কেমন ছিল নিয়ানডারথালেদের জীবন? বিলুপ্ত এই মানবপ্রজাতি কি শুধু পাথরের তৈরির সরঞ্জামই ব্যবহার করত? এদের জীবনযাত্রা নিয়ে বহু বছর অধিকাংশের মনে এমনটাই ধারণা ছিল। কারণ, এত দিন পর্যন্ত নিয়ানডারথালেদের ফেলে যাওয়া যত প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন মিলেছে— অস্ত্র হোক বা অন্য কোনও সরঞ্জাম, তার বেশির ভাগই পাথরের। কিন্তু শুধু পাথর নয়, কাঠের সরঞ্জাম ব্যবহারেও যথেষ্ট পটু ছিল নিয়ারডারথালেরা।
কাঠের সরঞ্জাম পচনশীল হওয়ায় এত বছর পরে তার নমুনা খুব বেশি পাওয়া যায় না। রাসায়নিক ক্ষয়ের প্রভাবে অধিকাংশ নিদর্শনই হারিয়ে গিয়েছে। তার মধ্যেও কিছু নমুনার অবশিষ্টাংশ হাজার হাজার বছরের ধাক্কা কাটিয়েও টিকে রয়েছে। সম্প্রতি বিশ্বের দুই প্রান্তের দুই গবেষণায় নিয়ানডারথালদের কাঠের সরঞ্জামের ব্যবহারের বিষয়ে নতুন তথ্য উঠে এসেছে।
আধুনিক মানুষের (হোমো সেপিয়েন্স) আবির্ভাবের আগে থেকেই নিয়ানডারথালেরা পৃথিবীতে ছিল। আনুমানিক ৪ লক্ষ ৩০ হাজার বছর আগে ইউরোপে আবির্ভাব হয়েছিল নিয়ানডারথালেদের (আধুনিক মানুষের আবির্ভাব হয় প্রায় ৩ লক্ষ বছর আগে)। টিকে ছিল আজ থেকে প্রায় ৪০,০০০ বছর আগে পর্যন্ত। আধুনিক মানুষ আফ্রিকার বাইরে ছড়িয়ে পড়ার পর দুই ভিন্ন মানবপ্রজাতির মধ্যে মিলনও হয়েছিল। আফ্রিকার বাইরে বসবাসকারী আধুনিক মানুষের শরীরে এখনও প্রায় ২ শতাংশ নিয়ানডারথাল জিন পাওয়া যায়।
বিলুপ্ত এই প্রজাতির মানুষদের নিয়ে সম্প্রতি দু’টি গবেষণা প্রকাশিত হয়েছে— একটি ‘সায়েন্স অ্যাডভান্সেস’ জার্নালে, অন্যটি ‘সায়েন্টেফিক রিপোর্টস’ জার্নালে। প্রথম গবেষণাটি করেন স্পেনের ট্যারাগোনার কাতালান ইনস্টিটিউট অফ হিউম্যান প্যালিওইকোলজি অ্যান্ড সোশ্যাল ইভোলিউশনের প্রত্নতাত্ত্বিক পালমিরা সালাদি। বার্সালোনার পশ্চিমে এক পাহাড়ের ঢালে সালাদি এবং তাঁর সহযোগীরা আবিষ্কার করেন নিয়ানডারথালেদের এক হারিয়ে যাওয়া বসতি। যা আনুমানিক ৪০-৬২ হাজার বছরের পুরনো। সেখানে ১৬টি স্তর মিলিয়ে মোট ৫৯৭টি কাঠের সরঞ্জামের অবশিষ্টাংশ চিহ্নিত করেন তাঁরা।
বার্সালোনার ওই নমুনায় যেমন বিভিন্ন পাত্রেরা অবশিষ্টাংশ ছিল, তেমনই ছিল ঘরবাড়ি তৈরির সরঞ্জাম, অস্ত্রের অবশিষ্টাংশও। নমুনাগুলি যে অবস্থায় পাওয়া গিয়েছে, তা পুরোপুরি কাঠের বলা যায় না। নিয়ানডারথালেদের ব্যবহার করা ওই সরঞ্জামগুলি কোনও কারণে ক্যালসিয়াম কার্বনেট যুক্ত জলের মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। ফলে কাঠ পচে যাওয়ার আগেই সেগুলির চারপাশে চুনাপাথরের শক্ত আবরণ তৈরি হয়। পরবর্তী কালে সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কাঠের উদ্ভিজ অংশ হারিয়ে গেলেও চুনাপাথরের স্তরের ভিতরে ফাঁপ অংশ রয়ে গিয়েছে। যা ওই কাঠের সরঞ্জামের একটি নিখুঁত ছাঁচ তৈরি করেছে পাথরের গায়ে।
ওই ছাঁচ বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীদের দাবি, নিয়ানডারথালেরা পাথরের পাশপাশি কাঠের সরঞ্জামও ব্যবহার করত। এবং তাতে বেশ দক্ষও ছিল। কোন ধরনের কাঠ কোন কাজের জন্য বেছে নেওয়া হবে, তা স্থির করার ক্ষেত্রেও নিয়ানডারথালেদের যথেষ্ট বুদ্ধিমত্তার পরিচয় মিলেছে। যেমন জুনিপার গাছের নরম ছাল দিয়ে তারা ট্রে এবং জিনিসপত্র রাখার পাত্র তৈরি করত। আবার স্কটস পাইন গাছের কাঠ শক্ত হওয়ায়, তা বর্শা তৈরির কাজে ব্যবহার করা হত। আবার এমন একটি সরঞ্জামের উদাহরণ মিলেছে, যার হাতল ছিল সরু এবং মাথার অংশটা ছিল অনেক ছড়ানো এবং মোটা। বিজ্ঞানীদের অনুমান, সেটি কাঠের গদা জাতীয় কোনও অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হত।
শুধু অস্ত্রশস্ত্রই নয়, ঘরবাড়ি তৈরি এবং তা নিজেদের সুবিধামতো গোছানোর জন্যও কাঠের ব্যবহার করত নিয়ানডারথালেরা। গবেষণায় দেখা গিয়েছে, পাহাড়়ি অঞ্চলের ঠান্ডা হাওয়া যাতে সরাসরি ঘরবাড়িতে না-আসে, সে জন্য ১৬ ফুট লম্বা কাঠের বেড়া দিত ওই অঞ্চলের মানুষেরা। বসবাসের জায়গাকেও বিভিন্ন কাজের জন্য আলাদা আলাদা ভাবে ভাগ করে নিত তারা। ঘুমানোর জায়গায় থাকত আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থাও।
আবার বার্সিলোনা থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে ইরাকি কুর্দিস্তানের এক গবেষণায় মিলেছে আরও এক নতুন তথ্য। ৭৫ হাজার বছরের পুরনো এক নিয়ানডারথাল কঙ্কালে মিলেছে কাঠের বর্শার আঘাতের চিহ্ন। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের অস্থি ও জীবাশ্মবিজ্ঞানী এমা পোমেরয়ের মতে, ওই কাঠের বর্শার আঘাতেই মৃত্যু হয়েছিল মানুষটির। তাঁর এই গবেষণাটি সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে ‘সায়েন্টেফিক রিপোর্টস’ জার্নালে। দাবি করা হচ্ছে, কাঠের বর্শার আঘাতে মানুষের মৃত্যুর সবচেয়ে প্রাচীন প্রমাণ এটিই। এমা এবং তাঁর সহযোগীরা ইরাকি কুর্দিস্তানের এক গুহায় এই কঙ্কালটি খুঁজে পান। সেটির গায়ে আধ-ইঞ্চির একটি বৃত্তাকার ছিদ্র ছিল। বাঁ দিকের কাঁধের হাড় ভেদ করে বুকের খাঁচার মধ্য দিয়ে নীচের দিকে নেমে গিয়েছিল সেটি। মিসৌরি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্নতাত্ত্বিক লিব্বি কাউগিলের (তিনি গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না) অনুমান, শরীরের সামনের অংশ ভেদ করে পিছন দিক দিয়ে বেরিয়েছিল বর্শাটি।
যদিও এই ক্ষতচিহ্নটি ইচ্ছাকৃত ভাবে কারও হামলার ফলে তৈরি হয়েছিল না কি বড় কোনও প্রাণীকে শিকার করতে অঘটন ঘটে গিয়েছিল, তা এখনও স্পষ্ট নয়। কাউগিলের কথায়, “শিকার করতে গিয়ে এমন দুর্ঘটনা ঘটলেও ঘটতে পারে। তবে সে সম্ভাবনা খুবই কম।”