সাম্প্রতিক তীব্র ভূরাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে পশ্চিম এশিয়ার পারমাণবিক মানচিত্র নতুন করে বিন্যস্ত হতে চলেছে— আমেরিকা ও সৌদি আরবের মধ্যে তিন দশক মেয়াদি অসামরিক পারমাণবিক সহযোগিতা বিষয়ক এক চুক্তির সূত্রে। এক দিক থেকে এটি ট্রাম্পের ‘লেনদেন-ভিত্তিক’ দৃষ্টিভঙ্গিকেই প্রতিফলিত করে— আমেরিকান সংস্থাগুলির জন্য বড় আকারের পারমাণবিক চুক্তি, চুল্লি ও জ্বালানি সংক্রান্ত সম্ভাব্য কোটি কোটি ডলারের বাণিজ্য এবং চিন ও রাশিয়ার প্রতিযোগিতার মুখে আমেরিকার পারমাণবিক শিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করার প্রতিশ্রুতি। আরও গভীরে দেখলে, এটি সৌদি আরবকে স্থায়ী ভাবে আমেরিকা-কেন্দ্রিক বলয়ে আবদ্ধ রাখার একটি কৌশল, বিশেষত এমন এক সময়ে যখন রিয়াধ চিন ও রাশিয়ার পারমাণবিক প্রস্তাবের প্রতি আগ্রহ দেখিয়েছে এবং নিজেদের নিরাপত্তা অংশীদারির পরিসর বিস্তৃত করেছে।
অন্য দিকে, সৌদি আরবের যুবরাজের জন্যেও বড় সাফল্য, যে-হেতু তিনি পশ্চিমি বিশ্বের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করার বৃহত্তর প্রচেষ্টার অংশ হিসেবে বহুকাল ধরেই আমেরিকার সঙ্গে একটি পারমাণবিক চুক্তি স্বাক্ষরের চেষ্টা চালিয়ে আসছিলেন। তাঁর ‘ভিশন ২০৩০’ পরিকল্পনার আওতায়, তিনি দেশের অর্থনীতিতে বৈচিত্র আনতে, জীবাশ্ম জ্বালানির উপর নির্ভরতা কমাতে এবং কার্বন নিঃসরণ হ্রাস করতে আগ্রহী। পারমাণবিক শক্তি দেশের ক্রমবর্ধমান জ্বালানির চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি রফতানির জন্য আরও বেশি পরিমাণ তেল ও গ্যাস অব্যবহৃত রাখতে সাহায্য করবে। তবে, উদ্বেগ অন্যত্র। গত কয়েক দশক ধরে ওয়াশিংটন সাধারণত এই বিষয়টিতে জোর দিয়ে আসছে যে, যে সব দেশ আমেরিকার পারমাণবিক প্রযুক্তি গ্রহণ করবে, তাদের অবশ্যই কঠোর ‘পরমাণু-অপ্রসার প্রতিশ্রুতি’ মেনে চলতে হবে। সেই সঙ্গে থাকতে হবে রাষ্ট্রপুঞ্জের আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)-এর পর্যবেক্ষণের আওতাতেও। কিন্তু চুক্তিতে এই মূল দু’টি শর্ত অনুপস্থিত থাকায় অনেকেই চিন্তিত। কারণ, এমন ছাড় আগামী দিনে দেশটিকে তাদের পারমাণবিক কর্মসূচিকে অস্ত্রে রূপান্তরিত করার সক্ষমতা অর্জনের সুযোগ করে দেবে। লক্ষণীয়, সৌদি নেতৃত্বের বরাবরের দাবি, ইরান যদি পারমাণবিক অস্ত্র অর্জন করে, তবে রিয়াধও সেই দৌড়ে পিছিয়ে থাকবে না।
এ দিকে, দেশের অভ্যন্তরে সমালোচনার মুখে পড়ে ট্রাম্প সম্প্রতি ঘোষণা করেন যে, সৌদি আরব ‘আব্রাহাম অ্যাকর্ডস’-এ যোগ দিলেই কেবল এই চুক্তিটি এগিয়ে নেওয়া হবে, যার অন্যতম লক্ষ্য ইজ়রায়েলের সঙ্গে আরব রাষ্ট্রগুলির, বর্তমানে মূলত সৌদি আরবের কূটনৈতিক সম্পর্ক স্বাভাবিক করা। মূল বিষয়টি কেবল ইজ়রায়েলকে কাঙ্ক্ষিত আইনি স্বীকৃতি দেওয়া নয়, বরং এর পারমাণবিক শক্তির সঙ্গে মানিয়ে চলতে শেখার উপরেও নির্ভর করছে। গাজ়ায় ইজ়রায়েলের ধ্বংসযজ্ঞের পরিপ্রেক্ষিতে সৌদি আরব চুক্তির এই শর্তে রাজি হবে কি না, সে বিষয়েও উঠছে প্রশ্ন। তবে এই চুক্তি যদি শেষ পর্যন্ত সম্পন্ন হয়, তবে এটি কেবল বিশ্বব্যাপী পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থাকে দুর্বলই করবে না, বরং অন্যান্য দেশকে অনুরূপ ছাড় আদায়ের প্রচেষ্টায় উৎসাহিত করবে এবং ইতিমধ্যেই অস্থিতিশীল পশ্চিম এশিয়ায় ভবিষ্যতে পারমাণবিক অস্ত্র প্রতিযোগিতার ঝুঁকিও বাড়িয়ে তুলবে।