বিশ্ব জুড়ে কৃষকদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা ও পরম্পরালব্ধ জ্ঞান ফসল ফলানোর চালিকাশক্তি। কিন্তু অভিজ্ঞতার সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তনের বাস্তবতা আর মিলছে না। ১ অক্টোবর ছিল বিশ্ব কফি দিবস। বিস্ময়কর হল, ঐতিহ্যগত ভাবে পৃথিবীর ক্রান্তীয় ও নিরক্ষীয় অঞ্চলের ফসল কফি এখন ইটালিতে হচ্ছে! গবেষণা বলছে, এই সাফল্য সম্ভব হয়েছে জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে, অর্থাৎ দক্ষিণ ইটালিতে কার্যত ক্রান্তীয় অঞ্চলের মতো তাপমাত্রা তৈরি হয়েছে।
গত বছর তিন গবেষক ব্রাজ়িলের ২০৪৮টি কফি চাষে যুক্ত মিউনিসিপ্যালিটির ১৯৮০ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝার চেষ্টা করেছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন কী ভাবে কফি চাষকে প্রভাবিত করেছে ও আগামী অর্ধশতকে কী ঘটতে চলেছে। বিশ্বের ৩৯% কফি ব্রাজ়িল থেকেই আসে। মূল উৎপাদনের দুই-তৃতীয়াংশই অ্যারাবিকা। কফি উৎপাদনের কয়েকটি সুনির্দিষ্ট ধাপ আছে— সুপ্তাবস্থা, ফুল ফোটা, কফি ফল পাকা ও ফসল সংগ্রহ। এই ধাপগুলির উপর তাপমাত্রা ও বৃষ্টির প্রভাব আলোচনা করতে গিয়ে তাঁরা বলেছেন, আগামী আট দশকে রিয়ো ডি জেনিরো ও মিনাস জেরাইস-এ ১০ শতাংশেরও বেশি অ্যারাবিকা কফির ফলন কমবে। অন্য দিকে, মাটো গ্রোসো দো সুল বা সাও পাওলো-র ফলন বাড়বে। যে অঞ্চলে ফলন হ্রাসের আশঙ্কা করা হচ্ছে, সেখানে ফুল ফোটার সময়ে বেশি ‘হিটিং ডিগ্রি ডেজ়’ এর অন্যতম কারণ। এই গবেষণা সতর্কীকরণের পাশাপাশি আগাম প্রস্তুতির কথা মনে করিয়ে দেয়। জলবায়ু পরিবর্তন অনেক এলাকায় উৎপাদনের ক্ষতি করবে, কিন্তু অন্য এলাকায় সুবিধাও করে দেবে।
২০২৫ সালে মার্চ মাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধ প্রকাশিত হয় ‘এনভায়রনমেন্টাল রিসার্চ লেটারস’-এ। প্রশ্ন করা হয়, এ-যাবৎ যে সকল ফসল তাদের উৎপাদন প্রাচুর্যের জন্য বিশ্ব জুড়ে সমাদৃত, জলবায়ু পরিবর্তনের আবহে সেগুলি কি সর্বোচ্চ উৎপাদনশীলতা ধরে রাখতে পারবে? ন’টি ফসলকে চিহ্নিত করা হয়েছে— অ্যারাবিকা কফি, কাসাভা (মাটির নীচের আলুজাতীয় ফসল), শিম, গম, ভুট্টা, কলা, ধান, জোয়ার এবং আখ। তাঁদের মতে কফি, কাসাভা, শিম, গম এবং কলার ক্ষেত্রে উৎপাদনের নিম্নমুখী প্রবণতা থাকবে এবং শতাব্দীর শেষ নাগাদ তা অর্ধেকে নেমে আসতে পারে। তবে তাঁরা কিছু সুরাহার পথ বলে দিয়েছেন। জন-চাহিদা মেটাতে উৎপাদনের পরিমাণ ঠিক রাখতে হবে, কারণ উৎপাদন অঞ্চলগুলির স্থানান্তর ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে চাষযোগ্য জমির সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এই কারণে আগামী দিনে কৃষকদের ভবিষ্যৎ চাষের পরিকল্পনা, ফসল নির্বাচন এবং কৃষি অভিযোজনের কৌশল নির্ধারণে দীর্ঘমেয়াদি জলবায়ুর পূর্বাভাস গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। কলম্বিয়ার ভৌগোলিক তথ্যবিজ্ঞান বিশেষজ্ঞ ফাবিয়ো কাস্ত্রো ল্যানোস ‘জলবায়ু পরিবর্তন ও ক্রান্তীয় ফসল: কফি ও কোকোর ভৌগোলিক বিস্তারের পরিবর্তন’ প্রসঙ্গে বলতে গিয়ে মনে করিয়ে দিয়েছেন, জলবায়ুর পরিবর্তন, বিপদ, ঝুঁকি এবং সম্ভাব্য প্রভাবের বিশ্লেষণকে একটি সুসংহত পদ্ধতির মাধ্যমে একত্রিত করলে আগামী কয়েক দশকের জন্য অভিযোজন কৌশল তৈরি করা সম্ভব।
প্রায় এক দশক আগেই হিমাচল প্রদেশের কিন্নরে আপেল চাষিদের উপর সমীক্ষা চালানো হয়। নিম্ন (সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ২,৫০০ মিটারের কম), মধ্য (২,৫০০-৩,০০০ মিটার) এবং উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলের (৩,০০০ মিটারের বেশি) কৃষকদের মতামত নথিভুক্ত করা হয়। সব উচ্চতাতেই অধিকাংশ কৃষক জানিয়েছিলেন, তাপমাত্রা বেড়েছে। নিম্ন পার্বত্য অঞ্চলের ৭২ শতাংশ কৃষকের ধারণা, তাপমাত্রা বৃদ্ধির ফলে আপেলের আকার ছোট হচ্ছে, ফলের গুণমানও কমছে। এ ছাড়া ৭৩-৮৩ শতাংশ কৃষক স্বীকার করে নিয়েছেন যে, আপেল সংগ্রহ বা ফসল তোলার সময় পিছিয়ে যাচ্ছে।
ভারতে ফসল ক্যালেন্ডারে খরিফ ও রবি ফসল বপন ও ফলনের সময়সূচিতে যে পরিবর্তন এসেছে, সে কথা আজ বহু কৃষক ও গবেষক মেনে নিয়েছেন। রবি ফসল মূলত সেচনির্ভর। ‘এগ্রিকালচারাল অ্যান্ড ফরেস্ট মেটিয়োরলজি’ জার্নালে ২০২২-এ প্রকাশিত এক প্রবন্ধে ধান-গম বা দু’বার ধান চাষের ক্ষেত্রে বপনের সময় এগিয়ে আনার কথা বলা হয়েছে। খরিফ ও রবি ফসলের বপন ও উৎপাদনের প্রচলিত সময়সূচির কিছু পরিবর্তনের ইঙ্গিতও দেওয়া হয়েছে। আর এখানেই ‘ব্লু ওয়াটার’ ও ‘গ্রিন ওয়াটার’-এর সুষ্ঠু ব্যবহারের কথা এসেছে। বৃষ্টির জল বা গ্রিন ওয়াটার সরাসরি ফসল গ্রহণ করে। আর ব্লু ওয়াটার হল মিষ্টি জল। কৃষিকাজে কৃত্রিম ভাবে সেচ দেওয়ার সময় ব্লু ওয়াটার ব্যবহৃত হয়। গবেষকরা সতর্ক করছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ফলনের ক্ষতি এড়াতে এবং জলের ব্যবহার কমাতে গ্রিন ও ব্লু ওয়াটারের যথাযথ ব্যবহার বিধি জানা দরকার।
২০২০ সালে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম ধান উৎপাদনকারী দেশ হিসেবে মোট ধান উৎপাদনের ২৪ শতাংশ উৎপাদন করেছিল ভারত। ধান রফতানির ক্ষেত্রে ছিল বিশ্বের বৃহত্তম রফতানিকারক দেশ। ভারতের অভ্যন্তরীণ খাদ্যনিরাপত্তার ক্ষেত্রেও ধান উৎপাদনের স্থিতিশীলতা গুরুত্বপূর্ণ। এই শতক জুড়ে ভবিষ্যৎ জলবায়ুর পূর্বাভাসের ক্ষেত্রে অভিযোজনমূলক ব্যবস্থা না করা হলে ভবিষ্যতে কৃষি উৎপাদন উল্লেখযোগ্য ভাবে হ্রাস পাওয়ার আশঙ্কা। এই পরিস্থিতিতে দীর্ঘমেয়াদে, অর্থাৎ ২০৮১-২১০০ সালের মধ্যে, ১৯৯৪-২০১৪ সালের উৎপাদনের তুলনায় ধানের গড় উৎপাদন ২২ শতাংশ কমে যেতে পারে।
প্রবীণ কৃষকেরা আজও আক্ষেপ করেন, কেন যে দেশজ সহনশীল বীজ রক্ষা করা যায়নি। কেন গুটিকতক কোম্পানি তাঁদের বাধ্য করছে বীজ কিনতে? দেশজ বীজ বাড়তি রোদ জল সইতে পারে। যে লোকজ্ঞান ও লোকপ্রযুক্তি এত কাল কৃষিকে রক্ষা ও নিয়ন্ত্রণ করেছে, আগামী দিনের গবেষণা থেকে উঠে আসা ব্যবস্থাপত্রের সঙ্গে যথাযথ ভাবে তাকে যুক্ত করেই ভবিষ্যতের পথ ঠিক করতে হবে।