লাতিন আমেরিকার বৃহত্তম গণতন্ত্র বলে পরিচিত ব্রাজ়িলের রাজনীতিতে নাটকীয় পটপরিবর্তন ঘটল সম্প্রতি। প্রথম পর্বের ভোটে সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে পড়েও, দ্বিতীয় পর্বের রান-অফে কট্টর ডানপন্থী ফ্লাভিয়ো বোলসোনারোকে পরাজিত করে চতুর্থ বার ব্রাজ়িলের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হলেন প্রবীণ বামপন্থী নেতা লুইজ় ইনাসিয়ো লুলা দা সিলভা। এর ফলে, লাতিন আমেরিকা জুড়ে রক্ষণশীল শক্তির জয়জয়কার এবং পাশাপাশি আর্জেন্টিনা, চিলি, পেরু ও কলম্বিয়ায় চরমপন্থীদের সাম্প্রতিক উত্থানের মুখে বড় ধাক্কা দিলেন লুলা। তাঁর এই জয় মেক্সিকো ও উরুগুয়ের বামপন্থী সরকারকে একঘরে হয়ে পড়ার হাত থেকেও বাঁচাল বলা চলে, বোলসোনারো জয়ী হলে নিশ্চিত ভাবেই যা ঘটত। লুলা তাঁর বিজয়ী ভাষণে স্পষ্ট করেছেন, তিনি কোনও দেশের ‘পিছনের উঠোন’ হয়ে থাকবেন না— যা মূলত আমেরিকার আধিপত্যকামী ‘ডনরো ডকট্রিন’-এর বিরুদ্ধে এক প্রকাশ্য প্রতিরোধ।
ব্রাজ়িলের অভ্যন্তরীণ তীব্র বিভাজনের মধ্যেই দেশের শাসনভার হাতে নিচ্ছেন লুলা। প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বোলসোনারোর সময় আমাজ়ন অরণ্যের উজাড় হয়ে যাওয়া, কোভিড অতিমারির সময় চরম অব্যবস্থাপনা ও অর্থনৈতিক মন্দা দেশকে বিপর্যস্ত করে তুলেছিল। এই পরিস্থিতিতে এক বৃহৎ ও সর্বদলীয় রাজনৈতিক জোট গড়ে তোলার মাধ্যমে জয় নিশ্চিত করার পাশাপাশি, অভ্যন্তরীণ সামাজিক মেরুকরণ কিছুটা হলেও সামাল দিতে পেরেছেন লুলা। পাশাপাশি, ভূ-রাজনীতিতে আমেরিকার চাপ সামলানোও তাঁর জন্য ছিল বড় চ্যালেঞ্জ। অতীত ইতিহাস বলছে, লাতিন আমেরিকায় ওয়াশিংটনের একচ্ছত্র প্রভাব ও চাপ সব সময়ই ছিল। তবে লুলা অত্যন্ত বুদ্ধিমত্তার সঙ্গে চিনের সঙ্গে ব্রাজ়িলের মজবুত অর্থনৈতিক সম্পর্ক টিকিয়ে রেখেছেন, আবার একই সময়ে জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে আমেরিকার সঙ্গেও যৌথ ভাবে কাজ করার বার্তা দিয়েছেন। লুলার এই জয়ের সমান্তরালে পূর্ব ইউরোপের সার্বিয়ার সাধারণ নির্বাচনকে মিলিয়ে দেখলে যে বৈশ্বিক প্রবণতা নজরে আসে তা লক্ষণীয়। সার্বিয়ায় দুর্নীতি ও কর্তৃত্ববাদী শাসনের বিরুদ্ধে দীর্ঘ দু’বছর ধরে চলা ছাত্র আন্দোলনের জেরে প্রায় ১৪ বছর ধরে ক্ষমতায় থাকা ‘পপুলিস্ট’ শাসক আলেকজ়ান্দার ভুচিচ পরাজয় স্বীকারে বাধ্য হয়েছেন। সার্বিয়ার এই ছাত্র-নেতৃত্বাধীন ‘স্টুডেন্ট লিস্ট’-এর জয় এবং ব্রাজ়িলে লুলার জয়ের নেপথ্যে থাকা যুবশক্তির জাগরণ হয়তো একই সূত্রে গাঁথা— স্বৈরতান্ত্রিক প্রবণতাকে রুখে দিতে উদ্যত তরুণ প্রজন্মের সম্মিলিত প্রতিরোধ।
ভূ-রাজনীতির প্রেক্ষিতে লুলার চতুর্থ মেয়াদের তাৎপর্য অপরিসীম। ডোনাল্ড ট্রাম্পের জন্য এ এক বড় কূটনৈতিক ধাক্কাও: লাতিন আমেরিকায় আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একচ্ছত্র আধিপত্য বিস্তারে লুলা দেওয়াল হয়ে দাঁড়ালেন। অন্য দিকে, ‘গ্লোবাল সাউথ’-এর দেশগুলির কাছে তিনি এক নতুন ভরসার প্রতীকও হয়ে উঠলেন। ভারতের ক্ষেত্রেও এই জয় দ্বিপাক্ষিক ও বহুপাক্ষিক সম্পর্কের নতুন দিগন্ত উন্মোচন করবে। শ্লথ অর্থনীতির পাশাপাশি ক্রয়ক্ষমতা সংক্রান্ত উদ্বেগ, উচ্চ সুদের হার ও ক্রমবর্ধমান পারিবারিক ঋণের জেরে লুলার পথ মসৃণ হবে না। তবুও, এই নির্বাচনই প্রমাণ, ক্ষমতার চূড়ান্ত উৎস জনগণ। এই জয় প্রগতিশীল রাজনীতির পালে নতুন হাওয়া জোগায় কি না, সেটাই দেখার।