E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

দোলা ঘোটক গজ কথা

দুর্গাপূজায় সপ্তমী ও বিজয়া দশমীর বারের উপরে ভিত্তি করে দেবীর বাহন নির্ধারিত হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, বারের নামগুলি শুভ ও অশুভ গ্রহের সঙ্গে যুক্ত। যেমন— শুভ গ্রহ রবি ও সোমবারে দেবীর বাহন হয় ‘গজ’ (হাতি), যা সুবৃষ্টি ও সমৃদ্ধির প্রতীক।

অমিতাভ পুরকায়স্থ

শেষ আপডেট: ২০ অক্টোবর ২০২৬ ০৮:৫৩

২০২০ সাল, বিশ্ব তখন নজিরবিহীন অতিমারির আতঙ্কে আচ্ছন্ন। সে বছর সপ্তমীর দিনটি ছিল বৃহস্পতিবার, আর শাস্ত্রীয় গণনামতে বৃহস্পতি বা শুক্রবারে দেবীর আগমন ঘটে দোলা বা পালকিতে। পঞ্জিকার পাতা উল্টে সাধারণ মানুষের চোখ আটকে গিয়েছিল এই শব্দগুচ্ছে— ‘দোলায়াং মড়কং ভবেৎ’। প্রচলিত লোকবিশ্বাস অনুসারে যার ফল মহামারি, রোগব্যাধি ও প্রজাক্ষয়। কোভিডের আতঙ্কে প্রাচীন সেই গণনা ‘ফলে যেতে’ দেখেছিলেন অগণিত মানুষ।

দুর্গাপূজায় সপ্তমী ও বিজয়া দশমীর বারের উপরে ভিত্তি করে দেবীর বাহন নির্ধারিত হয়। জ্যোতিষশাস্ত্র মতে, বারের নামগুলি শুভ ও অশুভ গ্রহের সঙ্গে যুক্ত। যেমন— শুভ গ্রহ রবি ও সোমবারে দেবীর বাহন হয় ‘গজ’ (হাতি), যা সুবৃষ্টি ও সমৃদ্ধির প্রতীক। অন্য দিকে, অশুভ প্রভাবসম্পন্ন শনি ও মঙ্গলবারে বাহন ‘ঘোটক’ (ঘোড়া), যা সমাজে অশান্তি ও ধ্বংস ডেকে আনে। বুধবারে বাহন হয় ‘নৌকা’, যার ফলে শস্যবৃদ্ধি হলেও প্লাবনের আশঙ্কা থাকে।

ব্যতিক্রমী হল বৃহস্পতি ও শুক্রবার। বৃহস্পতি ও শুক্র, এই দু’টি গ্রহকেই শুভ, কল্যাণকর ও সৌম্য গ্রহ হিসেবে গণ্য করা হয়। আপাতদৃষ্টিতে মনে হতেই পারে যে, এই দু’টি শুভ গ্রহের দিনে দেবীর আগমন বা গমনে অত্যন্ত শুভ ফল হওয়া উচিত। কিন্তু শাস্ত্র ও লোকায়ত জ্যোতিষে বৃহস্পতি ও শুক্রবারের বাহন ‘দোলা’ (পাল্কি) এবং তার ফলাফল হিসেবে ‘মড়ক’ বা মহামারির কথা বলা হয়েছে। এমন হওয়ার পিছনে কারণ হিসেবে বলা হয় যে, বৃহস্পতি প্রতিনিধিত্ব করে ‘আকাশ তত্ত্ব’ বা প্রজ্ঞার, আর শুক্র প্রতিনিধিত্ব করে ‘জল তত্ত্ব’ ও শারীরিক উপাদানের। শারদোৎসবের সময়টিতে প্রকৃতিতে বর্ষা ও শরতের মিলন ঘটে। ঋতু পরিবর্তনের জন্য সময়টি অত্যন্ত স্পর্শকাতর। শুভ গ্রহ হলেও এই দুই শক্তির প্রভাবে আবহাওয়ার দ্রুত পরিবর্তন ঘটে, যা সংক্রামক ব্যাধি ছড়ানোর জন্য অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে। মূলত এ ভাবেই গ্রহের স্বভাব ও প্রকৃতির পরিবর্তনের সঙ্গে মিলিয়ে দেবীর আসা-যাওয়ার বাহন ও তার ফলাফলের এই ধারণা-কাঠামোটি তৈরি হয়েছে।

গ্রহের গতিবিধি ও প্রকৃতির পরিবর্তনের সম্পর্ক ধরে এমন ভবিষ্যদ্বাণী করার ঐতিহ্য শুধু যে শাস্ত্রে সীমাবদ্ধ থেকেছে তা নয়, বঙ্গজীবনের অতি পরিচিত খনার বচনেও এর ব্যাপক প্রকাশ ঘটেছে। যেমন, ‘শনি রাজা মঙ্গল পাত্র/ চষো খোড়ো কেবলমাত্র’। যে বছরে অধিপতি হন শনি এবং মন্ত্রী মঙ্গল, সেই বছরে ফসল ভাল হবে না। সেই শনি ও মঙ্গলের অশুভ প্রভাবের বিশ্বাস এখানেও দেখা যায়। এই ধরনের ইঙ্গিত দেয় আর একটি খনার বচন, ‘বুধ রাজা, শুক্র তার মন্ত্রী যদি হয়/ শস্য হবে ক্ষেত্রে পুরা নাহিক সংশয়’।

এই ধরনের প্রাচীন বচন ও শ্লোকগুলির গভীরে লুকিয়ে ছিল গ্রামীণ আবহাওয়ার পূর্বাভাস ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনার এক বিশেষ লোকায়ত রূপ। এক দিকে ভারতীয় জ্যোতিষশাস্ত্রের গাণিতিক ও শাস্ত্রীয় পর্যবেক্ষণ, আর অন্য দিকে খনার বচনের মতো সাধারণ মানুষের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রত্যক্ষ জ্ঞান— এই দুইয়ের সংমিশ্রণেই প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় বাংলায় কালক্রমে গড়ে উঠেছিল আবহাওয়ার সামাজিক পূর্বাভাস ব্যবস্থা।

এই রীতির মূল চালিকাশক্তি ছিল নদীমাতৃক ও বর্ষানির্ভর বাংলার কৃষিভিত্তিক সমাজ এবং তৎকালীন আর্থ-সামাজিক বাস্তবতা। আধুনিক আবহাওয়াবিজ্ঞান, কৃত্রিম উপগ্রহ কিংবা প্রযুক্তিভিত্তিক আগাম সতর্কীকরণের ব্যবস্থার যখন প্রশ্নই ছিল না, তখন জীবন ও জীবিকা রক্ষার তাগিদেই মানুষকে প্রকৃতির সূক্ষ্ম সঙ্কেতগুলির উপর গভীর ভাবে নির্ভর করতে হত। অকালবৃষ্টি, খরা, বন্যা বা মহামারির আগাম ইঙ্গিত জানা থাকলে কৃষিসমাজ মানসিক ভাবে যেমন প্রস্তুত হত, তেমনই বাস্তব ক্ষেত্রেও জরুরি কৌশল গ্রহণ করত। কৃষিজীবী মানুষ সময়মতো বীজধান সংরক্ষণ, পর্যাপ্ত খাদ্য সঞ্চয়, গবাদি পশুর সুরক্ষা এবং বিকল্প ফসল চাষ বা ফসল কাটার সময়সূচি পরিবর্তনের মতো দূরদর্শী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে পারতেন। একই সঙ্গে, দুর্যোগের পূর্বাভাসের ফলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে খাদ্য সঙ্কট ও সামাজিক বিপর্যয় রোধের প্রাক্‌-প্রস্তুতি তৈরি হত।

এর পাশাপাশি, জনস্বাস্থ্য ও সংক্রামক ব্যাধি প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও এই ব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করত। বিশেষ করে বর্ষা ও শরতের সন্ধিক্ষণে আবহাওয়ার আর্দ্রতা ও তাপমাত্রার পরিবর্তন কী ভাবে রোগের বিস্তার ঘটায়, তা শাস্ত্র ও লোকবিশ্বাসে দেবীর বাহন ‘দোলা’ বা পাল্কির রূপক-আশ্রয়ে আভাসিত হত— সমাজকেও তা আগে থেকেই সতর্ক করে দিত।

এই পারম্পরিক জ্ঞানব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শক্তি ছিল এর সহজ প্রকাশভঙ্গি। জটিল মহাজাগতিক গণনা সাধারণ মানুষের পক্ষে বোঝা বা মনে রাখা কঠিন। তাই জ্ঞানচর্চাকে ধর্মীয় উৎসব, ছড়া, প্রাত্যহিক আচার এবং দেবীর বাহনের সঙ্গে যুক্ত করে জনসংস্কৃতির অংশ করে তোলা হয়েছিল। এর ফলে বৈজ্ঞানিক যুক্তিবোধ প্রাতিষ্ঠানিক ভাবে না জেনেও জনসমাজ প্রাত্যহিক অভিজ্ঞতা থেকে সেগুলি মেনে চলত। ফলত, এই পারম্পরিক সঙ্কেতগুলি কেবল ধর্মীয় আচার বা অলৌকিক বিশ্বাসে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বরং তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় ঝুঁকি ও বিপদাপদের সহজবোধ্য সূচক এবং দুর্যোগের সময় যৌথ সামাজিক প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তোলার কার্যকর মাধ্যম হিসেবে কাজ করত।

