আবার একটা পুজো। যাঁরা দূরে থাকেন, ইতিমধ্যেই হয়তো ঘরে ফিরেছেন, বা ফিরছেন— দীর্ঘ পথ পেরিয়ে, চেনা শহর, বাড়ি, মানুষের কাছে। ঘরে ফেরার দিন গুনে ঘুম ভাঙে প্রবাসী বাঙালির। মনে পড়ে, পুজোর ভোরে ঘুমচোখে উঠোনে বেরিয়ে দু’হাত ভরে শিউলি কুড়োনো। দূর থেকে ভেসে আসা ঢাকের শব্দ, নতুন জামা গায়ে মণ্ডপের দিকে ছুটে যাওয়া। অনেকটা সময়ের দূরত্বে, বদলে যাওয়া জীবনেও পুজো এলে মানুষ যেন দাঁড়িয়ে পড়ে নিজের ফেলে আসা সময়ের মুখোমুখি। তখন মনে হয়, ঘর আসলে কখনও ছেড়ে যাওয়া যায় না। বাঙালির কাছে দুর্গাপুজো নিজের কাছে ফেরার এক নীরব পিছুটান।
মানুষ তখনই ফিরতে পারে, যখন তার কোনও ঘর থাকে। আধুনিক জীবনের একটি বড় সঙ্কট হল— আমরা ক্রমশ চলমান, আর সেই সঙ্গে অনেক বেশি গৃহহীন। আজকের মানুষ কর্মসূত্রে এক শহরে, পরিবার অন্য শহরে, বেড়ে ওঠা মফস্সলে, আর ভবিষ্যৎ হয়তো অন্য কোনও দেশে। তার জীবনের মানচিত্রে ঠিকানা আছে অনেক, কিন্তু ঘর এক ক্রম-অস্পষ্ট ধারণা। পুজো সেই অস্পষ্টতাকে কয়েক দিনের জন্য প্রকট করে। বাড়িতে ফিরছি বটে, তবে তার দেওয়ালে নতুন রং। বড় হয়েছি যে পাড়ায়, সেখানে নতুন বহুতল। ছেলেবেলায় যে পাকুড় গাছটার ছায়ায় দাঁড়িয়ে বন্ধুর জন্য অপেক্ষা করতাম, সেটি ঝড়ে পড়ে গেছে। মা আগের মতো দ্রুত হাঁটতে পারেন না, বাবা এখন আরও চুপচাপ। বন্ধুরা কেউ বিদেশে, কেউ বা অন্য শহরে।
তা হলে আমরা কোথায় ফিরছি? যে ঘরে ফিরতে চাই, সেই ঘরটি তো আর নেই! আসলে আমরা ফিরি আমাদেরই স্মৃতিতে। একই মন্ত্র, ধুনোর গন্ধ, ঢাকের শব্দে আমাদের পুরাঘটিত অতীত জুড়ে যায় ঘটমান বর্তমানের সঙ্গে। কয়েক দশক আগে যে কিশোরী অঞ্জলিতে দাঁড়িয়েছিল, আজ তার আত্মজার পাশে দাঁড়িয়ে সেই একই মন্ত্র শুনে সে নিজের কিশোরীবেলার স্মৃতি রোমন্থন করে। পুজোর জন্য এই আকুল অপেক্ষাই আমাদের সম্পর্ককে অর্থপূর্ণ করে তোলে। যদি প্রতি দিন পুজো হত, তা হলে কি এত ব্যাকুল হতাম! উৎসবের মূল্য তো তার বিরতিতে। প্রত্যাবর্তনের মূল্য অনুপস্থিতিতে। তাই পুজোয় আমরা এমন একটি ঘরে ফিরি, যে ঘর আর আগের মতো নেই। ঘরের মানুষগুলো বদলে গেছে। বদলেছি আমরাও। কারণ সেটাই স্বাভাবিক। তাই ফিরি, তবু ফিরি।
পুজো কি শুধুই ধর্মীয় আচার? নিশ্চয়ই তার মধ্যে আছে আরাধনা, বিশ্বাস, মন্ত্র, অঞ্জলি। আবার সে এক বিশাল সামাজিক উৎসবও— যেখানে পাড়া, শহর, আত্মীয়, বন্ধু, খাওয়াদাওয়া, আড্ডা, শিল্প, আলো এবং বিবিধ মানুষের মিলন এক স্রোতে মিশে যায়। রেডিয়োতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। গঙ্গার ঘাটে ভোরের তর্পণ। নতুন জামার ভাঁজ— কত কী যে এক সঙ্গে মনের ভিতর আঁকিবুকি কাটে! মা আসেন আমাদের কাছে, আর আমরাও ফিরে যাই ফেলে আসা সময়ের কাছে। তাই পুজোর সবচেয়ে ব্যক্তিগত অর্থ বোধহয়— ঘরে ফেরা। যে মানুষ সারা বছর দূরে থাকে, তার কাছে পুজো মানে বাড়ির দরজা, মায়ের হাতের গন্ধ, বাবার চেনা ডাক, পুরনো ঘর, পাড়ার মোড়, পরিচিত মুখ। এই সবই আমাদের ব্যক্তিগত ইতিহাসের অংশ। সেই ইতিহাসে কেউ ফিরে আসে শহর পেরিয়ে, কেউ দেশ; কেউ বা আসে শুধুই স্মৃতির সরণি বেয়ে। কিন্তু ভুলতে না-পারা স্মৃতির টানে ফিরে আমাদের আসতেই হয়।
এখানেই উৎসবের অসাধারণ ক্ষমতা। উৎসব সময়কে সরলরেখা থেকে চক্রে পরিণত করে। সাধারণ জীবনে সময় একমুখী। শৈশব পেরিয়ে যৌবন, যৌবন পেরিয়ে বার্ধক্য। যা চলে যায়, তা আর ফিরে আসে না। কিন্তু দুর্গাপুজো প্রতি বছর ফিরে আসে। এই পুনরাবৃত্তির মধ্যে মানুষ সান্ত্বনা খুঁজে পায়। আমরা জানি, আমরা বদলে যাচ্ছি। মানুষ বদলাচ্ছে, শহর বদলাচ্ছে, সম্পর্ক বদলাচ্ছে। কিন্তু পুজো ফিরে আসছে। পুজো যেন ব্যক্তিগত ক্ষয়ের বিরুদ্ধে একটি সাময়িক সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ। বহুতলে আমরা পাশাপাশি থাকি, কিন্তু একে অন্যকে চিনি না। সমাজমাধ্যমে আমাদের হাজার সংযোগ, কিন্তু সামাজিকতার বালাই নেই। পুজো সেই বিচ্ছিন্নতার মধ্যে একটি অস্থায়ী জনপরিসর। পাড়ার প্যান্ডেল হয়ে ওঠে সজীব এক সামাজিক মঞ্চ যেখানে প্রজন্ম, পেশা, শ্রেণি, স্মৃতি এবং সম্পর্ক কয়েক দিনের জন্য পাশাপাশি এসে দাঁড়ায়, বসে, গল্প করে। কখনও আবার পুরনো বাড়ি বিক্রি হয়ে যায়, পাড়ার মাঠে তৈরি হয় শপিং মল, কত প্রিয় মানুষ, অপ্রিয় বন্ধু না-ফেরার দেশে চলে যায়। তবু মহালয়ার ভোরে সেই বাড়ির জানলা, সেই উঠোন, সেই শিউলি-ঝরা পথ আমাদের ভিতরে কোথাও আলো জ্বেলে দিয়ে যায়। তখন আবারও বুঝি, ঘর আসলে মানুষের ভিতরেই থাকে! আমরা সেই ভিতরের ঘরটাকেই খুঁজতে আসি প্রতি পুজোয়। হয়তো এ কারণেই পুজো যত আধুনিকই হোক, তার ভিতরে এই ডাক রয়েই যায়: ফিরে এসো।
শারদোৎসব তাই স্মৃতিরও উৎসব। পরিযায়ীরা তখন বাড়ি ফেরেন। কিন্তু ফেরারি মন ফিরে আসতে চায় আসলে স্মৃতির জাদুঘরে। যে স্মৃতি জমা হয়ে থাকে বীজধানের মতো! হৃদয় দেউলিয়া হলে সে বীজধান দিয়ে জীবনের ফসল ফলাতে হয়। তাই ফিরে আসা বার বার। মা-ও তো প্রতি বছর ফিরে ফিরেই আসেন। মায়েরও কি বীজধান শেষ হয়! ভালবাসার বোধনে, নবপত্রিকার স্নানে, সন্ধিপূজার শক্তিতে, হোমযজ্ঞের ভক্তিতে, সিঁদুরখেলার সোহাগে আমাদের অবিচল অর্ঘ্য তাঁর ঝুলি ভরে নিয়ে যান, একটি বছরের জন্য! তাই কি তিনি পুরাণ থেকে পরান হয়ে আমাদের পরিবারের মধ্যে ঢুকে পড়েন! দেবী তখন ঘরের মেয়ে, ঘরের মেয়েই দেবী। দেবতাকে প্রিয় আর প্রিয়কে দেবতা করার এই মন্ত্র বাঙালির নিজস্ব অর্জন।
তবু ঘরের মেয়েকে বিদায় দিতে হয়। কিন্তু তার ভিতরে লুকিয়ে থাকে একটি প্রতিশ্রুতি, অপেক্ষা, আবার দেখা হওয়ার নীরব আশ্বাস। থাকা আর না-থাকা তো একই জীবনের দুই প্রান্ত; একটিকে ছাড়া অন্যটি অসম্পূর্ণ। বিচ্ছেদের ব্যথাতেই ফিরে আসার আনন্দ আরও গভীর হয়ে ওঠে। ঠিক এইখানেই শারদপ্রাতে এক অদৃশ্য টানে মা ফেরেন প্রতি বছর। আর আমরাও ফিরি স্থানের আর সময়ের দূরত্ব পেরিয়ে, আমাদের শিকড়ে, স্মৃতিতে, সত্তায়।
বাংলা বিভাগ, হেরম্বচন্দ্র কলেজ