এ দেশে ছাত্রছাত্রীদের হয়ে কথা বলার কেউ নেই। বাড়িতে অভিভাবক চাপ দেন, কখনও কখনও আর্থিক অভাব এতটাই যে নিজেকে যেচে চাপ নিতে হয়। অথচ পড়াশোনাই তো একমাত্র অস্ত্র, জীবনে দাঁড়ানোর জন্য। ক্লাস টুয়েলভ-এর পর কেরিয়ার গড়ার নানান পথ থাকে। তার মধ্যে সবচেয়ে জনপ্রিয় এবং আতঙ্ক সৃষ্টি করা পথ হল নিট (ইউজি)। আগে দেশের বিভিন্ন রাজ্য তাদের নিজস্ব মেডিক্যাল প্রবেশিকা পরীক্ষা নিত, পাশাপাশি এমস-এর মতো স্বনামধন্য প্রতিষ্ঠানগুলির নিজস্ব আলাদা পরীক্ষা ছিল। যেমন, আমাদের পশ্চিমবঙ্গে ডব্লিউবি-জেইই একই সঙ্গে মেডিক্যাল এবং এঞ্জিনিয়ারিং প্রবেশিকা নিত। এই রকম বিচ্ছিন্ন ব্যবস্থার বদলে মেডিক্যাল কাউন্সিল অব ইন্ডিয়া (এমসিআই) ও তৎকালীন ইউপিএ সরকার ২০১২ সাল থেকে এক ছাতার নীচে ‘নিট’ পরীক্ষা চালুর উদ্যোগ করে।
কিন্তু পশ্চিমবঙ্গ, তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, কর্নাটক ও গুজরাতের মতো রাজ্যের তীব্র আপত্তির মুখে তা এক বছর পিছিয়ে যায়। রাজ্যগুলির মূল অভিযোগ ছিল, এমসিআই-এর প্রস্তাবিত সিলেবাসের সঙ্গে তাদের আঞ্চলিক বোর্ডের পাঠ্যক্রমের মধ্যে বিস্তর ফারাক। অবশেষে ৫ মে ২০১৩ সালে দেশ জুড়ে প্রথম বার নিট অনুষ্ঠিত হল— কিন্তু বিতর্ক থামল না। ১৮ জুলাই ২০১৩ তারিখে সুপ্রিম কোর্ট নিট-কে ‘অসাংবিধানিক’ ঘোষণা করে বাতিল করে দিল, এবং জানাল যে এমসিআই এই ভাবে রাজ্য ও কলেজগুলির ভর্তি প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ করতে পারে না। ফলে কেন্দ্র পুনরায় পুরনো সর্বভারতীয় প্রবেশিকা ব্যবস্থা এআইপিএমটি-তে ফিরে যেতে বাধ্য হল।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৬ সালে পরিস্থিতির মোড় ঘোরে। ১১ এপ্রিল ২০১৬-তে সুপ্রিম কোর্টের ৫ বিচারপতির সংবিধান বেঞ্চ ২০১৩ সালের রায়টিকে পুনর্বিবেচনার জন্য স্থগিত করে এবং ‘নিট’ আয়োজনের অনুমতি দেয়। সেই অনুযায়ী ২০১৬ সালের ১ মে-র এআইপিএমটি-র সূত্রে ‘নিট পর্ব ১’ এবং ২৪ জুলাই ‘নিট পর্ব ২’ আয়োজিত হয়। এর পর সাময়িক সংশয় কাটাতে কেন্দ্র প্রথমে ২৪ মে ২০১৬-তে একটি অর্ডিন্যান্স আনে এবং ২০১৬-র অগস্টে সংসদে আইন পাশ করে ‘নিট’-কে বাধ্যতামূলক করে। ২০১৭ সাল থেকে ইংরেজি ও হিন্দির পাশাপাশি বাংলা, তামিল, তেলুগু-সহ একাধিক আঞ্চলিক ভাষায় পরীক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়, আঞ্চলিক বোর্ডের শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে। শুরুর দিকে পরীক্ষা পরিচালনার দায়িত্বে ছিল সিবিএসই। ২০১৭ সালের শেষে ‘ন্যাশনাল টেস্টিং এজেন্সি’ বা এনটিএ গঠিত হয়।
এই বছর ৩ মে এই পরীক্ষার পরই বিভিন্ন কেন্দ্র থেকে প্রশ্নপত্র ফাঁসের অভিযোগ উঠতে শুরু করে। এনটিএ তদন্তের নির্দেশ দেয় এবং শেষে এই পরীক্ষা বাতিল ঘোষণা করে। ঘটনার তদন্তভার সিবিআই-এর হাতে তুলে দেওয়া হয়। ২১ জুন দেশ জুড়ে পুনরায় পরীক্ষা (‘রি-নিট’) হয়।
প্রসঙ্গত, এনটিএ পরিচালিত অনেক পরীক্ষাতেই অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বিরাট। ২০২৪ সালের নিট-ইউজি পরীক্ষায় এক সঙ্গে ৬৭ জন পরীক্ষার্থী প্রথম স্থান অর্জন করে পূর্ণ নম্বর (৭২০) পায়, সন্দেহজনক ভাবে একই পরীক্ষাকেন্দ্রের একাধিক শিক্ষার্থী শীর্ষস্থান পায় এবং অন্যায্য ভাবে ‘গ্ৰেস মার্কস’ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে, যার ফলে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশে ১৫৬৩ জন পরীক্ষার্থীর পরীক্ষা বাতিল হয়। ২০২৪ সালের জুনে ইউজিসি-নেট পরীক্ষার মাত্র ২৪ ঘণ্টার মধ্যে ডার্কনেটে প্রশ্ন ফাঁসের প্রমাণ আসায় পুরো পরীক্ষাটিই বাতিল হয়। এর ঠিক পরপরই লজিস্টিকস ও সম্পদ সঙ্কটের অজুহাতে সিএসআইআর ইউজিসি-নেট পরীক্ষাও শেষ মুহূর্তে স্থগিত করে দেওয়া হয়। এ ছাড়া, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এঞ্জিনিয়ারিং পরীক্ষা জেইই মেনস-এ প্রায় প্রতি বছরই সার্ভার ডাউন, কম্পিউটার বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। প্রশ্নফাঁস ও প্রযুক্তিগত ত্রুটি— সব মিলিয়ে সর্বভারতীয় স্তরে পরীক্ষা পরিচালনায় এনটিএ-এর দক্ষতা ও নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে দেশ জুড়ে তীব্র ক্ষোভ তৈরি হয়।
স্কুলগুলিতে ভাল করে পড়াশোনা হয় না। স্কুলের পড়াশোনার ধাঁচের সঙ্গে কম্পিটিটিভ পরীক্ষার এতটাই পার্থক্য থাকে যে, ছাত্রছাত্রীরা বাধ্য হয় কোচিং নিতে। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে থাকা কোচিং সেন্টারগুলোতে মোটা টাকার বিনিময়ে শিক্ষার্থীকে ‘তৈরি’ করে দেওয়া হয়। দিনে সাত থেকে আট ঘণ্টা করে ক্লাস, দফায় দফায় মক টেস্ট, বিরাট টাকার বিনিময়ে। এক বছর ধরে অমানুষিক পরিশ্রম এবং রীতিমতো ঘর বন্ধ করে পড়াশোনার পরেও ফল কী রকম হবে, তা নিয়ে সংশয় থাকে।
পরিসংখ্যান বলছে, প্রতি বছর গড়ে ২০ থেকে ২৪ লক্ষ (এ বছর ২২ লক্ষ) পরীক্ষার্থী ‘নিট’-এ বসে। অথচ, সারা দেশে সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে মোট এমবিবিএস আসন রয়েছে মাত্র ১.৩৬ লক্ষের কাছাকাছি, যার মধ্যে সরকারি সিট ৬৩ হাজার। ফলে একটি সরকারি মেডিক্যাল আসনের জন্য গড়ে ৩৫-৪০ জন শিক্ষার্থীর মধ্যে যে পরিমাণ লড়াই চলে, তা এই পরীক্ষার প্রতিযোগিতাকে মারাত্মক কঠিন করে তোলে। এ-হেন পরিস্থিতিতে প্রবেশিকা পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁস হতে থাকলে ছাত্রছাত্রীদের মনোবল ভেঙে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট নয় কি?
‘নিট’ বাতিল এবং ‘রি-নিট’-এর মধ্যবর্তী সময়ে কমপক্ষে বারো জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। কোন অমানুষিক চাপ এবং অনিশ্চয়তা থেকে কেউ নিজের জীবন শেষ করে দেওয়ার কথা ভাবতে পারে, সেটা বোঝা কঠিন নয়। এমন গুরুতর পরিস্থিতিতে তাই যে এই শিক্ষার্থীদের হয়ে কথা বলবে, তাদেরই যুবসমাজ আঁকড়ে ধরবে এটাই স্বাভাবিক।
দিশাহীন শিক্ষাব্যবস্থা ও সীমাহীন প্রত্যাশা— এই দুইয়ের মাঝে পড়ে ছাত্রছাত্রীদের অবস্থা ভয়াবহ। শিক্ষাব্যবস্থার রন্ধ্রে রন্ধ্রে দুর্নীতি। এই ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তন দরকার। তাই, কথা বলা খুব দরকার। আন্দোলনও।