাম, তখন দেখি আমাদের বুক করা দুটো ঘর বাদে হোটেলে আর ঘর নেই। সব ভরে গিয়েছে। শুধুমাত্র একটা ডরমিটরি ফাঁকা। পথে আলাপ দম্পতিকে নিয়ে ঢুকে পড়ে তত ক্ষণে আমরা অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছি। এমনকি আরও এক দম্পতিও এসে হাজির ঘর নিতে। তখন ঠিক হল আমরা ডরমিটরিতে এক রাত কাটিয়ে দেব। আর দুই দম্পতি দুটো ঘরে থাকবেন। আমি যখন ডেকে নিয়ে গিয়েছি, তখন স্যাক্রিফাইস আমাদেরই করতে হবে অগত্যা। পরদিন সকালবেলা আলাদা ঘর পাওয়া যাবে। ডরমিটরিতে ছ’টা বেড অবশ্য আমরা শোওয়ার জন্য পেলাম। আমি, আমার বর, মেয়ে-জামাই-নাতি সবাই ডরমিটরিতেই ঢুকলাম।ʼʼ
গল্পের আসল চমক এখান থেকেই শুরু। গ্যাংটকে সেই রাতে কী ঘটেছিল? তনিমা বলেন, ‘‘খুব ক্লান্ত ছিলাম সকলেই। তাই তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম আমরা। হঠাৎ বরের গলার আওয়াজে ঘুম ভাঙল। হুশ হুশ করে কী যেন তাড়াচ্ছে! ঘরের মধ্যে তখন শুধু একটা নাইট ল্যাম্প জ্বলছিল। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম। বরকে জিজ্ঞেস করতে বলল, ঘরের মধ্যে বেড়াল ঢুকেছে নির্ঘাত। ঝটপট ঝটপট করছে। আবার আলো নিভিয়ে যেই শুয়েছি, ওমনি আমিও সেই ঝটপট আওয়াজটা শুনলাম। তখন আমরা বড় আলো জ্বেলে চার দিক খুঁজলাম, খাট সরিয়ে, আলমারি খুলে দেখলাম। কোথাও কিচ্ছু নেই। তন্নতন্ন করে দেখেও কীসের আওয়াজ হচ্ছিল, বুঝে পেলাম না। আমি আর আমার বর যে বড় আলো জ্বাললাম, খাটের নীচে, আলমারিতে খোঁজাখুঁজি করলাম, তবু আমাদের মেয়ে, জামাই, নাতির ঘুম ভাঙল না। ওরা একেবারে ঘুমিয়ে অচেতন।
যে মুহূর্তে আলো নিভিয়েছি, আবার সেই ভয়ানক ঝটপট ঝটপট আওয়াজ। সে শব্দ শুনলে কেউ আর ঘুমোতে পারবে না। অদ্ভুত ব্যাপার, মেয়ে-জামাইয়ের ঘুম কিন্তু এ বারেও ভাঙেনি। আবার আলো জ্বেলে আমি আর আমার বর মিলে আলমারি টেনে সরিয়ে পেছনের দিকে দেখলাম কিছু আছে কি না। যথারীতি দেখলাম কিছুই নেই। ড্রেসিং টেবিলের পিছনেও কিছু নেই। বাথরুমে গেলাম, সেখানেও সব স্বাভাবিক। ক্লান্ত হয়ে তখন আর না পেরে আলো নিভিয়ে যেই শুয়েছি, আবার একই রকম আওয়াজ শুরু হয়ে গেল। শেষে আলো জ্বালিয়ে আমরা দুʼজনে দুʼজনের দিকে তাকিয়ে বসে রইলাম খানিক ক্ষণ। মেয়ে-জামাইকে ডেকে বললাম, ‘কী রে আমরা এত আওয়াজে আলো জ্বালছি, আলমারি সরাচ্ছি, তোদের কোনও হুঁশ নেই! ঘুম ভাঙছে না?ʼ ওরা কিন্তু সত্যি কিছুই টের পায়নি। শেষমেশ বসে বসে আলো জ্বেলেই রাত কেটে গেল।
সকাল হতেই রিসেপশনে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, ‘ভাই সারা রাত ধরে এখানে কী হয়েছে? ডরমিটরিতে কীসের এত আওয়াজ?’
হোটেলের সব ক’টা লোক চুপ পুরো! নিজেদের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। কিছু জবাব দিতেই পারল না! শুধু বলল ‘আজ রাতে কি আপনারা থাকবেন?ʼ আমাদের এ বার সন্দেহ হল! আমরা বললাম, ‘না ভাই থাকব না, চলে যাচ্ছি।’ ওরা বলল ‘বেশ।’ আমরা গ্যাংটক গিয়েছিলাম তিন দিনের জন্য। হোটেল থেকে তিন দিনের দুটো রুমের খদ্দের চলে যাচ্ছে এক রাত থেকেই। তবু ওরা কিন্তু এক বারের জন্য বলল না, আপনারা থাকুন। হোটেল ছেড়ে শুধু নয়, গ্যাংটক ছেড়েই আমরা চলে এলাম সে বার। বাকি কʼদিন দার্জিলিংয়ে ছিলাম। জানি না গ্যাংটকে এখনও সেই হোটেল আছে কি না। থাকলে আমাদের মতো অভিজ্ঞতা আর কারও হয়েছে কি না।ʼʼ
এটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।