মুহূর্তের ইচ্ছায় অনেকখানি কেনাকাটা করে ফেলা, পরে তা নিয়ে আফসোস করা, এবং তার পরে আবারও গোটা বিষয়টির পুনরাবৃত্তি— একুশ শতকের ই-কমার্সেরযুগে এই প্রবণতা এমনই বেড়েছে যে, রীতিমতো তাত্ত্বিক গবেষণা হচ্ছে তা নিয়ে। কেন এই ‘ইম্পালসিভ শপিং’-এর প্রবণতা ক্রমবর্ধমান, তার প্রথম উত্তর বিশেষজ্ঞদের মতে ‘ডোপামিন ক্ষরণ’। চলতি কথায়, ডোপামিন হল সুখের ‘নিউরোট্রান্সমিটার’— কোনও জয়ের অথবা আনন্দের ঘটনার ক্ষেত্রে মগজ এই রাসায়নিক ক্ষরণ করে। অনলাইন শপিংও অনেক মানুষের কাছেই একরকম জয়ের অনুভূতি তৈরি করে— অনেক বেশি ছাড়ে কোনও জিনিস কেনা, অথবা অন্য কাউকে কিছু ব্যবহার করতে দেখে তা কেনার যে ইচ্ছা তৈরি হয়, তা পূরণ হওয়া তাঁদের কাছে বিজয় বা সাফল্যের সমতুল্য। গবেষণা বলছে, পূর্বপ্রস্তুতি ব্যতিরেকেই হঠাৎ করে অনলাইন কেনাকাটার প্রবণতা বাড়ে রাতের দিকে। নেহাত সমাপতন নয়। সারা দিনের বহুবিধ কাজে মগজের উপরে চাপ পড়তে থাকে— তাতে মগজের ব্যান্ডউইথ, অর্থাৎ বিবেচনা করার ক্ষমতা কমে যায়। ঠিক সেই সময়েই সুখের সম্ভাবনা তৈরি হলে তাকে যুক্তি দিয়ে বিবেচনা করার, প্রয়োজন-অপ্রয়োজন খতিয়ে দেখার ক্ষমতা তুলনায় কম থাকে। তারই ফল, সুখের সন্ধানে যাত্রা।
এই যাত্রার পিছনে প্রযুক্তির ভূমিকাটি বিপুল। নিজের বসার ঘর থেকে একটি পা-ও বাইরে না ফেলেই যে গোটা দুনিয়ার সব পণ্যই কিনে ফেলা সম্ভব হয়েছে, প্রযুক্তির সেই অবদান নিয়ে নতুন করে কিছু বলার নেই। কিন্তু, তা সূচনাবিন্দু মাত্র। প্রথম কথা, দোকানের ‘অপরিচিত’ পরিবেশে মস্তিষ্ক যতখানি সতর্ক থাকে, নিজের ঘরে অতি চেনা পরিসর সেই সতর্কতার দাবি করে না। দ্বিতীয়ত, কৃত্রিম মেধা প্রতিটি ক্রেতাকে ‘চেনে’— কার সামনে কোন পণ্যটি ঠিক কী ভাবে সাজিয়ে দিলে তার কেনার সম্ভাবনা বাড়ে, তার নিখুঁত হিসাব আছে। ফলে, মধ্যরাতে ক্লান্ত মস্তিষ্কের সামনে একের পর এক চলে আসতে থাকে এমন পণ্যের সম্ভার, যাতে মনের আকৃষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। তৃতীয়ত, এখন প্রায় সব অ্যাপই ক্রেতার ক্রেডিট কার্ড বা ব্যাঙ্কের তথ্য জমা রাখে, ফলে নতুন কেনাকাটার ক্ষেত্রে আলাদা করে তথ্য দেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না— ফলে, মাথার পরিশ্রম আরও কমে। কেনার ইচ্ছায় বাধা পড়ার সম্ভাবনা কমে। চতুর্থত, বিভিন্ন ভাবে বাড়িয়ে চলা হয় সেই সব পণ্যের ‘অভাব’-এর অনুভূতি— কখনও সীমিত সময়ের ‘অফার’ দেওয়া হয়; কখনও আবার জানানো হয় যে, আর মাত্র কয়েকটি পণ্যই অবশিষ্ট রয়েছে কেনার জন্য। মস্তিষ্ক যাকে আকর্ষণীয় জ্ঞান করছে, তা হাতে পাওয়ার সুযোগ যে আর খানিক ক্ষণের মধ্যেই ফুরিয়ে যাবে, অবচেতনে এ কথাটি গেঁথে দিতে পারলে কেনার তাগিদ আরও তীব্র হয়। ইদানীং প্রায় সব অনলাইন বিপণিতেই আরও একটি কথা জানানো হয়— ‘গত এক মাসে অমুক সংখ্যক ক্রেতা এই পণ্যটি কিনেছেন’। অর্থাৎ, পণ্যটির চাহিদা আছে, এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা আছে। এ ক্ষেত্রে সমাজমাধ্যমও একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ‘ইনফ্লুয়েন্সার’-রা পরিচিতজনের ভঙ্গিতে কোনও একটি বিশেষ পণ্যের গুণাগুণও জানাতে থাকেন। তাঁদের এই ভঙ্গিটি পড়ে পাওয়া নয়। দীর্ঘ দিন ধরে মুঠোফোনের পর্দায় তাঁদের উপস্থিতি, এবং ব্যক্তিগত ভঙ্গিতে কথোপকথন তাঁদের করে তোলে ‘পরিচিত মুখ’। এক আশ্চর্য একমুখী ব্যক্তিগত সম্পর্ক, যেখানে দর্শক নিজের মনেই এই ইনফ্লুয়েন্সারদের ‘আপন’ ভাবতে থাকেন। বিপণন ঠিক তারই সুবিধা নেয়।
মনের এই নিয়ন্ত্রণহীনতা আটকানোর দায় মনের উপরেই ছেড়ে দিলে মুশকিল। বস্তুত, দুর্বল মুহূর্তে গুরুত্বপূর্ণ কোনও সিদ্ধান্ত গ্রহণের দায় যাতে মনের উপরে না থাকে, সেই ব্যবস্থা করাই বরং এ ক্ষেত্রে একমাত্র পথ। তার একটি উপায় হতে পারে নিজের জন্য নিয়ম স্থির করা— কোনও পণ্য পছন্দ হলে অন্তত তিন দিন অপেক্ষা করতে হবে; তার পরও যদি কেনার ইচ্ছা অপরিবর্তিত থাকে, কেবলমাত্র তখনই তা কেনা যাবে। গবেষণা বলছে, এই পদ্ধতি অনুসরণ করলে তাৎক্ষণিক ক্রয়ের প্রবণতা বহুলাংশে কমে যায়, কারণ অধিকাংশ ইচ্ছাই তিন দিন পর্যন্ত টেকে না। ইদানীং এমন কিছু অ্যাপ তৈরি হয়েছে, যেখানে ইচ্ছামতো ‘কেনাকাটা’ করা যায়, কিন্তু তার জন্য কোনও টাকাপয়সা দিতে হয় না, আর পণ্যটিও আসে না! শুধু কেনাকাটার অনুভূতিটি মেলে সেখানে। ইচ্ছা নিয়ন্ত্রণের এটাও এক ধরনের উপায়। তবে, সেরা উপায়টি হল, মন যখন ক্লান্ত, তখন ফোনটিকে দূরে রাখা। প্রলোভনের পথটিকে রোধ করতে পারলে প্রলুব্ধ হওয়ার সম্ভাবনা কমবেই।