শুক্রাণুদের মধ্যে সব সময় যে প্রতিযোগিতা চলে, তা কিন্তু নয়। বরং মাঝেমধ্যে তারা দল বেঁধে কাজে নামে। কিছু প্রজাতির প্রাণীর শুক্রাণুর এই বৈশিষ্ট্যই লক্ষ্য করেছেন একদল গবেষক।
নিউ ইয়র্কের সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়, ইটালির সিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েক জন গবেষক প্রাণীদের শুক্রাণুর কাজ করার ধরন নিয়ে পরীক্ষা করেছিলেন। তা করতে গিয়ে তাঁরা দেখেন, কিছু সন্ধিপদ প্রাণীর শুক্রাণুগুলি দলবদ্ধ ভাবে কাজ করে। তারা নিজেদের মধ্যে প্রতিযোগিতা করে একটি ডিম্বাণুর দিকে ধাবিত হয় না।
সাধারণত নিষেকের ক্ষেত্রে একটি ডিম্বাণুর দিকে ছুটে যায় লক্ষ লক্ষ শুক্রাণু। বিজ্ঞানীরা বলছেন, কিছু প্রাণীর ক্ষেত্রে সফল বংশবৃদ্ধি শুক্রাণুর প্রতিযোগিতার উপর নির্ভর করে না, বরং তাদের দলবদ্ধ কাজের উপরে নির্ভর করে। তাঁরা বিভিন্ন সন্ধিপদ প্রাণীর উপরে পরীক্ষানিরীক্ষা করেছিলেন। তালিকায় ছিল মাকড়সা, কাঁকড়া, কেন্নো, বিছের মতো শতাধিক প্রাণী। তাতে দেখেছেন, ওই প্রাণীদের শুক্রাণু যৌথ ভাবে কাজ করে বলেই ডিম্বাণু নিষিক্ত হয়। তাদের বংশবৃদ্ধি হয়।
আরও পড়ুন:
বিজ্ঞানীরা বলছে, বাইচের দল যেমন ভাবে এক সঙ্গে দাঁড় ঠেলে নৌকা এগিয়ে নিয়ে যায়, এই সন্ধিপদ প্রাণীর ক্ষেত্রেও তেমন ভাবেই শুক্রাণু কাজ করে। প্রায় ১০০ বছর আগে গবেষণায় এ রকম হতে দেখেছিলেন বিজ্ঞানীরা। তবে সেই নিয়ে কাজ তখন আর খুব একটা এগোয়নি। সম্প্রতি নতুন করে তা নিয়ে গবেষণা করেন বিজ্ঞানীরা। সেটি প্রকাশিত হয় ‘নেচারস কমিউনিকেশন’-এ। সিরাকিউস বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক স্টিভ ডোরাস লিখেছেন, ‘‘নিষেককে অনেক সময়ই শুক্রাণুদের প্রতিযোগিতার ফল হিসাবে দেখা হয়। তবে অনেক প্রাণীর ক্ষেত্রেই শুক্রাণু দলবদ্ধ ভাবে কাজ করে।’’
স্ত্রী প্রাণীদের জনননালিতে অনেক সময়ই শুক্রাণু বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার মুখে পড়ে। কঠিন এবং জটিল পথ পেরিয়ে তাদের লক্ষ্যে পৌঁছোতে হয়। যদি পরস্পরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা না-করে দলবদ্ধ ভাবে তারা এগোতে থাকে, সে ক্ষেত্রে শুক্রাণু বাড়তি সুবিধা পেতে পারে। যেমনটা হয় সন্ধিপদ প্রাণীর ক্ষেত্রে, দাবি গবেষকদের। এই বিষয়ে নিশ্চিত হতে তাঁরা প্রায় শতাধিক প্রাণীর শুক্রাণুর বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করেন। অতীতের গবেষণাপত্র খতিয়ে দেখেন। তাঁরা দেখেন, শুক্রাণুর বৈশিষ্ট্য বিবর্তনের সঙ্গে বদলেছে। তাঁরা বুঝতে পারেন, শুক্রাণু কখন পরস্পরকে সহযোগিতা করেছিল এবং কত ঘন ঘন তা বিলুপ্ত হয়ে আবার ফিরে এসেছিল। প্রাণীদের মোটামুটি ৬০ কোটি বছরের বিবর্তনের একটি রূপ তাঁরা বুঝতে পেরেছেন।
আরও পড়ুন:
গবেষক আর আন্তোনিও গোমেজ় জানান, বিবর্তনের এই ধারা থেকে স্পষ্ট, সন্ধিপদ প্রাণীদের ক্ষেত্রে কখনও শুক্রাণুরা পরস্পরের সহায়ক হয়ে উঠেছে, আবার কখনও প্রতিযোগী হয়েছে। ওই প্রাণীদের বিবর্তনের সময় শুক্রাণুগুলি কিন্তু একটানা পরস্পরের সহযোগী হয়ে কাজ করেনি। মাঝেমধ্যে সেই বৈশিষ্ট্য ফিরে এসেছে, আবার বিলুপ্ত হয়েছে। বিজ্ঞানী স্কট পিটনিক বলছেন, শুক্রাণু খুব ঘন ঘন বিবর্তিত হয়। স্ত্রী জনননালির কঠিন পরিবেশে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়ে শুক্রাণু। তার ফলেই তার রূপ পরিবর্তন হয়।
বিজ্ঞানীরা মনে করে, তাদের এই গবেষণা প্রজননজনিত সমস্যা সমাধানের ক্ষেত্রে বড় ভূমিকা নিতে পারে। আবার কীটপতঙ্গ নিয়ন্ত্রণের উপায় বাতলাতেও সাহায্য করতে পারে।