সম্প্রতি শীর্ষ আদালত একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রায়ে দু’টি বিষয় স্পষ্ট করেছে। আন্তর্জালে শিশুদের যৌন শোষণ ও নিপীড়নমূলক উপাদান ছড়ানো বন্ধ করতে কঠোর ব্যবস্থা করতে হবে। একই সঙ্গে ইন্টারনেট ব্যবহারকে মৌলিক অধিকার রূপে স্বীকৃতিও দিয়েছে আদালত। সংবিধানের ১৯ ও ২১ নম্বর অনুচ্ছেদে বাক্ ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং জীবনের ও ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকার নিশ্চিত করা হয়েছে। আদালতের বক্তব্য, এই অধিকার শিশুদেরও প্রাপ্য। এবং, তাদের নিরাপত্তার প্রশ্ন ও ইন্টারনেট ব্যবহারের অধিকার পরস্পরবিরোধী নয়। প্রকৃতপক্ষে, শিশুদের নয়, আটকাতে হবে তাদের যারা এই ক্ষতিকর বিষয় তৈরি করে ও ছড়ায়। এই অবস্থান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ইন্টারনেট কিন্তু শুধুই বিনোদনের মাধ্যম নয়। বহু শিশুর কাছে তা পড়াশোনা, তথ্য আহরণ এবং যোগাযোগেরও উপায়। বিশেষত, প্রত্যন্ত এলাকায় তা বহির্বিশ্বের বাতায়ন-স্বরূপ। বিভিন্ন দেশ যখন শিশুর সমাজমাধ্যম ব্যবহার নিয়ে অতি-রক্ষণশীল হয়ে উঠেছে, তখনই আদালত শিশুদের প্রতি আরোপিত বিধিনিষেধের বিপক্ষে অবস্থান স্পষ্ট করেছে।
পরিবর্তে, শিশুদের প্রতি হিংসাত্মক হতে পারে, এমন উপাদান শনাক্ত করতে জাতীয় পর্যায়ে তথ্যভান্ডার তৈরির নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট। প্রকৃতপক্ষে, দূষক উপাদানের উপস্থিতির সমস্যা নিয়ে সিনেমাও অতীতে বহু জবাবদিহির মুখে পড়েছে। সিনেমার ক্ষেত্রে কোন বিষয়বস্তু শিশুদের জন্য অনুপযুক্ত, তা চিহ্নিত করতে বয়স-উপযোগী শ্রেণিবিভাগ ও সতর্কবার্তার ব্যবস্থা রয়েছে। আন্তর্জালের ক্ষেত্রেও এই ধরনের ব্যবস্থা জরুরি। এমন তথ্যভান্ডার প্রস্তুত প্রয়োজন যেখানে নির্যাতন-সম্ভাব্য উপাদানকে চিহ্নিত করে বারে বারে ছড়িয়ে পড়া থেকে রোখা যাবে। আদালত বলেছে, কোনও ছবি বা ভিডিয়ো ক্ষতিকর কি না, তা চিহ্নিত করার আগে একাধিক প্রশিক্ষিত ব্যক্তি তা পরীক্ষা করবেন, যাতে নির্দোষ বিষয়বস্তু নিষেধাজ্ঞার কোপে না পড়ে। এই যাচাইয়ের নিয়ম, পদ্ধতি অবশ্যই স্পষ্ট হতে হবে; তথ্যভান্ডারের অপব্যবহার রুখতে সুপরিকল্পিত প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। পাশাপাশি, নির্দেশ অমান্যের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বা সংস্থা যাতে দণ্ড ও জরিমানার মুখে পড়ে, সেই ব্যবস্থাও কার্যকর রাখতে হবে।
ক্ষতিকর বিষয়বস্তু নিয়ন্ত্রণ, সতর্কতামূলক বিজ্ঞপ্তি, অভিভাবকের সম্মতি, ‘চাইল্ড-মোড’ ইত্যাদির গুরুত্ব স্বীকার করে শিশু নিরাপত্তার প্রশ্নে আদালতের অবস্থান যেমন সমর্থনযোগ্য, তেমনই অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ ইন্টারনেটকে মৌলিক অধিকার হিসাবে স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়টিও। প্রতিবাদ সামালের সময় ইন্টারনেট বন্ধ করে দেওয়া প্রশাসনের পছন্দের রাস্তা। কিন্তু ইন্টারনেট বন্ধ করার অর্থ শুধু সমাজমাধ্যম রুদ্ধ করা নয়। এতে পড়াশোনা, জরুরি তথ্যের নাগাল পাওয়া, মানুষে মানুষে যোগাযোগ— স্বাভাবিক জনজীবনেও প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয়। অতএব, ইন্টারনেটের অধিকার নিয়ে নাগরিকের আদালতের দ্বারস্থ হওয়ার সুযোগ আরও বাড়ল। কিন্তু এই নির্দেশ কতটা বাস্তবায়িত হবে তা নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। আগেও কয়েকটি মামলায় আদালত ইন্টারনেট বন্ধের ক্ষেত্রে কিছু নিয়ম ধার্য করেছিল, যেগুলি বিশেষ মান্য হয়নি। শিশুসুরক্ষায় আপস নয়, কিন্তু নাগরিকের অধিকার রক্ষাও রাষ্ট্রেরই দায়িত্ব।