E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

স্বার্থের জেরে বিপন্ন গণতন্ত্র

উদ্বেগের আরও একটি বড় কারণ হল পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলির নীরবতা। এত গুরুতর ঘটনার পরেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে রাশিয়া, চিন, ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলি কেবল মৃদু ভর্ৎসনা বা কূটনৈতিক শীতল প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে।

পলাশ পাল

শেষ আপডেট: ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ ০৭:৫০

সামরিক অভিযান চালিয়ে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ভেনেজ়ুয়েলার নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে সস্ত্রীক অপহরণ করে আমেরিকার আদালতে হাজির করেছেন। ঘটনাটি আন্তর্জাতিক আইন, রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্ব এবং ন্যূনতম রাজনৈতিক নীতি-নৈতিকতার ঘোরতর পরিপন্থী। মাদুরো-র বিরুদ্ধে অভিযোগ বিবিধ— মাদক পাচার, মানবতাবিরোধী কার্যকলাপ ও অবৈধ ভাবে নির্বাচিত হওয়া ইত্যাদি। তবে আদৌ এই সব অভিযোগের সত্যতা কতখানি, তা যাচাই ও বিচার করার জন্য বিভিন্ন আন্তর্জাতিক আইন ও সংস্থা রয়েছে। কিন্তু সামরিক হস্তক্ষেপের মাধ্যমে ট্রাম্প কেবল এই ব্যবস্থার প্রতিই অনাস্থা প্রকাশ করেননি, ছোট-বড় সব রাষ্ট্রকে সমমর্যাদাসম্পন্ন হিসেবে দেখার নীতিকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছেন। শক্তিশালী রাষ্ট্র চাইলে দুর্বল রাষ্ট্রকে গ্রাস করতে পারে— এই নির্মম বাস্তবই আবার নতুন করে প্রতিষ্ঠা পেল। ভেনেজ়ুয়েলার মানুষ যে নিজেদের ভাল-মন্দ বিচার করার ক্ষমতা রাখেন, ট্রাম্প এই আস্থাকে আঘাত করেছেন।

এ ক্ষেত্রে উদ্বেগের আরও একটি বড় কারণ হল পৃথিবীর বৃহৎ শক্তিগুলির নীরবতা। এত গুরুতর ঘটনার পরেও ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে শুরু করে রাশিয়া, চিন, ভারতের মতো রাষ্ট্রগুলি কেবল মৃদু ভর্ৎসনা বা কূটনৈতিক শীতল প্রতিক্রিয়ার মধ্যেই নিজেদের সীমাবদ্ধ রেখেছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে আঘাত লাগতে পারে, অথবা ট্রাম্প ক্ষুব্ধ হতে পারেন— এই আশঙ্কায় সকলেই যেন মৌন থাকাকেই নিরাপদ কৌশল হিসেবে বেছে নিয়েছে। অনেকের মতে, ভেনেজ়ুয়েলার প্রশ্নে প্রায় নিশ্চুপ থাকার বিনিময়ে ট্রাম্পের সঙ্গে ইউক্রেন বা তাইওয়ান বিষয়ে হয়তো রাশিয়া ও চিনের প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ সমঝোতা গড়ে উঠেছে। এর পরিণতি হিসাবে রাশিয়ার ইউক্রেন নীতি এবং চিনের তাইওয়ান নীতি আরও আক্রমণাত্মক হয়ে উঠতে পারে বলেই মনে করছেন তাঁরা।

স্বার্থসিদ্ধির জন্য ট্রাম্প যেমন সত্য আড়াল করতে পারেন, তেমনই অনেক সময় ‘অস্বস্তিকর সত্য’কে অকপটে প্রকাশ করতেও দ্বিধা করেন না। ভেনেজ়ুয়েলার ক্ষেত্রে তিনি লুকোননি যে, সে দেশের ভারী তেল সম্পদই আসল লক্ষ্য। সামরিক অভিযান শেষ হতেই তিনি ঘোষণা করেছেন— কারাকাস এবং তার তেল সম্পদের নিয়ন্ত্রণ ওয়াশিংটনের হাতেই থাকবে। আশির দশকে ভেনেজ়ুয়েলা তার তেল সম্পদকে জাতীয়করণ করে। পরে উগো চাভেসের শাসনামলে এই রাষ্ট্রীয় নিয়ন্ত্রণ আরও জোরদার হয় এবং তা বহাল থাকে মাদুরোর শাসনকালেও। ফলে সেখানে আমেরিকান তেল কোম্পানিগুলির স্বার্থ মারাত্মক ভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। ট্রাম্প এই অর্থনৈতিক ক্ষতি সামাল দিতে এবং কর্পোরেট সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করতেই এতটা বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন।

এই নীতি যে ভেনেজ়ুয়েলায় সীমাবদ্ধ থাকবে না, তা-ও ট্রাম্প স্পষ্ট করে দিয়েছেন। কলম্বিয়া ও মেক্সিকোর নির্বাচিত সরকারগুলির বিরুদ্ধে তিনি প্রকাশ্যে হুমকি দিয়েছেন, এবং কলম্বিয়ার বামপন্থী প্রেসিডেন্ট গুস্তাভো পেত্রো-কে ‘অসুস্থ মানুষ’ বলে কটাক্ষ করেছেন। কিউবার উপর কঠোর অবরোধ চাপানোর পক্ষেও তিনি। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, ভেনেজ়ুয়েলা থেকে তেল সরবরাহ বন্ধ হলে হাভানার অর্থনীতি ভেঙে পড়বে, কারণ সস্তা জ্বালানি ও আর্থিক সহায়তার জন্য দেশটি ভেনেজ়ুয়েলার উপর নির্ভরশীল। কিউবা অর্ধ শতাব্দীর বেশি সময় ধরেই আমেরিকার আগ্রাসনের প্রতিস্পর্ধী হিসাবে নিজেদের টিকিয়ে রেখেছে, যা ট্রাম্পের পক্ষে মানা অসম্ভব। উৎকণ্ঠা তৈরি হয়েছে প্রতিবেশী দেশ পানামা-তে, কারণ অতীতে তিনি পানামা খাল দখল নেওয়ারও হুমকি দিয়েছিলেন।

এখানেই শেষ নয়। গত এগারো মাসে ট্রাম্প একাধিক বার গ্রিনল্যান্ড দখলের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বিরল মৃত্তিকা খনিজ সম্পদ ছাড়াও দ্বীপটি কৌশলগত দিক থেকেও হোয়াইট হাউসের কাছে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় থেকেই তাদের এখানে একটি সামরিক ঘাঁটি রয়েছে। ট্রাম্পের কথায়, ‘জাতীয় নিরাপত্তার স্বার্থেই গ্রিনল্যান্ড আমেরিকার প্রয়োজন— দ্বীপটির চার পাশে রাশিয়া ও চিনের জাহাজ ঘোরাফেরা করছে’। প্রায় ৩০০ বছর ধরে গ্রিনল্যান্ড ডেনমার্কের অধীনে থাকলেও দ্বীপটি এখন অর্ধ-স্বায়ত্তশাসিত— কেবল বিদেশনীতি ও প্রতিরক্ষা সংক্রান্ত বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেয় ডেনমার্ক সরকার। অন্য দিকে, ডেনমার্ক আবার নেটোর সদস্য এবং ওয়াশিংটনের পুরনো মিত্র। তা সত্ত্বেও ট্রাম্প গ্রিনল্যান্ড দখলের জন্য মরিয়া।

আসলে ট্রাম্পের কাছে ‘শত্রু’ ‘মিত্র’ বাছাইয়ের একমাত্র মাপকাঠি হল— বাণিজ্যিক স্বার্থ। গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের কোনও স্থান সেখানে নেই। এই প্রেক্ষাপটে নরেন্দ্র মোদী ও ডোনাল্ড ট্রাম্পের তথাকথিত বন্ধুত্বের কথাও মনে করা যাক। উভয় নেতাই ‘হাউডি মোদী’ ও ‘নমস্তে ট্রাম্প’ প্রদর্শনীর মধ্যে দিয়ে পরস্পরের মধ্যে উষ্ণ সম্পর্ক এবং ভারত ও আমেরিকার মৈত্রীর কথা তুলে ধরেন। কিন্তু সেই ডোনাল্ড ট্রাম্প দ্বিতীয় মেয়াদে ক্ষমতায় এসে ভারতীয় পণ্যের উপরে কড়া শুল্ক আরোপ করেছেন। রাশিয়া থেকে তেল কেনার ‘অপরাধ’-এ তিনি ভারতের উপর বাড়তি শুল্ক চাপিয়েছেন।

সম্প্রতি তিনি আমেরিকার প্রতিরক্ষা দফতরের নাম পরিবর্তন করে রেখেছেন—‘যুদ্ধ দফতর’, এবং ২০২৭-এ তিনি তাঁর ‘স্বপ্নের সেনাবাহিনী’ গড়ার জন্য সামরিক খাতে ব্যয় বাড়িয়ে দেড় লক্ষ কোটি ডলার করার পক্ষে সওয়াল করেছেন। এগুলিকে শুধুমাত্র কোনও খামখেয়ালি বিষয় বা বাগাড়ম্বর বলে উড়িয়ে দেওয়া যাবে না, বরং ট্রাম্পকে দেখে পৃথিবীর মানুষের সতর্ক হওয়া উচিত। কেননা গণতন্ত্রের মুখোশ পরেই কিন্তু তিনি গণতন্ত্রকে গ্রাস করতে উদ্যত হয়েছেন।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Democracy Diplomacy

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy