Advertisement
E-Paper

ধূমকেতু থেকেই কি পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টি? কেমব্রিজের বিজ্ঞানীদের পরীক্ষায় প্রশ্নের মুখে শতাব্দীপ্রাচীন অনুমান

ব্রহ্মাণ্ডের সৃষ্টিরহস্য এখনও অধরা। প্রাণের সৃষ্টি নিয়েও নানা মত বিজ্ঞানমহলে। একটি তত্ত্ব হল, পৃথিবীতে প্রাণ তৈরির যৌগিক উপাদান এসে পড়েছিল ধূমকেতুর সঙ্গে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০২ নভেম্বর ২০২৬ ০৮:৫৮
জীবনের বীজ ধারণ করে হাজারে হাজারে ধূমকেতু যদি পৃথিবীতে এসে পড়ে তা হলে কী হবে?

জীবনের বীজ ধারণ করে হাজারে হাজারে ধূমকেতু যদি পৃথিবীতে এসে পড়ে তা হলে কী হবে? ছবি: সংগৃহীত।

পৃথিবীতে প্রাণের পরশ ছোঁয়াল কে? জীবন সৃষ্টির আদিকণারা কি পৃথিবীর পরিবেশেই জন্ম নিয়েছিল? না কি বহির্মহাবিশ্ব থেকে তার আগমন? একশো বছরেরও বেশি সময় ধরে বিজ্ঞানীদের একটি অংশের মত, প্রাণের প্রাথমিক যৌগিক উপাদান এসেছিল ধূমকেতুর সঙ্গে। সেই তত্ত্বকে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিল কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাম্প্রতিক গবেষণা।

জীবনের বীজ ধারণ করে হাজারে হাজারে ধূমকেতু যদি পৃথিবীতে এসে পড়ে তা হলে কী হবে? জানতে, যান্ত্রিক উপায়ে পরিবেশ ও পরিস্থিতি তৈরি করে পরীক্ষা (কম্পিউটার সিমুলেশন) করেন কেমব্রিজের গবেষকেরা। প্রাণ সৃষ্টির ঠিক আগে পৃথিবীর যে রকম পরিবেশ ছিল, যে গতিতে ধূমকেতুগুলি আছড়ে পড়েছিল, সবই কম্পিউটারের সাহায্যে পুনর্নিমাণ করা হয়েছিল এই পরীক্ষায়। কিন্তু এই এক লক্ষ ধূমকেতুবর্ষণের অঙ্ক কষার পরীক্ষার মধ্যে প্রায় প্রত্যেকটিই বিফল হয়েছে। পরীক্ষার ফল বলছে, প্রাণের যে বীজ বহন করেছিল সেই ধূমকেতুগুলি, তা নষ্ট হয়ে গিয়েছে পৃথিবীর সংস্পর্শে আসার আগেই, কিংবা আছড়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

কী এই প্রাণের বীজ? হাইড্রোজেন সায়ানাইড (এইচসিএন)। এক প্রকার রাসায়নিক। এর থেকে লিপিড, সুগার, নিউক্লিয়োবেস এবং নিউক্লিয়োটাইড জাতীয় বেশ কিছু জৈব পদার্থ তৈরি হয়। তার থেকে সৃষ্টি হয় প্রাণ। ‘সায়েন্টিফিক রিপোর্টস’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই গবেষণার নেতৃত্ব দেন কেমব্রিজের ইনস্টিটিউট অফ অ্যাস্ট্রোনমির বিজ্ঞানী রিচার্ড অ্যানস্লো। তাঁর বক্তব্য, হাইড্রোজেন সায়ানাইড এমন একটি রাসায়নিক যার হদিস সৌরজগতের প্রায় সমস্ত ধূমকেতুতে পাওয়া যায়। এবং উল্লেখযোগ্য পরিমাণেই পাওয়া যায়। অন্যান্য প্রাণসৃষ্টিকারী রাসায়নিক, যেমন সায়ানোঅ্যাসিটাইলিন ও সায়ানোজেনের অস্তিত্ব সে তুলনায় অনেক কম। তাই পরীক্ষার জন্য এই রাসায়নিকটিই বেছে নেওয়া হয়েছিল।

এই প্রাণের বীজ বহন করে যদি একটি ধূমকেতু সেকেন্ডে ৩০ থেকে ৫০ কিলোমিটার গতিতে পৃথিবীতে এসে আছড়ে পড়ে, তা হলে সেই হাইড্রোজেন সায়ানাইডের কী পরিণতি হবে? এক লক্ষ ধূমকেতু আছড়ে পড়ার ঘটনা যান্ত্রিক ভাবে অনুকরণ করে গবেষকদের দাবি, টিকে থাকা প্রায় অসম্ভব। ধূমকেতুগুলি পৃথিবীর মাটি ছোঁয়ার আগে বায়ুমণ্ডলেই ওই যৌগ ধ্বংস হয়ে যায়, নয়তো আছড়ে পড়ার মুহূর্তে অত্যধিক তাপে (সব চেয়ে বড় কারণ এটাই) বা সমুদ্রের জলে গিয়ে পড়ার ফলে রাসায়নিকটি নষ্ট হয়ে যায়। পরীক্ষার ফল বলছে, এক-আধটি ক্ষেত্রে হাইড্রোজেন সায়ানাইড সফল ভাবে পৌঁছোতে পারে পৃথিবীর বুকে। কিন্তু গবেষকদের মতে, প্রাণ সৃষ্টি হওয়ার জন্য যে পরিমাণে প্রয়োজন, তার তুলনায় এ নগন্য। রিচার্ডের কথায়, ‘‘পৃথিবীর বাইরে থেকেই ধূমকেতুর সাহায্যে প্রথম প্রাণের বীজ এসেছিল পৃথিবীতে, এই ধারণাটি শুনতে বেশ রোমান্টিক, কিন্তু আদতে তার সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ।’’

ব্রহ্মাণ্ডময় ছড়িয়ে রয়েছে প্রাণের মহাজাগতিক বীজ, এমন ধারণা প্রথম করেছিলেন গ্রিক দার্শনিক অ্যান্যাক্সাগোরাস। বহু শতাব্দী আগে। ১৯০৮ সালে ধূমকেতুর মাধ্যমে পৃথিবীতে প্রাণের উপাদান আসার জোরালো তত্ত্বায়ন করেন নোবেলজয়ী সুইডিশ বৈজ্ঞানিক সবান্তে আরহেনিয়াস। তবে সেই সময় এই অনুমানের সত্যতা যাচাই করার মত প্রযুক্তি মানুষের কাছে ছিল না। সাম্প্রতিক গবেষণা সেই অনুমান নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিল। কিন্তু বিজ্ঞানীরা বলছেন, ধূমকেতু-তত্ত্ব একেবারেই খারিজ হয়ে গেল, তা এখনই বলে দেওয়ার মতো নিশ্চিত প্রমাণ বা পরিস্থিতি কিন্তু আসেনি।

গবেষক রিচার্ডও এ সম্পর্কে তাঁর বক্তব্য কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে জানিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, ‘‘এ জিনিস কোটিতে গুটিক হয়। জীবনের বীজটি সংরক্ষিত রাখতে দরকার একদম সঠিক গতি, আছড়ে পড়ার একটি সুনির্দিষ্ট কোণ, আরও অনেক কিছু। এখানেই শেষ নয়, রাসায়নিকটি বেঁচে গেলে তার থেকে প্রাণসৃষ্টির পরবর্তী প্রক্রিয়াও যথেষ্ট জটিল। একেবারে উড়িয়ে না-দিলেও এই (ধূমকেতুর সঙ্গে প্রাণের উপাদান এসে পড়ার) তত্ত্ব যে প্রশ্নাতীত নয়, তা বোঝা গেল।’’

তবে ভবিষ্যতে যদি প্রমাণ হয়ও যে, পৃথিবীতে ধূমকেতু থেকে আসা রাসায়নিক উপাদানের মাধ্যমে প্রাণের সূচনা হয়নি, তার মানে এই নয় যে অন্য কোনও গ্রহ থেকে এই প্রক্রিয়াটি হতে পারে না। গবেষকদের পর্যবেক্ষণ, ধূমকেতু-তত্ত্বটির সত্যাসত্য সম্পর্কে সফল পরীক্ষার জন্য মঙ্গল গ্রহ অনেক বেশি উপযুক্ত। মঙ্গল গ্রহের বায়ুমণ্ডল পাতলা হওয়ায় এবং সেখানে ধূমকেতুর গতিবেগ কম হওয়ায়, সফল ভাবে জৈব রাসায়নিকটি পৌঁছোনোর সম্ভাবনা পাঁচ গুণেরও বেশি। আবার শুক্র গ্রহের ঘন বায়ুমণ্ডল অধিকাংশ ধূমকেতুকেই পুরোপুরি ধ্বংস করে ফেলে। কয়েক কিলোমিটার ব্যাসের ধূমকেতুও এর হাত থেকে রক্ষা পায় না।

সে পরীক্ষানিরীক্ষা ভবিষ্যতে হয়তো হবে। তবে পৃথিবীতে প্রাণের সৃষ্টিরহস্য অদূর ভবিষ্যতে ভেদ হওয়ার সম্ভাবনা এখনও দেখা যাচ্ছে না।

comet Solar System life

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy