ছাত্রনেত্রী নেহা বোরাকে মুচলেকা দিতে বলা ন্যায্য কি না; অথবা ভারতীয় ন্যায়সংহিতা যে ভঙ্গিতে একটি নির্দিষ্ট পদমর্যাদার ঊর্ধ্বে থাকা পুলিশকর্মীদের হাতেই এই মুচলেকা আদায়ের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ভার তুলে দিয়েছে, তা বিচার বিভাগ ও শাসন বিভাগের মধ্যে কাঙ্ক্ষিত দূরত্বটিকে ঝাপসা করে দেয় কি না, মূলত আইন-কেন্দ্রিক এই প্রশ্নগুলির গুরুত্ব বিপুল। ন্যায়সংহিতার বিধান অনুসারে, কারও আচরণে শান্তিভঙ্গ ঘটবে, এমন আশঙ্কা থাকলেই কোনও এগ্জ়িকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট তাঁকে অনধিক এক বছর সময়ের জন্য শান্তিরক্ষার মুচলেকা দিতে নির্দেশ দিতে পারেন। তবে, ১৯৭০ সালের মধু লিমায়ে মামলায় সুপ্রিম কোর্টের যে অবস্থান এই শান্তিরক্ষার মুচলেকার ব্যবস্থাকে ন্যায্য গণ্য করেছে, এই ক্ষেত্রে সেই রায়ে উল্লিখিত নির্দেশিকা মানা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। শাসকদের বিরুদ্ধে পক্ষপাতদুষ্টতার অভিযোগও প্রণিধানযোগ্য। কেউ ‘গুলি মারা’র হুমকি দিলে শান্তিভঙ্গ হয় না, কিন্তু দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের ভোটাধিকার রক্ষার দাবিতে কেউ বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে কেন শান্তিভঙ্গ হয়— এই প্রশ্নের উত্তর শাসকদের থেকে মিলবে, সে আশা এখন অলীক। এমন গুরুতর প্রশ্নের উত্তর না পাওয়া গণতন্ত্রের পক্ষে অতি দুঃসংবাদ।
অস্বীকার করার উপায় নেই, নেহা এই মুচলেকা দিতে অস্বীকার করে খুলে দিয়েছেন একটি বৃহত্তর প্রশ্নের পরিসর— এই মুচলেকা কার শান্তিরক্ষার্থে? রাষ্ট্রশক্তির, না কি নাগরিকের? ব্রিটেনে এই আইনের সূত্রপাত সম্ভবত একাদশ বা দ্বাদশ শতকে। তবে, রাজা তৃতীয় এডওয়ার্ডের আমলে, ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর পরবর্তী জন-অসন্তোষ নিয়ন্ত্রণে এর ব্যাপক ব্যবহারের সূচনা। রাজতন্ত্র হোক বা উপনিবেশ, এই আইন রক্ষা করেছে রাজা এবং তার স্নেহধন্যদের স্বার্থই— তাদেরই জন্য ‘শান্তি’ নিশ্চিত করেছে। কেবল ভারতে নয়, দুনিয়াব্যাপী ভূতপূর্ব ব্রিটিশ উপনিবেশগুলি এই আইন পেয়েছে ঔপনিবেশিক উত্তরাধিকার সূত্রে। কেনিয়ার মতো ব্যতিক্রমী কয়েকটি দেশ পরবর্তী কালে সংশোধনীর মাধ্যমে এই আইন বাতিল করেছে, বাকি দেশগুলি এখনও তা বহন করে চলেছে। ভারতও। আশ্চর্যের বিষয় হল, ২০২৩ সালে পুরনো দণ্ডবিধি পাল্টে তিনটি দণ্ডবিধি প্রবর্তনের পিছনে একটি ঘোষিত কারণ ছিল, ভারতীয় আইনকে ঔপনিবেশিক প্রভাব থেকে মুক্ত করা। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানিয়েছিলেন, ভারতীয় দণ্ডবিধি অতঃপর ‘সম্পূর্ণ স্বদেশি’ হল। সেই ‘স্বদেশি’ দণ্ডবিধিতেও শান্তিরক্ষার মুচলেকা স্বমহিমায় বিরাজমান। অর্থাৎ, দেশ স্বাধীন প্রজাতন্ত্র হওয়ার পরে রাষ্ট্র বলতে যখন নাগরিকদেরই বোঝানোর কথা, তখনও এই আইন দণ্ডবিধিতে থেকেছে— দণ্ডবিধি ‘স্বদেশি’ বেশ ধারণ করার পরেও— তবে, তাতে নাগরিকের স্বার্থ রক্ষিত হয়েছে, এমন দাবি কেউ করবেন না।
প্রশ্ন হল, নাগরিকের গণতান্ত্রিক প্রতিবাদে শান্তিভঙ্গ হবে মনে করা কি আসলে নাগরিকের প্রতিবাদ করার অধিকারেই বাধা তৈরি করা নয়? প্রসঙ্গত, ঔপনিবেশিক আমলে এমন ভাবে মুচলেকা দিতে অস্বীকৃত হয়েছিলেন যে সব নেতা, তাঁদের মধ্যে রয়েছেন মহাত্মা গান্ধী, ভগৎ সিংহ বা খান আবদুল গফ্ফর খানের মতো মানুষ। তাঁদের লড়াই দেশকে রাজনৈতিক স্বাধীনতা দিয়েছে। কিন্তু তার পরও কি নাগরিকের নিজের রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে কণ্ঠ তোলার স্বাধীনতা থাকবে না? নেহারা যে প্রশ্নগুলি করছেন, গণতন্ত্রে তার গুরুত্ব অপরিসীম। ভোটার তালিকা সংশোধনের অছিলায় যদি বিপুলসংখ্যক মানুষের নাগরিকত্বকে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দেওয়া হয়ে থাকে, তা বিপুল অন্যায়। সেই অন্যায়ের প্রতিবাদ করা, তদন্ত ও সুবিচারের দাবি করা নাগরিকের মৌলিক অধিকারের অন্তর্গত। শান্তিপূর্ণ পদ্ধতিতে সেই দাবি করলেও রাষ্ট্রের যদি শান্তিভঙ্গ ঘটে, তা হলে সেই শান্তিতে রাষ্ট্রের উপকার, নাগরিকের নয়।