- ‘‘কীরে লতু কী হয়েছে? এত চেঁচামেচি কিসের?ʼʼ
- ‘‘দেখো না মা, কতদিন পর আমার ঠাকুরপো এল, বলল একটু পুঁটি মাছ খাবে! আমি সেই কখন পুঁটি মাছগুলো কাটতে দিয়ে গেছি, আর তোমার বড় বউয়ের এত সাহস ওগুলো না কেটে ঘরে খিল দিয়ে বসে আছে!ʼʼ
পুঁটি মাছ আর লতু, যেন সমার্থক হয়ে গিয়েছে বাঙালির বিনোদনে। আর এই লতুর চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন রত্না ঘোষাল। রত্নার নামই হয়ে গিয়েছে লতু। আবার এক সময়ে রত্নার মুখ ঠাকুরের মতো বলা হত। তাই দেবীর চরিত্র পেতেন তিনি। সেই সব রঙিন দিনের অকপট গল্পে বর্ষীয়ান অভিনেত্রী রত্না ঘোষাল।
প্রশ্ন: লতুর চরিত্র করার পরে আপনাকে অলক্ষ্মী শুনতে হয়েছে কখনও?
রত্না: অঞ্জন চৌধুরী আমাকে বলেছিল, ‘‘তোকে একটা রোল দিচ্ছি, যে চরিত্র করে তুই লোকের কাছে গালাগালি খাবি। কিন্তু অভিনয়ের জন্য তোর সুনাম হবে।ʼʼ আমি অঞ্জনদাকে বলেছিলাম, তুমি আমাকে এমন পার্ট দিচ্ছ কেন? অঞ্জনদা বলেছিল, ‘‘করে দেখ না, এই পার্টগুলো করতে খুব মজা লাগে।ʼʼ শ্যুটিংয়ের সময়ে আমার মাঝেমাঝে মনে হত, আমি কি খারাপ ডায়লগ বলছি? একটা বাচ্চা ছেলের মুখ থেকে হরলিক্স কেড়ে নিচ্ছি, বউদের কথা মাকে লাগাচ্ছি, বাবাকে অপমান করছি। খুব খারাপ লাগত।
প্রশ্ন: ‘ছোট বউʼ রিলিজ করতে তো গল্প ঘুরে গেল?
রত্না: হ্যাঁ অলক্ষ্মী যেন লক্ষ্মী হয়ে গিয়েছে আমার জীবনে। যখন ছবিটা রিলিজ করল, লোকে লতুকে খারাপ বলছে অলক্ষ্মী বলছে। কিন্তু এই লতুকে লোকের ভাল লেগেছিল। খারাপটাই ভাল লেগেছিল। আজও যেখানেই যাই, আমাকে সবাই বলে, ‘‘ওই লতুর পুঁটিমাছের ডায়লগটা বলুন নাʼʼ। বড় বৌদির বদনাম করছি, ছোট বউয়ের শাড়ি নিয়ে নিচ্ছি আমি। কিন্তু দর্শকদের ভাল লেগেছিল। কত বছর আগে হয়ে গিয়েছে ‘ছোট বউʼ। তবু এই সময়ের ছেলেমেয়েরাও আমাকে লতু নামে মনে রেখেছে। রাস্তাঘাটেও লোক বলছে, "দেখ দেখ দজ্জাল খারাপ মহিলা লতু যাচ্ছে।"
সমাজের প্রান্তিক শ্রেণির খারাপ মেয়ের চরিত্রেও অনেক অভিনয় করেছি। ‘নাচনিʼ ধারাবাহিকে আমি নায়িকা, ভীষণ হিট ছিল কলকাতা দূরদর্শনে।
প্রশ্ন: এই লতুই তো আবার স্বয়ং মা লক্ষ্মীর চরিত্র করেছেন। লক্ষ্মী হওয়ার গল্পটা শুনি?
রত্না: ১৯৭৭-এ ‘শ্রী শ্রী মা লক্ষ্মীʼ ছবিতে আমি দেবী লক্ষ্মীর ভূমিকায় অভিনয় করেছিলাম। মা লক্ষ্মীর অভিনয় করে সাড়া পড়ে যায়। এই ছবিতে সন্ধ্যারাণী ছিলেন, যাকে আমি মামণি বলে ডাকতাম। এ ছাড়াও কমল মিত্র,গুরুদাস বন্দ্যোপাধ্যায়, গীতা দে, অসীম কুমার, অনেকে ছিলেন। প্রতি বার কোজাগরী লক্ষ্মীপুজোতে এই ছবিটা টিভিতে দিত। একটা ঘটনা মনে পড়ছে, তখন আমি ‘নহবৎʼ নাটক করছি। গ্রামেও করতে গিয়েছি। সে হাজার হাজার লোক আসত দেখতে। এক বার মেকআপ করছি, কর্তৃপক্ষের লোকেরা এসে বললেন, ‘‘রত্নাদি আপনাকে এক বার বাইরে যেতে হবে। কারণ মা লক্ষ্মী আপনি গ্রামে এসেছেনʼʼ। বেরিয়ে দেখি বিশাল আট থেকে আশির লাইন, অগুন্তি বৃদ্ধ-বৃদ্ধাও এসে আমার পায়ে হাত দিয়ে প্রণাম করছেন।
প্রশ্ন: কিন্তু পরবর্তী কালে লতুর দাপটে কি লক্ষ্মী ঢাকা পড়ে গেল?
রত্না: লতু বেশি ভাইরাল ঠিকই। কিন্তু আমি শুধু বাংলা ছবির ভ্যাম্প নই। সাতের দশকে আমি প্রচুর দেবীর চরিত্র করেছি। ‘দেবীতীর্থ কামরূপ কামাখ্যাʼতে কামাখ্যা মা, ‘নল দময়ন্তীʼতে মা লক্ষ্মী করেছি। সুজিত গুহর ‘ক্ষ্যাপা ঠাকুরʼ ছবিতে মা তারা হয়েছিলাম। ‘মাতৃভক্ত রামপ্রসাদʼ ছবিতে মা কালী আমি আর অসীম কুমার রামপ্রসাদ। তখন খুব ঠাকুরের ছবি হত আর সবাই বলত রত্নার ঠাকুরের মতো মুখ। লক্ষ্মী, কালী হওয়ার অফার প্রচুর আসত। ‘ছোট বউʼ-এর লতু তো অনেক পরে।
প্রশ্ন: দেবী চরিত্র করে কোনও স্মরণীয় ঘটনা?
রত্না: আমার তো নিজের প্রযোজনা সংস্থা ছিল। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের অনেক কাহিনি নিয়ে আমি সিরিয়াল করেছি। নিজে পরিচালনা করেছি ‘সাড়ে সাত গণ্ডার জমিদারʼ। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছেলের কাছে তাঁদের ভাটপাড়ার বাড়িতে তাঁর বাবার গল্পের কপিরাইট নিতে গিয়েছি। বৃদ্ধ ভদ্রলোক নিজে নীচে নেমে এসে আমায় বলছেন, ‘‘সাক্ষাৎ মা লক্ষ্মী আমার বাড়িতে এসেছেন। যতই খলনায়িকা করুন, আমাদের কাছে আজও আপনি মা লক্ষ্মীʼʼ। ওঁর বাড়ির সমস্ত ছোটদের বললেন, ‘‘প্রণাম কর সবাই রত্না দেবীকে, উনি মা লক্ষ্মীʼʼ। আমি যতগুলো কাহিনির রাইট নিয়েছিলাম, উনি আমার থেকে অর্ধেক টাকা নিতেন।
প্রশ্ন: বাস্তবেও তো আপনি লক্ষ্মী! বললেন তো অভিনেত্রী পরিচয়ের বাইরেও আপনার প্রযোজনা সংস্থা ছিল?
রত্না: বাংলায় আমিই প্রথম অভিনেত্রী, যে টিভি সিরিয়ালের জন্য নিজের প্রযোজনা সংস্থা করেছিল। ‘ইউনিফোকাসʼ নাম ছিল। তখন আমি ছবিতে অভিনয় করাও ছেড়ে দিয়েছিলাম। আমার ঘর থেকে ঋতুপর্ণা সেনগুপ্ত বেরিয়েছে। আমার সিরিয়াল ‘রং-বেরংʼ দেখেই প্রভাতদা ঋতুকে ‘শ্বেতপাথরের থালাʼতে নেন। রাজেশ শর্মা, কৃষ্ণকিশোর মুখোপাধ্যায়, অরিন্দম শীল আমার ঘর থেকে বেরিয়েছে। ইন্দ্রনীল সেনকে প্রথম সুযোগ আমি দিই। আমার ‘গ্রহণʼ সিরিয়ালের টাইটেল সং গেয়ে ইন্দ্রনীলকে সবাই চিনেছিল। কলকাতা দূরদর্শন থেকে ইটিভি বাংলা, কত চ্যানেলের লক্ষ্মী লাভ হয়েছে আমার সংস্থার হাত ধরে।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।