E-Paper
এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে

নারীহিংসার তিমিরে

অভয়া বিচার পাবে কি না, তা আগের মতোই অনিশ্চিত। পুলিশের সঙ্গে ‘এনকাউন্টার’-এ ধর্ষণে অভিযুক্তদের নিহত হওয়ার ঘটনা ধর্ষিতের সুবিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তাকে আরও গাঢ় করেছে।

শেষ আপডেট: ০৪ নভেম্বর ২০২৬ ০৭:৩৭

কোজাগরী পূর্ণিমা রাতে উত্তর ২৪ পরগনার একাদশ শ্রেণির ছাত্রীর ধর্ষণ-খুনের ঘটনা কালো ছায়া ফেলে গেল দীপাবলির আলোকসজ্জার উপরে। এ রাজ্যে উৎসবও যেন মেয়েদের কাছে বিপজ্জনক। সপ্তমীর রাতে বারাসতে এক নিগৃহীতার বিবস্ত্র দেহ ব্যানারে ঢাকতে হয়েছিল। জুন মাসের গোড়ায় কোচবিহারের দিনহাটায় অত্যাচারিত নাবালিকার দেহ মিলেছে পাটখেতে, জুলাইয়ের গোড়ায় বারুইপুর এলাকায় পুকুর থেকে বালিকার বস্তাবন্দি দেহ উদ্ধার হয়েছে, অগস্টে ঝাড়গ্রামে এবং সেপ্টেম্বরে বাঁকুড়ায় গণধর্ষণের ঘটনা এসেছে শিরোনামে। রাজ্যের ক্রাইম রেকর্ডস ব্যুরো জানিয়েছে, পশ্চিমবঙ্গে এ বছর ১ মে থেকে ২৪ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ধর্ষণের মামলার সংখ্যা ২৪৫৪। অর্থাৎ গড়ে মাসে ৪৯০টি ধর্ষণের মামলা হচ্ছে। এই সংখ্যা একটি ইঙ্গিত মাত্র। বারাসতের ঘটনায় দেখা গিয়েছে, প্রকাশ্য রাস্তায় মানসিক ভারসাম্যহীন এক মহিলাকে ধর্ষিত হতে দেখেও আশেপাশের কেউ এগিয়ে আসেনি। নিজের পল্লিতে স্কুল থেকে বাড়ির ফেরার রাস্তাটিও বিপজ্জনক, শহরের রাজপথও তাই। কোনও জায়গাই মেয়েদের পক্ষে নিরাপদ নয়, এই ধারণার বিরুদ্ধেই আর জি কর ধর্ষণ-খুন কাণ্ডের পরে বিপুল সংখ্যায় রাস্তায় নেমেছিলেন সাধারণ মানুষ। যৌনহিংসা থেকে নিরাপত্তায় মেয়েদের বিশেষ অধিকার, ‘রাত দখল’ করে এই বার্তা ক্ষমতান্ধ সরকারকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিল বিপুল জনতা। বিধানসভা নির্বাচনে রাজ্যে রাজনৈতিক পট-পরিবর্তনের নানা কারণের মধ্যে এই আবেগের ভূমিকাও ছিল যথেষ্ট, মনে করেন বিশেষজ্ঞরা।

অথচ, অভয়া বিচার পাবে কি না, তা আগের মতোই অনিশ্চিত। পুলিশের সঙ্গে ‘এনকাউন্টার’-এ ধর্ষণে অভিযুক্তদের নিহত হওয়ার ঘটনা ধর্ষিতের সুবিচার পাওয়ার অনিশ্চয়তাকে আরও গাঢ় করেছে। বিচার-বহির্ভূত শাস্তি মানুষের মনে নিরাপত্তার বোধ জাগায় না, বরং আইনের শাসনের প্রতি শাসক দল তথা সরকারের তাচ্ছিল্য দেখলে মেয়েরা আরও অসহায় বোধ করে। অভয়া আন্দোলনে রাস্তায় লেখা হয়েছিল ‘রাষ্ট্রই ধর্ষক,’ কারণ ধর্ষণে অভিযুক্ত বাহুবলীরা শাসক দল এবং পুলিশ-প্রশাসনের প্রশ্রয়েই অবাধে হয়রানি, নিগ্রহ চালিয়ে যায়। আক্ষেপ, নির্বাচনের পরেও ভরসা ফিরে আসার পথটি তৈরি হয়নি। সম্প্রতি দু’টি অসরকারি সংস্থার রিপোর্টে প্রকাশ, পশ্চিমবঙ্গে তেষট্টি জন বিধায়ক এবং ছয় জন সাংসদের নামে নারীহিংসার মামলা রয়েছে। এ বিষয়ে অন্য সব রাজ্যের থেকে এগিয়ে বাংলা।

নিরাপত্তার আশ্বাস দিতে হলে প্রয়োজন তদন্ত ও বিচার ব্যবস্থাকে আরও তৎপর এবং কার্যকর করা। কেন্দ্রে এবং রাজ্যে যে-হেতু বিজেপি সরকার, তাই সংশোধিত ফৌজদারি আইনে, এবং কেন্দ্রের নীতি ও প্রকল্পে নারী হিংসা প্রতিরোধের যে ব্যবস্থাগুলি তৈরির নির্দেশ দেওয়া হয়েছে, সেগুলির নির্মাণে রাজ্য তৎপর হবে, এমনই প্রত্যাশা ছিল। ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা (২০২৩) অনুসারে জেলায় জেলায় ফরেন্সিক ল্যাবরেটরি গঠন এবং বিশেষজ্ঞ দল নিয়োগ করার কথা, যাতে ধর্ষণের যে কোনও ঘটনায় দ্রুত প্রমাণ সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা যায়। কেন্দ্রের ‘সখী’ প্রকল্পের অধীনে ‘ওয়ান স্টপ ক্রাইসিস সেন্টার’ তৈরি করার কথা, যেখানে থাকবেন পুলিশকর্মী, চিকিৎসাকর্মী, মানসিক স্বাস্থ্য পরামর্শদাতা, কেস ওয়ার্কার-সহ নানা স্তরের কর্মী। এ রাজ্যে ক’টা কেন্দ্র তৈরি হয়েছে, কতটুকু কাজ হচ্ছে? ধর্ষণের মামলার দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য নির্মিত ফাস্ট ট্র্যাক কোর্টগুলি বিচারক এবং পরিকাঠামোর অভাবে ধুঁকছে। যৌন হয়রানি প্রতিরোধ আইন (২০১৩) অনুযায়ী অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য জেলায় জেলায় ‘লোকাল কমপ্লেনস কমিটি’ তৈরি হওয়ার কথা, সেগুলোও অধিকাংশ ক্ষেত্রে রয়েছে কেবল নামে। অথচ তদন্ত ও বিচারের পরিকাঠামোয় বিনিয়োগই নারীনিরাপত্তার প্রধান উপায়।

এই প্রতিবেদনটি প্রথমে আনন্দবাজার পত্রিকার মুদ্রিত সংস্করণে প্রকাশিত হয়েছে
Women Harassment Sexual Harassment West Bengal government West Bengal Police Women Safety

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy