যে রাস্তার মোড়ে ৭৮ বছরের সুনীতা মণ্ডল প্রাণ হারালেন, সেই ডায়মন্ড হারবার রোডে কয়েক সপ্তাহ আগেই পৃথক দু’টি দুর্ঘটনায় প্রাণ গিয়েছে এক যুবকের ও এক স্কুলপড়ুয়ার। একই অঞ্চলে বার বার মৃত্যু কি শুধুই দুর্ভাগ্যজনক? না কি, চরম প্রশাসনিক ঔদাসীন্যের নিদর্শন? প্রশ্ন ওঠে, কেন প্রথম দুর্ঘটনার পরেই এই রাস্তায় সিগন্যাল সময়সীমা, রাস্তার নকশা, পারাপারের স্থানগুলি পরিদর্শন ও পরিমার্জনের পথে অগ্রসর হওয়া গেল না? সত্তরোর্ধ্ব নাগরিকের মৃত্যু আরও প্রশ্ন তোলে— গড়পড়তা কলকাতার রাস্তা প্রবীণদের জন্য ঠিক কতটা নিরাপদ? সাধারণ জ্ঞানেই সিদ্ধ, কলকাতার রাস্তার অল্প পরিসর, বিশৃঙ্খলা, বেপরোয়া চালনা, নির্দিষ্ট লেনকে নস্যাৎ করার প্রবণতা তরুণদের পক্ষেও বিভীষিকা। সেখানে বয়স্কদের ঝুঁকি স্বাভাবিকতই বহু গুণ বেশি। ধীরে হাঁটা, দুর্বলতা, ক্ষীণদৃষ্টি, প্রতিক্রিয়ার ক্ষমতা কমে যাওয়ায় সমস্যা সঙ্গিনতর হয়। উপরন্তু, দুর্ঘটনার মুখোমুখি হলে তরুণের অপেক্ষা তাঁদের জীবনযুদ্ধ জয়ের সম্ভাবনাও স্বল্পতর।
বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গবেষণাতেও প্রমাণিত, পথচারী-মৃত্যুতে প্রবীণদের হার যারপরনাই বেশি; দেশের মধ্যেও। ২০২৪ সালে নাগপুরে পথ-দুর্ঘটনায় মৃত ১০৪ জন পথচারীর ৬০ জনই ছিলেন প্রবীণ। সুনীতা মণ্ডলের মৃত্যুও দেখিয়ে দিল, রাস্তা পারাপারের দৈনন্দিন কাজটুকু তাঁদের পক্ষে কত সহজেই প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে। স্বীকার করতেই হবে, এ দেশের পরিকাঠামো ভাবনায় প্রবীণের সামর্থ্য বরাবরই উপেক্ষিত। এই জায়গাতে, ইউরোপ তো বটেই, একই মহাদেশের অন্য কিছু শহরের অভিজ্ঞতা শিক্ষণীয়। গতিময় নামে পরিচিত শহরেও প্রবীণ মানুষের উপযুক্ত ‘সিলভার জ়োন’ থাকে। সেখানে গাড়ির গতি কমে, নিরাপদ পারাপারের সুব্যবস্থা থাকে। বৃদ্ধ মানুষের সীমাবদ্ধতা বিচার করেই সিগন্যাল-এর সময়সীমার পুনর্মূল্যায়ন জরুরি। শহরে ট্র্যাফিক পুলিশ গুরুত্বপূর্ণ মোড়গুলি নিয়ে নতুন পরিকল্পনা সাজাচ্ছে বলে প্রচার চলছে, সেই নিরীক্ষায় প্রবীণ মানুষের পথ-নিরাপত্তার সমীক্ষার বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত না করা অন্যায্য। দেখা হোক, সত্তর-আশি বছরের মানুষ তাঁর স্বাভাবিক গতিতে হেঁটে এক বারে রাস্তা পার হতে পারছেন কি না, লাঠি হাতে পারাপারেই বা কত সময় লাগছে। রাস্তা চওড়া হলে, তিনি যাতে মাঝখানে আশ্রয় নিতে পারেন তেমন ‘আইল্যান্ড’ প্রয়োজন, চলন্ত সিঁড়ি যুক্ত সাবওয়ে বা ওভারব্রিজের পরিকল্পনা আদর্শ। দেখতে হবে, বাসস্টপে পৌঁছতে গাড়ির জটলার মধ্যে দিয়ে হাঁটছেন কি? পার্কিং, গ্যারাজ বা রাস্তা-মেরামতি তাঁর নিরাপদ পরিসরটুকু কাড়ছে কি? পাশাপাশি চাই স্পষ্ট জ়েব্রা ক্রসিং, সমতল ফুটপাত, বসতি-এলাকায় গতি নিয়ন্ত্রক, আলোর ব্যবস্থা, পারাপারে সহায়ক পর্যাপ্ত ট্র্যাফিক পুলিশ। চালকদের প্রশিক্ষণ ও শৃঙ্খলার রেকর্ড নিয়ে কঠোরতা।
প্রসঙ্গটি কেবল বয়োজ্যেষ্ঠের প্রতি কর্তব্য বা সংবেদনশীলতাতে আটকে নেই। বয়স্ক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে দেশ জুড়ে, ফলত প্রবীণ-বান্ধব নগর পরিকল্পনা একটি আবশ্যক ক্ষেত্র। বিষয়টি স্বাধীনতারও। বয়স্ক মানুষটি যেন পথের ত্রাসে বাড়ি থেকে বার হওয়া কমিয়ে না দেন। তাঁর সামাজিক জীবন, জীবনের মান সঙ্কুচিত হতে পারে। তা যেমন কাম্য নয়, তেমনই গতির পাশাপাশি পথের সুরক্ষাও একটি শহরের আধুনিকতার পরীক্ষা।