তবে আধুনিক সময়ের প্রেক্ষাপটে পঞ্জিকা-নির্দেশিত দেবীর বাহন ও তার ফলাফল বিশ্লেষণ করলে একটি সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই সময়ে পঞ্জিকার তথ্য এবং বাস্তব প্রাকৃতিক বা সামাজিক ঘটনাবলি পাশাপাশি রাখলে দেখা যায়, এই ভবিষ্যদ্বাণীগুলি বহু সময় মিলেছে, আবার অনেক সময় মেলেনি। বহু বছর ‘দোলা’ বা ‘ঘোটক’-এ আগমন সত্ত্বেও দেশব্যাপী কোনও মহামারি বা যুদ্ধ হয়নি, আবার বাহন ‘গজ’ হওয়া সত্ত্বেও খরার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এর পাশাপাশি, সাম্প্রতিক বিশ্বব্যাপী অস্বাভাবিক জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে প্রকৃতির চিরাচরিত ঋতুচক্র ও আবহাওয়ার ‘প্যাটার্ন’-এ যে চরম অনিশ্চয়তা দেখা যাচ্ছে, তাতে প্রাচীন শ্লোকভিত্তিক এই ধরনের পূর্বাভাস মেলানো আরও কঠিন ও জটিল হয়ে পড়েছে। জলবায়ু সঙ্কট, বিশেষ করে অসময়ের অনাবৃষ্টি বা অতিবৃষ্টির যুগে প্রকৃতির প্রাচীন সঙ্কেতগুলি বদলে যাওয়ায় শ্লোকভিত্তিক হিসাবের মেলবন্ধন ঘটানো এখন আধুনিক প্রেক্ষাপটে এক বিরাট চ্যালেঞ্জ।

প্রশ্ন উঠতে পারে, বৈজ্ঞানিক ভিত্তি দুর্বল হওয়া সত্ত্বেও মানুষ কেন এই খারাপ ভবিষ্যদ্বাণীগুলিকেই এত গভীর ভাবে মনে রাখে? এর উত্তর লুকিয়ে রয়েছে মানব-মনস্তত্ত্বের মধ্যে— বিশেষ করে ‘নেতিবাচকতার পক্ষপাত’ (নেগেটিভিটি বায়াস) এবং ‘নিশ্চিতকরণ পক্ষপাত’ (কনফার্মেশন বায়াস)-এর ধারণায়। বিবর্তনের ধারায় বেঁচে থাকার তাগিদেই মানুষের মস্তিষ্ক অনুকূল বার্তার চেয়ে প্রতিকূল বা বিপজ্জনক সঙ্কেতকে বেশি অগ্রাধিকার দেয়। কোনও ভাল পূর্বাভাস ব্যর্থ হলে মানুষ তা সহজেই ভুলে যায়, কিন্তু ২০২০-র মতো অতিমারির বছরে যখন ‘দোলা’র ভবিষ্যদ্বাণী তথা গণনা হুবহু মিলে যায়, তখন মস্তিষ্কের সেই ভীতি-স্মৃতি স্থায়ী রূপ ধারণ করে। শত শত ব্যর্থ উদাহরণের ভিড়ে এই একটি মিলই লোকবিশ্বাসের ভিত আরও মজবুত করে তোলে।

বস্তুত, অনিশ্চয়তায় ভরা প্রকৃতির বুকে দাঁড়িয়ে ভবিষ্যতের আগাম সঙ্কেত খোঁজা মানুষের এক চিরন্তন প্রবৃত্তি। তাই দেবীর বাহন কিংবা খনার বচনের হিসাবকে আধুনিক বিজ্ঞানের ধ্রুবসত্য বলে ধরে নেওয়ার যেমন সুযোগ নেই, তেমনই একে স্রেফ অন্ধবিশ্বাস বলে উড়িয়ে দেওয়াও অন্যায্য। এর আড়ালে ছিল শত শত বছরের অভিজ্ঞতালব্ধ প্রকৃতিপাঠ এবং মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে আত্মরক্ষার মরিয়া লড়াই। আধুনিকতার আলোয় এসে হয়তো এর গাণিতিক বা বৈজ্ঞানিক ভিত্তি ম্লান হয়েছে, কিন্তু মানসিক ও সামাজিক প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে যায়নি। বিজ্ঞান ও মনস্তত্ত্বের দোলাচলে দাঁড়িয়ে দুর্গোৎসবের এই লোকায়ত গণনা তাই রূপকথা পেরিয়ে আজও বঙ্গজীবনের এক অনন্য সাংস্কৃতিক দলিল।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Durga Puja Rural rituals

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy