ভূত চতুর্দশী মানেই বাঙালির ঘরে ঘরে চোদ্দো প্রদীপ জ্বালানোর অনুষঙ্গ আর অলিগলিতে গা-ছমছমে ভূতের গল্প। শাকচুন্নি, পেত্নী, ব্রহ্মদৈত্য কিংবা স্কন্ধকাটা— বাংলার লোকগাথায় ভূতের চরিত্র যেমন বৈচিত্র্যময়, তেমনই তাদের নিজস্ব সামাজিক প্রেক্ষাপটও রয়েছে। তবে বর্তমান প্রজন্মের একাংশ যখন কে-পপ, কোরিয়ান খাবার কিংবা কে-ড্রামায় রীতিমতো বুঁদ, তখন সুদূর দক্ষিণ কোরিয়ার এক বিখ্যাত ভূতের কথা না জানলেই নয়। সবচেয়ে চমকপ্রদ বিষয় হলো, হাজার হাজার মাইল দূরত্বের ব্যবধান সত্ত্বেও কোরিয়ার সেই কুখ্যাত ভূতের সঙ্গে হুবহু মিল রয়েছে আমাদের বাংলার চেনা ‘পেত্নী’র!
কোরিয়ান লোকগাথায় অত্যন্ত পরিচিত এক অতৃপ্ত আত্মা হলো ‘চনিয়ো গুইশিন’। কোরিয়ান ভাষায় ‘চনিয়ো’ শব্দের অর্থ অবিবাহিত যুবতী এবং ‘গুইশিন’ শব্দের অর্থ ভূত বা প্রেতাত্মা। অর্থাৎ, অকালে মারা যাওয়া কোনও অবিবাহিত মেয়ের অতৃপ্ত আত্মাকেই কোরিয়ায় এই নামে ডাকা হয়।
প্রাচীন কনফুসিয়ানিজম-শাসিত কোরিয়ান সমাজে নারীদের প্রধান দায়িত্ব বলে মনে করা হতো বিয়ে করা, স্বামীর সেবা এবং সন্তান ধারণ করে বংশরক্ষা করা। সমাজ মনে করত, নারী হিসেবে তার পূর্ণতা প্রাপ্তি হয়নি। ফলে বিয়ের স্বাদ না পেয়ে বা অসময়ে জীবন শেষ হয়ে যাওয়ার তীব্র আক্রোশ, ক্ষোভ ও প্রতিশোধস্পৃহা নিয়ে তাদের আত্মা সংসারে ঘুরে বেড়ায়। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই অতৃপ্ত আত্মারা পরিবারের জীবিত সদস্যদের জীবনে ঘোর অমঙ্গল বা ব্যাধি ডেকে আনে।
ছবি: এআই সহায়তায় তৈরি।
কেমন দেখতে এই চনিয়ো গুইশিন? কোরিয়ান লোককথা অনুযায়ী, তার পরনে থাকে প্রাচীন অন্ত্যেষ্টিক্রিয়ার ঐতিহ্যবাহী সাদা রঙের কাফন। মাথার কুচকুচে কালো চুল অবিন্যস্ত হয়ে মুখের ওপর নেমে আসে, ফলে খালি চোখে তার মুখ স্পষ্ট দেখা যায় না। মাঝরাতে নির্জন জলাশয়ের ধার, অন্ধকার পাহাড়ি পথ কিংবা পোড়ো বাড়িতে নাকি দেখা মেলে তাঁর। বলা হয় এদের দেখা যায়, নির্জন রাস্তায়, জলাশয়ের ধারে বা ফাঁকা পুরনো বাড়িতে।
এই চনিয়ো গুইশিনের সঙ্গে অন্য কোনো ভুতের মিল পাচ্ছেন? এই ভূতের যা যা বিবরণ রয়েছে, সেগুলো একটু ভালো করে লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারবেন, বাংলার পেত্নীদের সঙ্গে এর ভীষণ মিল রয়েছে।
বাঙালি লোকবিশ্বাসেও ‘পেত্নী’ (শব্দটির উৎপত্তি সংস্কৃত ‘প্রেতিনী’ থেকে) আসলে অবিবাহিত অথবা অকালে অপ্রাপ্তবয়সে মারা যাওয়া অতৃপ্ত যুবতীদের রূপ। বাংলার পেত্নীর বেশভূষাও সাদা থান বা কোরা সাদা শাড়ি। খোলা অবিন্যস্ত চুল দিয়ে মুখ ঢেকে গাছতলায়, ভাঙা পোড়ো ভিটেয় কিংবা বাঁশবাগানে ঘুরে বেড়ায় তারা।
ভূগোল বা মানচিত্র বদলে গেলেও সামন্ততান্ত্রিক ও পুরুষতান্ত্রিক সমাজের কাঠামো যে বিশ্বজুড়ে কতখানি এক ছিল, তার স্পষ্ট প্রমাণ মেলে এই দুই দেশের লোকবিশ্বাসে। আসলে, দেশ বা মানচিত্র বদলে গেলেও সমাজ একই থাকে, সমাজের ধারণাও একই থাকে। তাই কোরিয়ায় যে চনিয়ো গুইশিন বাংলায় সে পেত্নী।
এই প্রতিবেদনটি ‘আনন্দ উৎসব’ ফিচারের একটি অংশ।