Advertisement
E-Paper

চেরনোবিলে থাকা কুকুরদের জিন অন্যদের চেয়ে আলাদা! পরমাণু চুল্লি দুর্ঘটনার সঙ্গে কি আছে কোনও সম্পর্ক? কী বলছেন বিজ্ঞানীরা

৪০ বছর আগের পরমাণু চুল্লি বিপর্যয়ের ধাক্কা এখনও বয়ে যাচ্ছে চেরনোবিল। সেখানে মানুষের বসবাস এখনও আইনত নিষিদ্ধ সেখানে। ওই নিষিদ্ধ অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় কয়েকশো কুকুর। যাদের জিনগত গঠন বাকিদের চেয়ে আলাদা। কেন? তা নিয়ে গত বেশ কয়েক বছর ধরে একাধিক গবেষণা হয়েছে।

আনন্দবাজার ডট কম ডেস্ক

শেষ আপডেট: ০১ নভেম্বর ২০২৬ ০৯:০১
চেরনোবিলের কুকুর।

চেরনোবিলের কুকুর। — ফাইল চিত্র।

চেরনোবিল বিপর্যয়ের পর থেকে চার দশক পেরিয়ে গিয়েছে। দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশে প্রায় ২৬০০ বর্গকিলোমিটার অঞ্চল এখনও পরিত্যক্ত। ওই অঞ্চলের ভিতরে মানুষের বাস করা এখনও আইনত নিষিদ্ধ। প্রায় জনমানবহীন ওই অঞ্চলে ঘুরে বেড়ায় কয়েকশো কুকুর। যাদের জিনগত গঠন অন্য কুকুরদের চেয়ে অনেকটাই আলাদা।

তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের মধ্যে বছরের পর বছর থাকতে থাকতেই কি এই জিনগত পরিবর্তন এসেছে? এই প্রশ্ন দীর্ঘ সময় ধরে ভাবিয়েছে বিজ্ঞানীদের। তবে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের ফলেই যে জিনগত পরিবর্তন হয়েছে, কোনও প্রমাণ পাওয়া যায়নি সাম্প্রতিক গবেষণায়। বরং, বিজ্ঞানীদের অনুমান, এর নেপথ্যে একটি প্রধান কারণ হতে পারে প্রাকৃতিক নির্বাচন (যাদের মধ্যে পরিবেশের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষমতা আছে, তাদের টিকে থাকা এবং বংশবিস্তার করা। ১৮৫৯ সালে বিজ্ঞানী চার্লস ডারউন তাঁর ‘অন দ্য অরিজিন অফ স্পিসিস’ বইয়ে এই তত্ত্বটি বিশদে ব্যাখ্যা করেন)। নর্থ ক্যারোলিনা স্টেট ইউনিভার্সিটির বিশেষজ্ঞদের এই গবেষণাটি গত সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত হয়েছে ‘জিনস’ জার্নালে।

৪০ বছর আগের কথা। সোভিয়েত ইউনিয়ন তখনও ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়নি। ১৯৮৬ সালে তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়নের চেরনোবিলে (এলাকাটি বর্তমানে ইউক্রেনের মধ্যে পড়ে) পরমাণু বিদ্যুৎকেন্দ্রে ঘটে যায় এক ভয়াবহ দুর্ঘটনা। পরিবেশে ছড়িয়ে পড়ে প্রচুর পরিমাণ তেজস্ক্রিয় পদার্থ। যার জেরে দুর্ঘটনাস্থলের আশপাশের প্রায় ২৬০০ বর্গকিলোমিটার এলাকাকে পরিত্যক্ত অঞ্চল হিসেবে ঘোষণা করে তৎকালীন সোভিয়েত সরকার। প্রায় সাড়ে তিন লক্ষ মানুষকে ঘরবাড়ি ছেড়ে সেখান থেকে চলে যেতে হয় অন্যত্র। তাঁদের অনেকে নিজেদের পোষ্য কুকুর ফেলে যান চেরনোবিলেই।

পরবর্তী সময়ে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ ছড়িয়ে পড়া ওই এলাকায় থাকা পশুদের মেরে ফেলার জন্য বিশেষ দল পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু তার পরেও বেশ কিছু কুকুর বেঁচে যায় এবং তারা এখনও সেখানে বংশবিস্তার করে চলেছে। গবেষকদলের প্রধান তথা নর্থ ক্যারোলিনা বিশ্ববিদ্যালয়ের জিনবিজ্ঞানী মেগান ডিলনের কথায়, “কতগুলি পশু সে সময়ে বেঁচে গিয়েছিল, তা স্পষ্ট নয়। তবে অনেক পোষ্য কুকুর সে সমেয় বেঁচে যায়। পরবর্তী সময়ে তারা ওই অঞ্চলে স্থায়ী ভাবে বংশবিস্তার করে।” তবে অনুমান করা হয়, এখন ওই নিষিদ্ধ অঞ্চলে কয়েকশো কুকুর থাকে এবং তারা ওই বিপর্যয়ের পর বেঁচে যাওয়া কুকুরদেরই বংশধর।

চেরনোবিলের কুকুরদের জিনগত গঠন অন্য কুকুরদের চেয়ে কেন আলাদা, তা নিয়ে গত বেশ কয়েক বছর ধরে একাধিক গবেষণা হয়েছে। যেমন ২০২৩ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, পারমাণবিক চুল্লির একেবারে কাছাকাছি এলাকায় থাকা কুকুরদের জিনগত বৈশিষ্ট্য এবং সেখান থেকে মাত্র ১৬ কিলোমিটার দূরে চেরনোবিল শহরে থাকা কুকুরদের জিনগত বৈশিষ্ট্যের মধ্যেও ফারাক রয়েছে। তা থেকে প্রাথমিক ভাবে বিজ্ঞানীদের অনুমান ছিল, তেজষ্ক্রিয় বিকিরণের ফলে কুকুরদের ডিএনএ-তে এই পরিবর্তন এসে থাকতে পারে। পরবর্তী সময়ে ২০২৪ সালে এ নিয়ে আরও একটি গবেষণা হয়। তবে তেজষ্ক্রিয় বিকিরণই যে এর জন্য দায়ী, এমন কোনও সুনির্দিষ্ট প্রমাণ তাতে পাওয়া যায়নি।

তা হলে এই জিনগত ফারাকের কারণ কী? উত্তর খুঁজতে ২০২৬ সালে আরও একটি গবেষণা করেন ডিলন এবং তাঁর সহযোগীরা। তাতে চেরনোবিলের নিষিদ্ধ অঞ্চল থেকে ২০১৮ এবং ২০১৯ সালের মধ্যে সংগৃহীত ১০৬টি কুকুরের জিনগত তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা হয়। তাঁরা মূলত দু’টি সম্ভাবনার দিক খতিয়ে দেখেন। প্রথমত, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে এই জিনগত ফারাক হয়ে থাকতে পারে কি না। দ্বিতীয়ত, কোনও জেনেটিক ড্রিফ্‌ট (কোনও প্রাণীর একটি ছোট গোষ্ঠীর মধ্যে এলোমেলো ভাবে কিছু অনির্দিষ্ট জেনেটিক পরিবর্তন। যার সরাসরি অভিযোজনগত সুবিধার সঙ্গে সম্পর্কিত নয়)।

গবেষণায় দেখা যায়, শুধুমাত্র জেনেটিক ড্রিফ্‌টের তত্ত্ব দিয়ে কুকুরদের এই জিনগত পার্থক্যকে পুরোপুরি ব্যাখ্যা করা যাচ্ছে না। বরং, প্রাকৃতিক নির্বাচনের ফলে এই পরিবর্তন এসে থাকতে পারে— এমন আভাসই বেশি মিলেছে। কারণ কুকুরদের ডিএনএ-র নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রেই এই পার্থক্য খুঁজে পাওয়া গিয়েছে। যেমন ক্যানসারের বিরুদ্ধে প্রতিরোধব্যবস্থা, কোষের স্বাভাবিক কাজকর্ম, সংক্রামক রোগ এবং শরীরের অন্য রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থার সঙ্গে সম্পর্কিত ক্ষেত্রেই পার্থক্যগুলি দেখা গিয়েছে। যা থেকে বিজ্ঞানীদের অনুমান, বিপর্যয়ের সময়ে যে কুকুরদের জন্মগত ভাবে প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার মতো জিনগত সুবিধা ছিল, তারাই শেষ পর্যন্ত বেঁচে গিয়েছিল। এবং সেই জেনেটিক ধারাই পরবর্তী কয়েক প্রজন্মে তাদের বংশধরদের মধ্যে ছড়়িয়ে পড়ে। বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলে ‘ডিরেকশনাল সিলেকশন’ (প্রাকৃতিক নির্বাচনের এক বিশেষ ধরন, যেখানে পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে একটি নির্দিষ্ট বৈশিষ্ট্যদের জীবদের টিকে থাকার এবং বংশবৃদ্ধির ক্ষমতা সবচেয়ে বেশি থাকে)।

তবে চেরনোবিলের কুকুরদের মধ্যে তেজস্ক্রিয় বিকিরণ প্রতিরোধক্ষমতা তৈরি হয়ে গিয়েছে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়। গবেষকেরা শুধু এমন কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্যের আভাস পেয়েছেন যা প্রতিকূল পরিবেশে টিকে থাকার জন্য সহায়ক হতে পারে। গবেষকদের মতে, তেজষ্ক্রিয় বিকিরণ এই কুকুরদের মধ্যে কোনও ‘সুপার পাওয়ার’ ঢুকিয়ে দেয়নি। বরং তাদের পূর্বপুরুষদের মধ্যে কিছু জিনগত বৈশিষ্ট্য আগে থেকেই ছিল। যদিও এ বিষয়ে আরও বিশদে গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন ডিলন এবং তাঁর সঙ্গীরা।

Chernobyl Dogs Genes

সঠিক খবর পেতে গুগ্‌লে বেছে নিন আনন্দবাজার ডট কম

ফলো করুন আমাদের মাধ্যমগুলি

Advertisement

আরও পড়ুন:

Share this article

CLOSE

Log In / Create Account

We will send you a One Time Password on this mobile number or email id

Or

By proceeding you agree with our Terms of service & Privacy Policy