E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

সুলভ ওষুধের অধিকার

কী ভাবে এনসিট্রেলভির ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে? মানব শরীরের সুস্থ কোষগুলিকে এক-একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও স্বয়ংক্রিয় কারখানার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা নিজস্ব জৈবিক নিয়মে কাজ করে। ভাইরাস যখন শরীরে প্রবেশ করে, তখন এই সুশৃঙ্খল কারখানার নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়।

আরণ্যক গোস্বামী

শেষ আপডেট: ০৬ জুলাই ২০২৬ ০৬:০৬

কোভিড অতিমারি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে— অজানা রোগের মোকাবিলা কেবল তাৎক্ষণিক চিকিৎসা দিয়ে হয় না, দরকার দীর্ঘমেয়াদি বৈজ্ঞানিক প্রস্তুতি। সুপারকম্পিউটার আর কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাকে কাজে লাগানোর ফলে জীববিজ্ঞানে অবিশ্বাস্য গতিতে এগোচ্ছে নতুন গবেষণার কাজ। সাম্প্রতিক উদাহরণ ‘এনসিট্রেলভির’ নামক একটি নতুন অ্যান্টি-ভাইরাল ওষুধ। এটিকে নিয়ে বিজ্ঞানী ও চিকিৎসক মহল আলোড়িত। এর কার্যকারিতার জন্যই শুধু নয়, বরং এই ওষুধের নেপথ্যে থাকা চিকিৎসাবিজ্ঞানের আধুনিক প্রযুক্তির জন্য। ভবিষ্যতের যে কোনও ভাইরাসের প্রজাতি মোকাবিলায় মানবজাতির জন্য এক নতুন ও শক্তিশালী হাতিয়ার হতে চলেছে ওষুধ তৈরির এই পদ্ধতি। এক দিকে যেমন সেই অত্যাধুনিক পদ্ধতি নিয়ে সকলের মধ্যে কৌতূহল তৈরি হয়েছে, অন্য দিকে তেমনই দেখা দিয়েছে নৈতিক প্রশ্ন— সর্বস্তরের মানুষ এই আবিষ্কারের সুফল পাবেন তো? কোভিডের টিকা নিয়ে ধনী ও দরিদ্র দেশগুলির মধ্যে যে টানাপড়েন দেখা গিয়েছিল, তা এখনও ভোলেনি মানুষ। এনসিট্রেলভির তৈরির প্রযুক্তি সকলের নাগালের মধ্যে আনার দরকার কি না, সেই নিয়ে বিতর্ক শুরু হয়েছে।

কী ভাবে এনসিট্রেলভির ভাইরাসকে প্রতিরোধ করে? মানব শরীরের সুস্থ কোষগুলিকে এক-একটি অত্যন্ত সুশৃঙ্খল ও স্বয়ংক্রিয় কারখানার সঙ্গে তুলনা করা যায়, যা নিজস্ব জৈবিক নিয়মে কাজ করে। ভাইরাস যখন শরীরে প্রবেশ করে, তখন এই সুশৃঙ্খল কারখানার নিয়ন্ত্রণ দখল করে নেয়। কোষের ভিতরের যন্ত্রপাতি ব্যবহার করে নিজের অসংখ্য প্রতিলিপি তৈরি করতে শুরু করে। এই প্রক্রিয়ায় ভাইরাসের কিছু বিশেষ প্রোটিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যেগুলিকে বলা হয় ‘প্রোটিয়েজ’। সহজ কথায়, এটি হল এক ধরনের ‘জৈবিক কাঁচি’। ভাইরাস যখন নিজের প্রতিলিপি বানানোর জন্য লম্বা প্রোটিনের শিকল তৈরি করে, তখন এই প্রোটিয়েজ নামক কাঁচিটি সেই শিকলকে কেটে ছোট ছোট টুকরো করে ভাইরাসের পূর্ণাঙ্গ শরীর গঠনে সাহায্য করে। যদি কোনও উপায়ে প্রোটিয়েজকে অকেজো করা যায়, তা হলে ভাইরাসের প্রতিলিপি তৈরির প্রক্রিয়া থমকে যায়, সংক্রমণের তীব্রতা দ্রুত কমতে শুরু করে। এনসিট্রেলভির-এর প্রধান লক্ষ্যবস্তু হল ভাইরাসের প্রোটিয়েজ।

কোভিড অতিমারির শুরুর দিকে ‘নিরম্যাটরেলভির’ নামক একটি ওষুধ বেশ সাড়া ফেলেছিল, যা একই পদ্ধতিতে কাজ করত। কিন্তু সেই ওষুধটিকে রক্তে দীর্ঘক্ষণ কার্যকর রাখতে ‘রিটোনাভির’ নামক আর একটি বুস্টার ওষুধের সঙ্গে মিলিয়ে রোগীকে খাওয়াতে হত। এই জোড়া ওষুধে রোগীর শরীরে গুরুতর পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ঝুঁকি বাড়ত এবং এর স্বাদও ছিল অত্যন্ত তেতো। জাপানি ওষুধ প্রস্তুতকারী একটি প্রতিষ্ঠান এর সমাধানে আধুনিক একটি বৈজ্ঞানিক পথ বেছে নেয়। কোটি কোটি রাসায়নিক উপাদান নিয়ে বছরের পর বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষার দীর্ঘ প্রথাগত পথ এড়িয়ে এই সংস্থাটি ‘কম্পিউটেশনাল কেমিস্ট্রি’ বা গণনাভিত্তিক রসায়নের উপর ভরসা করে এগোয়। সুপারকম্পিউটার এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ব্যবহার করে কোটি কোটি সম্ভাব্য রাসায়নিক অণুকে ভার্চুয়ালি পরীক্ষা করে দেখেন বিজ্ঞানীরা। উদ্দেশ্য ছিল এমন একটি নিখুঁত আণবিক চাবি খুঁজে বার করা, যা ভাইরাসের প্রোটিয়েজ-এর ভিতর ঢুকে সেটিকে চিরতরে ‘লক’ করে দিতে পারে। এ ভাবেই তৈরি হয় এনসিট্রেলভির। ওষুধটির আণবিক গঠন এতটাই নিখুঁত যে, এটি রক্তে নিজে থেকেই দীর্ঘক্ষণ সক্রিয় থাকতে পারে, কোনও বাড়তি ওষুধের প্রয়োজন পড়ে না।

প্রথাগত পদ্ধতিতে ল্যাবরেটরি থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষের প্রেসক্রিপশন পর্যন্ত একটি ওষুধ পৌঁছতে সাধারণত ১০-১২ বছর লেগে যায়, খরচ হয় কয়েকশো কোটি ডলার। কম্পিউটেশনাল বায়োলজি এই দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়াটিকে অবিশ্বাস্য রকম সংক্ষিপ্ত করতে পেরেছে। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন-এ প্রকাশিত হয়েছে এনসিট্রেলভির-এর পরীক্ষামূলক প্রয়োগের ফলাফল। পরীক্ষাটি চালানো হয় ২,৩৮৭ জন সম্পূর্ণ সুস্থ মানুষের উপর, যাঁরা সদ্য কোভিড-আক্রান্ত রোগীর সংস্পর্শে এসেছিলেন। দেখা গেল, যাঁদের ওষুধটি দেওয়া হয়নি (প্লাসেবো গ্রুপ), তাঁদের মধ্যে ৯ শতাংশ মানুষ কোভিডে আক্রান্ত হয়েছেন। যাঁরা নিয়মিত এনসিট্রেলভির গ্রহণ করেছিলেন, তাঁদের ক্ষেত্রে আক্রান্ত মাত্র ২.৯ শতাংশ। অর্থাৎ, এই ওষুধটি সংক্রমণ ছড়ানো ঠেকাতে প্রায় ৬৭ শতাংশ কার্যকর।

গত দুই দশকে করোনাভাইরাস পরিবারভুক্ত সার্স, মার্স, কোভিড-১৯ প্রভৃতি তিন বার বিশ্ব জুড়ে বড় ধরনের মহামারি ও সামাজিক বিপর্যয় সৃষ্টি করেছে। এই ভাইরাস পরিবারকে মোকাবিলা করার নতুন দিশা দেখাল এনসিট্রেলভির। এর পর কোনও অজানা ভাইরাস ছড়ালে চিকিৎসকদের আর শূন্য থেকে লড়াই শুরু করতে হবে না। এনসিট্রেলভির-এর আণবিক চাবির নকশাকে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করে বিজ্ঞানীরা অতি দ্রুত নতুন ভাইরাসের উপযোগী ওষুধ প্রস্তুত করতে পারবেন। নতুন পেটেন্ট-করা ওষুধের অত্যধিক উৎপাদন খরচ এবং বড় বড় ওষুধ নির্মাতার একচেটিয়া অধিকারের কারণে উন্নয়নশীল দেশের মানুষের কাছে পৌঁছতে অনেক দেরি হয়। অথচ, অতিমারির শিক্ষা, বিশ্বের কোনও একটি অংশকে অরক্ষিত রাখলে কোনও অংশই নিরাপদ থাকে না।

যে পদ্ধতিতে তৈরি হয়েছে এনসিট্রেলভির-এর মতো নয়া দিগন্তের ওষুধ, তাকে উন্মুক্ত করা দরকার জগতের কাছে।

কম্পিউটেশনাল বায়োলজি, ইউনিভার্সিটি অব আরকানস’

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Virus Health care Unknown diseases Scientific Research

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy