E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

আগুনের পরিখার পারে

জাতীয় রাজনীতির প্রাচীন প্রবাদ— দিল্লির মসনদের রাস্তা লখনউ হয়ে যায়। কিন্তু ২০২৭-এর গোড়ায় যে লখনউ বিধানসভা ভোট দিতে রাস্তায় নামবে, প্রশ্ন উঠছে সে কোন লখনউ?

অগ্নি রায়

শেষ আপডেট: ০৩ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:২৫
পরীক্ষা: বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন একযোগে ভোটার তালিকায় কারচুপি করছে, অভিযোগ অখিলেশ যাদবের, ১৫ অক্টোবর, লখনউ।

পরীক্ষা: বিজেপি ও নির্বাচন কমিশন একযোগে ভোটার তালিকায় কারচুপি করছে, অভিযোগ অখিলেশ যাদবের, ১৫ অক্টোবর, লখনউ। ছবি: পিটিআই।

এক কালে উত্তরপ্রদেশের উর্দু কবি জিগার মুরাদাবাদী লিখেছিলেন— ‘এক আগ কা দরিয়া হ্যায়/ অউর ডুবকে যানা হ্যায়’! অর্থাৎ প্রেম হল এমনই এক আগুনে নদী, যার মধ্যে ডুবে গিয়ে তাকে খুঁজতে হয়! লোকসভা ভোটের সেমিফাইনাল অর্থাৎ মুরাদাবাদীর রাজ্যে ভোটযুদ্ধের মুখে দাঁড়ানো কুশীলবরা, এখন ওই আগুন নদীতে নেমেছেন সবে। প্রেম এবং যুদ্ধ— দু’ক্ষেত্রেই সব কিছু মঞ্জুর। প্রেম এবং যুদ্ধ— উভয় ক্ষেত্রেই পার হতে হয় আগুনের পরিখা।

জাতীয় রাজনীতির প্রাচীন প্রবাদ— দিল্লির মসনদের রাস্তা লখনউ হয়ে যায়। কিন্তু ২০২৭-এর গোড়ায় যে লখনউ বিধানসভা ভোট দিতে রাস্তায় নামবে, প্রশ্ন উঠছে সে কোন লখনউ? যারা গত বিধানসভা নির্বাচনে (২০২২) রাজ্যের মোট ৪০৩টি আসনের মধ্যে ২৫৫টি আসন সাজিয়ে দিয়েছিল বিজেপির করকমলে? না কি গত লোকসভা ভোটের (২০২৪) লখনউ, যেখানে ৮০টি লোকসভা আসনের মধ্যে এসপি-কংগ্রেস জোটের হাতে তুলে দিয়েছিল ৪৩টি আসন? তার আগের ৬২টি আসনে রমরম করা বিজেপির সংখ্যা ২০২৪-এ নেমে এসেছিল মাত্র ৩৩টিতে।

বিজেপি তরফের যুক্তি, উত্তরপ্রদেশের মানুষ লোকসভা এবং বিধানসভার ভোট দিতে যান দু’টি ভিন্ন মেজাজ, আশা-আকাঙ্ক্ষা নিয়ে। ফলে, ২০২৪-এর লোকসভার নিরিখে ২০২৭-এর বিধানসভার আন্দাজ পাওয়া সম্ভব নয়। অন্য দিকে, এসপি-র বক্তব্য, ২০২৪-এ যে মেজাজ তৈরি হয়ে গিয়েছে, তা উত্তরোত্তর আরও বিজেপি-বিরোধী হয়ে উঠেছে, বিশেষ করে দেশজোড়া সরকার-বিরোধী আন্দোলনের আঁচ গোমতী নদীর তীরেও পড়ছে। এই তর্কের উত্তর যা-ই হোক না কেন, এ ব্যাপারে কেউই আর সন্দিহান নন, ২০২৭-এর ফেব্রুয়ারি-মার্চের উত্তরপ্রদেশ বিধানসভা নির্বাচনের ফলাফল ২০২৯-এর লোকসভার পাটিগণিতকে অনেক দূর পর্যন্ত প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখবে।

২০২২-এর বিধানসভা এবং ২০২৪-এর লোকসভার মধ্যে ফলাফলের বিপুল পার্থক্যের অনেক রাজনৈতিক কারণ রয়েছে। যেমন, যোগী আদিত্যনাথের পাশে এ বারে আরএসএস যে ভাবে দাঁড়াচ্ছে, বা ২০২২-এ দাঁড়িয়েছিল, ২০২৪-এর লোকসভায় তেমন দেখা যায়নি। বিষয়টি এমন নয় আরএসএস যখনই রাজ্য বিজেপির সঙ্গে থেকেছে, তখনই বিপুল জয় সুনিশ্চিত করতে পেরেছে। কিন্তু তাদের বসে যাওয়া, এবং লড়াইয়ের ময়দানে থাকার মধ্যে অবশ্যই অনেকটা ফারাক হয়ে যায়।

কিন্তু আরএসএস-কে সঙ্গে পেয়েও, এবং রাজ্যে আইনশৃঙ্খলার প্রশ্নে নিজেকে আমজনতার মসিহা হিসাবে তুলে ধরতে পারলেও, নিশ্চিন্তে নেই যোগী আদিত্যনাথ। অন্তত যেমনটা নাকি তিনি ছিলেন ২০১৯-এ। রামমন্দিরে অনুদানের অর্থ চুরির ঘটনা উত্তরপ্রদেশের আসন্ন ভোটের ময়দানে রাজনৈতিক বুদবুদ তৈরি করেছে, তাকে কাজে লাগানোর জন্য অখিলেশ যাদবের দল এসপি সক্রিয় থেকেছে ঠিকই, কিন্তু সেটা নিয়ে বিশেষ ভাবিত নন যোগী। রামমন্দিরের যে কোনও বিষয়েই তাঁকে খুব বেশি ভিড়তে দেওয়া হয়নি মন্দির উদ্বোধনকেন্দ্রিক রাজনীতির শস্য তোলায়, ক্যামেরার সামনে ছিলেন শুধু এবং শুধুই নরেন্দ্র মোদী, আর কিছুটা অমিত শাহ। বিজেপির অভ্যন্তরীণ রাজনীতির (শাহ এবং যোগীর উত্তরাধিকার নিয়ে লড়াইয়ের গত কয়েক বছর ধরে চলতি ভাষ্য) কবলে পড়া যোগী সে সময় প্রচারের আলো বিরহিত থাকলেও তা এখন শাপে বরের মতোই কাজ করেছে তাঁর জন্য।

বিজেপির প্রবলতম প্রতিপক্ষ এ বার এসপি নয়, কংগ্রেস তো নয়ই, বরং বিজেপি নিজেই। যোগী আদিত্যনাথের দল কেন্দ্র ও রাজ্যে দীর্ঘ দিন ক্ষমতাসীন থাকার অসুখে ভুগছে। জোড়া ‘অ্যান্টি-ইনকাম্বেন্সি’ বলা যায়। কোনও শাসক দল, দশক ছাড়িয়ে রাজ্যে বা কেন্দ্রে শাসনরত থাকলে ক্ষোভের পুঞ্জায়ন হওয়া খুবই স্বাভাবিক। তার মোকাবিলা করা এই মুহূর্তে বিজেপি নেতৃত্বের সামনে সবচেয়ে বড় কাজ— তা কৃষকদের ন্যূনতম সহায়ক মূল্যের দাবিতেই হোক, ফসলের দাম না পাওয়া, বিশেষ করে আলু চাষিদের দুরবস্থা, বেকারত্ব, বাজারে আগুন লাগা বা মূল্যবৃদ্ধিই হোক, দায় এসে পড়ছে কেন্দ্র এবং রাজ্যের শাসক দলের ঘাড়েই। ভোটারদের নতুন বার্তা দিতে বিধানসভা ভোটে ব্যাপক হারে প্রার্থী বদল অবশ্যম্ভাবী কৌশল হতে চলেছে গেরুয়া শিবিরের। সদ্যসমাপ্ত রাজ্যসভার নির্বাচনে উত্তরপ্রদেশের ৮টি আসনেই নতুন প্রার্থী দিয়েছে বিজেপি— কারণ ও লক্ষ্য স্পষ্ট। পাশাপাশি জনমোহিনী যোজনা এবং খয়রাতির বন্যা আসতে চলেছে রাজ্যে, গোবলয়ে যা ভোট টানতে খুবই বড় ভূমিকা নিয়ে থাকে। বিজেপির সেই শক্তির সঙ্গে এঁটে উঠতে পারে, সম্ভবত এমন দল ভূভারতে নেই।

এতৎসত্ত্বেও যোগী তথা রাজ্য ও কেন্দ্রীয় বিজেপি নেতৃত্বের আরও একটি শিরঃপীড়া লুকিয়ে— জাতপাতের রাজনীতির গতিপ্রকৃতি এ বার কোন দিকে যাবে, তার ভিতরেই। ‘পিডিএ’ (পিছড়ে বর্গ, দলিত এবং অল্পসংখ্যক)-র ভিত্তিতে কোন বর্গ কোথায় শক্তিশালী, আসনপ্রতি তার চুলচেরা সমীক্ষা করেছে, তাদের একজোট করার কর্মসূচি নেওয়া হয়েছে— এমনটা ঘরোয়া আলোচনায় দিল্লিতে সংসদ চত্বরে দাঁড়িয়ে বার বার দাবি করেছেন অখিলেশ যাদব এবং তাঁর টিম। এই বন্ধনীর মাধ্যমে প্রায় সব সম্প্রদায়কে ধরা যাবে বলেই মনে করা হচ্ছে। ব্রাহ্মণকেও অল্পসংখ্যকের মধ্যে ধরা হচ্ছে, যদিও এই সম্প্রদায় রাজ্যের মোট জনসংখ্যার ১৬ শতাংশ। ২০২২ সালের বিধানসভা ভোটেও এরা বিজেপির সঙ্গে ছিল। কিন্তু যোগী আদিত্যনাথের জমানায় ব্রাহ্মণহত্যা এবং নিপীড়নের অভিযোগ বেড়েছে। ঠাকুর বনাম ব্রাহ্মণের জাতিদ্বন্দ্ব প্রকাশ্যে এসেছে। প্রায় এক দশকের মধ্যে এই প্রথম বার উত্তরপ্রদেশের জাতপাতের রাজনীতিতে ব্রাহ্মণ ভোট মুখ্য বিষয় হয়ে উঠতে পারে বলে অনুমান অনেকেরই। বিজেপি কতটা ব্রাহ্মণ ভোট ধরে রাখতে পারবে, তা এখনও স্পষ্ট নয়। ইউজিসি নির্দেশিকা নিয়ে বিতর্ক, প্রয়াগরাজ মাঘ মেলায় প্রবেশের ক্ষেত্রে স্বামী অভিমুক্তেশ্বরানন্দের উপর বিধিনিষেধ, ব্রাহ্মণ জনমানসকে চঞ্চল ও অসন্তুষ্ট করেছে। ঘোলা জলে মাছ ধরতে কংগ্রেস তাদের রাজ্য সভাপতি হিসাবে বেছেছে পূর্বাঞ্চলের পরিচিত ব্রাহ্মণ মুখ আরাধনা মিশ্রকে। উত্তরপ্রদেশের ৯৭টি বিধানসভা আসনে (বেশির ভাগ পূর্বাঞ্চলে) ব্রাহ্মণ ভোটার উল্লেখযোগ্য (গড়ে ১৫ শতাংশ)। এত দিন এই আসনগুলিতে বিনা যুদ্ধেই হিন্দুত্ববাদী পার্টিকে জমি ছেড়ে দিয়েছে সমাজবাদী পার্টি। এ বার পরিস্থিতি বদলাচ্ছে।

ব্রাহ্মণভোটের পাশাপাশি সব পক্ষেরই নজরে থাকবে তফসিলি জাতি ও জনজাতিবর্গের দিকে। এমন কৌশল নিলেও অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না যে তফসিলি জাতি ও জনজাতিভুক্তদের জন্য সংরক্ষিত ৮৬টি আসনের বাইরেও দলিত ভোট-অধ্যুষিত অসংরক্ষিত আসনেও তফসিলি প্রার্থী দিচ্ছেন অখিলেশ। এই রকম বেশ কিছু আসন এখনই চিহ্নিত করা হয়েছে। মায়াবতীর নেতৃত্বাধীন বিএসপি যখন ক্রমশ দুর্বল ও অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাচ্ছে উত্তরপ্রদেশের রাজনীতিতে, তখন এসপি-র লক্ষ্য (সেই একই লক্ষ্য বিজেপিরও)— আরও বেশি করে দলিত ভোটব্যাঙ্কের কাছে পৌঁছনো। দলিত সম্প্রদায়ের আবেগের পাল্লা এখনও পর্যন্ত সামান্য হলেও ঝুঁকে রয়েছে এসপি-র দিকে। আরএসএস এবং বিজেপির দলিত-বিরোধী মানসিকতা এবং তাদের মনুবাদী কর্মসূচিকে সহজাত ভাবে দলিতদের পছন্দ করার কথা নয়, যদি না তাঁদের জন্য বিশেষ কোনও যোজনা ভোটের মুখে একের পর এক নিতে থাকে বিজেপি। উত্তরপ্রদেশের জনসংখ্যার ২১ শতাংশ দলিত সম্প্রদায়ভুক্ত। বিএসপি-র যা প্রধান ভোটব্যাঙ্ক ছিল, তা ক্রমশ বদলাতে শুরু করেছে গত কয়েক বছরে। ২০২২ সালের নির্বাচনে মায়াবতী পেয়েছিলেন মাত্র একটি আসন, তার আগে ২০১৭ সালে তাদের আসন ছিল ১৯। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে স্পষ্ট হয়ে যায় মায়াবতীর আর জনভিত্তি নেই, দলিত সম্প্রদায় তাঁকে ছেড়ে গিয়েছেন, একটি আসনও জেতেনি বিএসপি।

উত্তরপ্রদেশের স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের মতামত, ভোটার তালিকার এসআইআর-কে কাজে লাগিয়ে যে ভাবে পশ্চিমবঙ্গে সুবিধা তুলেছে বিজেপি, তা তারা করতে পারবে না উত্তরপ্রদেশে। সীমান্তে বাংলাদেশ, পাকিস্তান কিছুই নেই। অনুপ্রবেশ, রাজ্যের সীমান্ত অঞ্চলে জনচরিত্র বদলে যাওয়ার মতো বিষয় নেই। দ্বিতীয়ত, এখানকার মুসলমানদের বসবাস সেই মোগল আমল থেকে। তৃতীয়ত, উত্তরপ্রদেশে বহু মানুষের দু’টি করে ভোটার কার্ড আছে, একটি শহরে ও একটি গ্রামে। গত দশ বছরে বহু মানুষ গ্রাম থেকে শহরে এসেছেন, দু’জায়গাতেই তাঁদের কার্ড রয়েছে। কিন্তু এসপি-র দাবি, এঁরা বিজেপিরই সমর্থক, যোগী আদিত্যনাথের দীর্ঘ শাসনে স্থানীয় নেতার মদতে যা করার করেছেন।

নির্বাচনের এখনও চার মাস। এর মধ্যে পেঁয়াজের খোসার মতো স্তর-বিন্যস্ত উত্তরপ্রদেশের রাজনীতি কতটা বদলায়, সেটাই দেখার।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Uttar Pradesh indian politics Elections

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy